“যাই হোক, আমরা তখন এই এলাকাটাতে এসেছি, আশেপাশে কয়েকটা বড় অপারেশন করেছি। দুইটা ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছি। রাস্তায় মিলিটারির একটা জিপ উড়িয়ে দিয়েছি। মিলিটারিরা তখন মনে হলো আমাদের শায়েস্তা করবে। হেড কোয়ার্টার থেকে প্রায় দুইশ পাঞ্জাবি মিলিটারি এসেছে। তারা নদীর ঐ পারে আমরা নদীর এই পারে।”
“এর আগে আমরা কখনোই মিলিটারিদের সামনাসামনি আমাদের আক্রমণ করতে দেই নাই। আমরা সবসময় লুকিয়ে তাদের অ্যামবুশ করেছি। এইবার আমরা ভাবলাম সামনাসামনি একটু যুদ্ধ করি। আমরা নদীর পাড়ে বাংকার করে বসে থাকব তারা যদি আমাদের আক্রমণ করতে চায় নদী পার হয়ে আসতে হবে, নদী পার হবার সময় আমরা তাদের ছ্যাড়াব্যাড়া করে দেব। আমরা তাই নদীর পাড়ে পজিশন নিয়ে বসে থাকলাম। নদীর ঐ পারেও আমাদের লোক আছে তারা খোঁজখবর দিচ্ছে। সকালবেলা খোঁজ পেলাম তারা অনেক রকম অস্ত্রপাতি নিয়ে রওনা দিয়েছে।”
“আমরা অপেক্ষা করছি, কখন তারা আসবে, নদী পার হবে কিন্তু তারা তো আর আসে না। তখন হঠাৎ একজন স্কাউট দৌড়াতে দৌড়াতে হাজির হলো, এসে বলল, মিলিটারিরা দুই ভাগে ভাগ হয়েছে, একভাগ নদীর এই পারে অন্যভাগ নদীর ঐ পারে। তারপর তারা নদীর তীর ধরে আসছে। বদমাইশের বাচ্চাগুলি নদী পার হয়েছে ঠিকই কিন্তু অনেক উজানে যেখানে আমরা আশেপাশে নাই! ব্যাটারা হচ্ছে প্রফেশনাল, যুদ্ধের বইপত্র পড়েছে, সেখানে নিশ্চয়ই কোথায় নদী পার হতে হয়, কেমন করে নদী পার হতে হয়–এইসব শেখায়। আমরা তো আর সেইসব জানি না!”
“যাই হোক, স্কাউটের মুখে খবর পেয়ে আমাদের আক্কেল গুড়ুম। আমাদের কমান্ডার হচ্ছেন রাশার নানা, আজিজ মাস্টার, আমরা আজিজ ভাই ডাকি। আজিজ ভাই খুব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ, একটু সময় চিন্তা করে বললেন, আমাদের বিশ-পঁচিশজন মুক্তিযোদ্ধা কয়েকশ পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে যুদ্ধ করতে পারব না। সবাই মারা পড়ব। তাই তার চেষ্টাও করব না, কাজেই এক্ষুণি সরে পড়তে হবে। যদি সরে পড়তে পারি ভালো। যদি দেখি পারছি না তাহলে কয়েকজনের একটা ছোট দল লাইট মেশিনগান নিয়ে রাস্তার পাশে বসে যাবে, পাকিস্তানিদের আটকে রাখবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সবাই সরে পড়তে পারছে।”
“এইটুকু বলে আজিজ ভাই থামলেন, তারপর বললেন, আমার দুইজন ভলান্টিয়ার দরকার। আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন? আজিজ ভাই বললেন, ব্যাটাদের একটা শিক্ষা দিতে চাই। আমি বললাম, কী শিক্ষা? আজিজ ভাই বললেন, তারা নদী পার হয়ে এই পারে এসেছে না? আবার তো ঐ পারে যেতে হবে। যখন ঐ পারে যাবে তখন নৌকাগুলি ডুবিয়ে দিতে হবে। তাই দুজনকে ঐ কচুরিপানায় লুকিয়ে থাকতে হবে! অস্ত্রসহ।”
রাশা এই সময়ে জিজ্ঞেস করল, “পানিতে ডুবে গেলে অস্ত্র নষ্ট হয়ে যাবে না?”
