রাশা বলল, “মতি, এবারে আমাকে দে, আমি নৌকা বাই।”
মতি বলল, “ঠিক আছে, আমি সরে যাই, তুমি এসে বসো।”
মতি সরে গেল, রাশা এসে তার জায়গায় বসল, নৌকাটা একটু বিপজ্জনকভাবে দুলে উঠল, কিন্তু তারা দুজনে মিলে সেটা সামলে নেয়।
রাশা বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকাটা বাইতে শুরু করে–কী আশ্চর্য, সত্যি সত্যি নৌকাটা এগিয়ে যেতে থাকে! বেশ খানিক দূর গিয়ে রাশা সবার দিকে তাকাল, বলল, “দেখলি?”
কোনো একটা কারণে তখন জয়নব আর জিতু হেসে কুটি কুটি হচ্ছে, মতির মুখ দেখে মনে হলো তারও হাসি পাচ্ছে, কিন্তু সে ভদ্রতা করে হাসছে না। রাশা একটু অবাক হয়ে বলল, “কী হলো, তোরা হাসছিস কেন?”
জিতু বলল, “তোমার নৌকা চালানো দেখে!”
“আমার নৌকা চালানোতে হাসির ব্যাপারটা কোন জায়গায়।”
“তুমি কি জানো, তুমি এক জায়গায় ঘুরছ!”
“আমি? এক জায়গায় ঘুরছি?”
“হ্যাঁ।”
রাশা এবার একটু সামনে তাকাল এবং আবিষ্কার করল সত্যি সত্যি নৌকাটা সামনে যাচ্ছে না, এটা এক জায়গায় ঘুরে যাচ্ছে।
রাশা বলল, “কী আশ্চর্য! মতি, তুই যখন বৈঠা চালাস তখন দেখি নৌকাটা সোজা যায়। আমি চালালে ঘুরে যাচ্ছে। ব্যাপারটা কি?”
মতি হাসল, “এই জিনিসটাই শিখতে হবে। এইটাই হচ্ছে নৌকা চালানো! এমনভাবে বৈঠা চালাবে যেন তুমি চাইলে নৌকাটা সোজা যাবে, চাইলে ডান দিকে যাবে, আবার চাইলে বাম দিকে যাবে।”
রাশা বলল, “দেখে মনে হয় কত সোজা, কিন্তু কাজটা তো দেখি কঠিন!”
মতি বলল, “যতক্ষণ না জানো ততক্ষণ কঠিন। যখন জানবে তখন দেখবে কাজটা পানির মতো সোজা!”
রাশা তখন মুখ শক্ত করে নৌকা চালানো শিখতে শুরু করল, তার মুখ দেখে মনে হতে থাকে, এর ওপরেই বুঝি তার জীবন-মরণ নির্ভর করছে!
.
রাত্রিবেলা রাশা আর নানি খেতে বসেছে, রাশা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল, “নানি, তুমি কোনোদিন নৌকা চালিয়েছ?”।
নানি চোখ কপালে তুলে বললেন, “আমি কোন দুঃখে নৌকা চালাতে যাব? একটু পরে জিজ্ঞেস করবি, নানি তুমি কোনোদিন রিকশা চালিয়েছ?”
রাশা হাসল, বলল, “না সেটা জিজ্ঞেস করব না।”
“না করলেই ভালো।”
“বুঝলে নানি, তোমার দেখে মনে হবে নৌকা চালানো বুঝি খুব সোজা। আসলে এত সোজা না, তুমি যদি ঠিক করে বৈঠা না বাইতে পার তাহলে নৌকাটা এক জায়গায় ঘুরতে থাকবে।”
“তোর ব্যাপারস্যাপার আমি খুব ভালো বুঝি না। স্কুলে যাবার জন্যে একটা নৌকা দরকার সেটা না হয় বুঝলাম। সেই নৌকা তোর কেন বাইতে হবে?”
“আমি একা বাইব কে বলেছে, সবাই বাইব।”
“এই যে ঢ্যাং চ্যাং করে একশ রকম কাজ করে বেড়াস, কোনদিন যে কোন বিপদে পড়বি খোদাই জানে।”
রাশা কিছুক্ষণ চোখের কোনা দিয়ে তার নানিকে দেখল, তারপর আস্তে আস্তে বলল, “ননি।”
“কী হলো?”
