নদীর জন্য অন্য পারে মিলিটারিগুলি পজিশন নিয়ে গুলি করার চেষ্টা কলল, আমার রেঞ্জের বাইরে, মাথায় কচুরিপানা নিয়ে যেভাবে ভেসে উঠেছিলাম আবার ডুবে গেছি, আমার পাবে কোথায়? পানির নিচে ডুবসাঁতার দিয়ে সরে গেছি, নিরাপদ জায়গায় গিয়ে দেখি নদীতে যে কয়টা নৌকা ছিল তার নোনোটার চিহ্ন নাই, একটা শুধু উল্টো হয়ে ভেসে যাচ্ছে। দুইটা পাকিস্তানি মিলিটারি কোনোমতে সেটা ধরে ভেসে থেকে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। আমরা ইচ্ছা করলে ঐ দুটোকে শেষ করে দিতে পারতাম, কিন্তু কেন জানি মায়া হলে। জান বাঁচাবার জন্যে যখন কেউ চিৎকার করে তখন। তারে মারা যায় না। আমারা ঐ দুইটাকে ছেড়ে দিলাম।
জিতু জিজ্ঞেস করল, কয়টা পাকিস্তানি মরেছিল, নানা?
সঠিক সংখ্যা তো জানি না–তিনটা নৌকা, বিশ থেকে ত্রিশজন তো হবেই।
গৌরাঙ্গ ঘরামি মাথা নেড়ে বললেন, “আরো বেশি হবে। বড় বড় নৌকা ছিল, অনেকগুলি করে উঠেছিল, মনে নাই?”
জিতু হাতে কিল দিয়ে বলল, “উচিত শিক্ষা হয়েছে। জন্মের শিক্ষা হয়েছে।”
সালাম নানা মাথা নাড়লেন, বললেন, “হ্যাঁ। তাদের খুব বড় একটা শিক্ষা হয়েছিল। কিন্তু—”
সালাম নানা কথা বলতে শুরু করে থেমে গেলেন, রাশা জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু কী?”
সালাম নানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দুইদিন পরে আরো অনেক মিলিটারি এসে আশেপাশের সব গ্রাম জ্বালিয়ে মানুষ মেরে একবারে ভয়ঙ্কর অবস্থা করেছিল। বুঝলি জিতু তাই বলছিলাম যুদ্ধ খুব খারাপ জিনিস। আমাদের কোনো উপায় ছিল না, তাই যুদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু এই দেশের মানুষের যেন আর কোনোদিন যুদ্ধ করতে না হয়। কোনোদিন না! বুঝেছিস?”
জিতু মাথা নাড়ল, তার সাথে অন্যেরাও।
১১. নৌকায় নৌকায়
জিতু মিয়া নৌকাটাতে হাত দিয়ে বলল, “আলকাতরা শুকিয়ে গেছে।”
মতি নৌকাতে হাত না দিয়েই বলল, “শুকায় নাই। আলকাতরা মোটেও শুকায় নাই। আলকাতরা এত সহজে শুকায় না।”
রাশা বলল, “যথেষ্ট শুকিয়েছে, এখন পানিতে নামাই। নৌকা টেস্টিং করি।”
মতি বলল, “আলকাতরা না শুকালে নৌকাতে পানি উঠবে।”
রাশা বলল, “নৌকাতে আমরা একটা বাটি রাখব, পানি উঠলে পানি সেঁচব।”
জয়নব বলল, “কাঁচা আলকাতরা শরীরে লেগে যাবে। জামা-কাপড়ে লেগে যাবে।”
রাশা বলল, “শরীরে একটু আলকাতরা লাগলে কিছু হয় না।”
জিতু বলল, “কেরোসিন দিলেই আলকাতরা উঠে যায়।”
রাশা বলল, “হ্যাঁ, কেরোসিন দিলেই আলকাতরা উঠে যায়।”
জয়নব বলল, “তার মানে তুই নৌকায় উঠবিই?”