“আমি যে এইরকম উল্টাপাল্টা কাজ করি, তুমি কি সে জন্যে আমার ওপরে বিরক্ত হও!”
নানি হাসলেন, বললেন, “ধুর বোকা মেয়ে, বিরক্ত হব কেন?” একটু থেমে বললেন, “আসলে কী হয়েছে জানিস?”
“কী হয়েছে নানি?”
“এই যে তুই আমার সাথে থাকিস, দিন-রাত পাগলামি করিস, আমার সাথে বকবক করিস, আমার সময়টা তখন কেটে যায়। আগে মনে হতো সময়টা হচ্ছে একটা বোঝা, কিছু একটা চিন্তা করলেই মনে হতো মাথাটা বুঝি আউলে যাচ্ছে। এখন আর হয় না। প্রায় প্রত্যেক দিন আমি শান্তিতে ঘুমাই!”
রাশা তার ঝোল মাখা হাত দিয়ে নানিকে জড়িয়ে ধরে বলল, “সত্যি নানি? তোমার এখন শান্তিতে ঘুম হয়?”
“হ্যাঁ। গত রাতে আমি তোর নানাকে স্বপ্নে দেখলাম। আগে যখনই স্বপ্ন দেখেছি মনে হচ্ছে তোর নানাকে কেউ অত্যাচার করছে, গুলি করছে, চিৎকার করছে, আমি লাফ দিয়ে উঠে সারারাত বসে থেকেছি। ভয়ে চোখ বন্ধ করতে পারিনি।”
রাশা কিছু না বলে নানির দিকে তাকিয়ে রইল। নানি বললেন, “গত রাতে প্রথমবার তোর নানাকে স্বপ্নে দেখলাম, ধবধবে সাদা একটা কাপড় পরে এসেছে, মুখে একটু একটু হাসি। আমাকে জিজ্ঞেস করল, কী জোবেদা! নাতনিকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেছ! আমি বললাম, ওমা! এটা কী বলছ? তোমাকে আমি ভুলব কেমন করে? তোমার শরীরটা ভালো? তোমার নানা বলল, হ্যাঁ ভালো। আমাকে বলল, এক গ্লাস পানি দেবে বউ। আমি কলসি থেকে ঢেলে পানি দিলাম, সে এক চুমুক করে খায় আর আমার দিকে তাকিয়ে হাসে! তারপর ঘুম ভাঙল, দেখি ঘরের মাঝে কী সুন্দর ফুলের গন্ধ। বুঝলি রাশা, বুকের ভিতরটা একবারে ভরে গেল আমার।” নানি রাশার দিকে তাকিয়ে হাসলেন কিন্তু তার চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
পরদিন অস্ট্রেলিয়া থেকে রাখার একটা চিঠি এলো। বিদেশি চিঠি তাই পিয়নকে বখশিশ দিতে হলো, রাশার চিঠিটা খুলতে ভয় হচ্ছিল, তারপরেও তাকে খুলতে হলো। চিঠির ভেতরে একটা কার্ড, একটা মাঠের মাঝে অনেকগুলো ক্যাঙারুর ছবি! সাথে আম্মুর লেখা একটা চিঠি, সেই চিঠিতে অস্ট্রেলিয়ার নানারকম বর্ণনা। দোকানগুলো কত সুন্দর, সেখানে কতরকম জিনিস পাওয়া যায়। রাস্তাঘাট কত পরিষ্কার, মানুষজন কত দ্র–এইসব নানা কথা লেখা। বাংলাদেশে এখন গরম কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় এখন শীতকাল সেটাও লেখা আছে। তার বাইরে কোনো কথা নেই। নিজের সম্পর্কেও নেই, রাশার সম্পর্কেও নেই। এটি যেন কোনো মেয়ের কাছে লেখা তার মায়ের চিঠি নয়, এটি যেন খবরের কাগজে লেখা একজন মানুষের চিঠি!