রাশা দাঁত বের করে হাসল, বলল, “হ্যা! আমার আর ধৈর্য হচ্ছে না। চল।”
কাজেই চারজনের ছোট দলটা নৌকাটাকে ঠেলে খালের পানিতে নামিয়ে ফেলল। গৌরাঙ্গ ঘরামি নৌকার সাথে দুইটা বৈঠা তৈরি করে দিয়েছেন। মতি দুটো লম্বা বাঁশ নিয়ে এলো লগি হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে। জিতু খুঁজে একটা ছোট প্লাস্টিকের বালতি নিয়ে এলো নৌকায় পানি সেঁচার জন্যে।
নানি খালের পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন, দেখলেন একজন একজন করে নৌকায় উঠে বসল। মতি বৈঠা হাতে নিয়ে পিছনে বসেছে, তারপর ধাক্কা দিয়ে নৌকাটাকে খালের মাঝামাঝি নিয়ে আসে। নৌকাটা একবার ঘুরে যেতে যাচ্ছিল, মতি বৈঠা দিয়ে নৌকাটাকে থামায় তারপর সামনের দিকে বেয়ে নিতে থাকে। রাশা আনন্দে হাত নেড়ে চিৎকার করে বলল, “ফ্যান্টাস্টিক!”
আনন্দে রাশা দাঁড়িয়ে যেতেই নৌকাটা দুলে উঠল, সাথে সাথে সে আবার বসে পড়ে। মতি বলল, “নৌকার মাঝে দাঁড়ালেই বিপদ!”
রাশা বলল, “তাই তো দেখছি।”
মতি বৈঠা দিয়ে নৌকাটাকে বেয়ে নিয়ে যেতে থাকে, রাশা আগ্রহ নিয়ে দেখে, কাজটাকে তার মোটেও কঠিন মনে হলো না, বৈঠাটা তাকে দিলে সেও নিশ্চয়ই পারবে। পানিতে ডুবিয়ে সামনে থেকে পিছনে টেনে আনা, সেটা না পারার কী আছে? রাশা বলল, “মতি! আমাকে বৈঠাটা দিবি? আমি একটু চালাই।”
“তুমি আগে নৌকা বেয়েছ?”
“নাহ। তাতে কী হয়েছে, মোটেও কঠিন মনে হচ্ছে না।”
“দেখে কোনো কাজ কঠিন মনে হয়? সাইকেল চালানো দেখে কি কঠিন মনে হয়? কিন্তু যে চালানো জানে না সে চেষ্টা করলে কী রকম আছাড় খায় তুমি জানো?”
“তা ঠিক।”
“খালটা তো সরু, এইখানে ঠিক করে না বাইলে ডানে-বাঁয়ে লেগে যাবে। আরেকটু সামনে গিয়ে জলা জায়গায় পড়ব সেইখানে চারিদিকে পানি। তুমি সেইখানে চালিও যেদিকেই যাও সমস্যা নাই।”
“কিন্তু তোকে দেখে আমার যে লোভ হচ্ছে।”
মতি তার ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হাসল। বলল, “আরেকটা বৈঠা আছে সেইটা দিয়ে বাইতে থাকে, তাহলে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব।”
রাশ তখন আরেকটা বৈঠা নিয়ে বাইতে থাকে, নৌকাটা ঘুরে যেতে যাচ্ছিল, মতি পিছনে বসে সোজা করে রাখল। দুজনে মিলে বৈঠা বাওয়ার কারণে নৌকাটা এবার আরেকটু জোরে ছুটতে থাকে।
জয়নব বলল, “আলকাতরা শুকানোর আগে নৌকাটা নামিয়েছি। এখন দেখেছ কী হচ্ছে?”
রাশা জিজ্ঞেস করল, “কী হচ্ছে?”
“নৌকাতে পানি উঠছে।”
সত্যি সত্যি ধীরে ধীরে নৌকার নিচে পানি জমতে শুরু করেছে। রাশ বলল, “বসে আছিস কেন? পানি সেঁচতে শুরু কর।”
কাজেই জয়নব আর জিতু পানি সেঁচতে লাগল।
.
কিছুক্ষণের মাঝেই খালটা একটা জলা জায়গার সাথে এসে মিশে গেল। শুকনোর সময় চারপাশে ধানক্ষেত থাকে তার মাঝ দিয়ে খালটী আলাদা করে বোঝা যায়, এখন চারিদিকে পানি, কোথায় খাল আর কোথায় ধানক্ষেত বোঝার কোনো উপায় নেই। মাঝে মাঝে পানি থেকে গাছ বের হয়ে এসেছে, কোথাও কোথাও ঝোঁপঝাড়ের মাথা দেখা যাচ্ছে তাই বোঝা যায় পানি খুব বেশি গভীর নয়। পানি ঝকঝকে পরিষ্কার, নিচে তাকালেও পানিতে ডুবে থাকা ক্ষেত মাটি চোখে পড়ে।