“না। বেশিদিন ডুবিয়ে রাখলে জং ধরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ব্যারেলে কাদা ঢুকলেও সমস্যা! এমনিতে পানিতে ভিজে গেলে, কিছুক্ষণ ডুবে থাকলে কোনো সমস্যা নাই। যাই হোক আমি আর গৌরাঙ্গ, আমরা দুইজন বললাম, আমরা থাকব। দুইটা রাইফেল নিয়ে আমরা কচুরিপানায় লুকিয়ে থাকলাম, অন্যেরা চলে গেল।”
“কিছুক্ষণের ভেতর শুনতে পাই নদীর দুই পার দিয়ে মিলিটারি যাচ্ছে। ব্যাটাদের জানের ভয় আছে, এদিক-সেদিক তাকায়, আস্তে আস্তে হাঁটে, ফাঁকা গুলি করে। কচুরিপানার দিকেও একঝাঁক গুলি করল, কপাল ভালো আমরা বেঁচে গেলাম।”
“যাই হোক আমরা নিশ্বাস বন্ধ করে শুধু নাকটা ভাসিয়ে বসে আছি, টের পাচ্ছি শরীরে. জেঁক ধরেছে। ব্যাটাদের মনে হলো ঈদ, এরকম ফ্রেশ রক্ত কতদিন খায় নাই! রক্ত খেয়ে ঢোল হয়ে নিজেরাই খসে পড়ছে। কান খাড়া রেখে শোনার চেষ্টা করি কোনো বড় ধরনের গোলাগুলির শব্দ শোনা যায় নাকি, শোনা গেল না। তার মানে সবাই নিরাপদে সরে পড়তে পেরেছে। আজিজ ভাই বুদ্ধি করে ছোট একটা খাল পার হয়ে গেছে, খালের উপর বাঁশের সাঁকো গুলি করে ভেঙে দিয়ে গেছে, নৌকাগুলো ডুবিয়ে দিয়ে গেছে–তাই এত সহজে পিছু নিতে পারে নাই।”
“যাই হোক বিকেলের দিকে টের পেলাম মিলিটারিগুলো ফিরে আসছে, ব্যাটাদের মনে খুব ফুর্তি। তাদের ধারণা তারা সব মুক্তিবাহিনীকে ভাগিয়ে দিয়ে এসেছে। আমরা কচুরিপানায় ডুবে থেকে শুনতে পাচ্ছি শালা মুক্তি বলে একেবারে যা তা ভাষায় গালাগাল করছে। আমাদের সাহস নাই, যুদ্ধ করার ক্ষমতা নাই, আমরা ইন্ডিয়ার দালাল এই রকম আজেবাজে কথা। শুনে আমাদের আরো রাগ চেপে গেল, আজকে ব্যাটাদের একটা শিক্ষা দিতেই হবে। আমাদের সাহস আছে কি নেই সেইটা আজকে তাদের জন্মের মতো বুঝিয়ে দেব।”
“ওরা যখন নদী পার হয়েছিল তখন সেটা তারা করেছিল খুব সাবধানে, যেখানে আমরা নাই সেইখানে। এখন তারা ধরেই নিয়েছে আমরা কোথাও নাই, তাই তাদের ভয়েরও কিছু নাই। তারা যেভাবে খুশি যেখানে খুশি নদী পার হতে পারবে। তাই তারা ঠিক করল তারা এখন কাছাকাছি এখান দিয়েই নদী পার হয়ে যাবে। হাঁকডাক দিয়ে নৌকা জড়ো করে বদমাইশগুলি নদী পার হতে শুরু করল। আমরা বুঝতে পারলাম এইটাই সুযোগ।”
“আমরা তাদের শান্তিমতো নদী পার হতে দিলাম। যতক্ষণ এই পারে পাকিস্তানি মিলিটারি থাকল আমরা কিছু করলাম না। যখন শেষ মিলিটারিটাও নৌকায় উঠে রওনা দিল আমরা মাথার মাঝে কচুরিপানা লাগিয়ে ভেসে ভেসে কাছাকাছি এলাম। আমি আর গৌরাঙ্গ দুই দিকে সরে গেলাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন ঠিক মাঝনদীতে পৌঁছায়। যখন পৌঁছল, তখন আমরা দুইজন দুই দিক থেকে গুলি করতে শুরু করলাম।” ব্যাস। মজা শুরু হয়ে গেল। গুলি শব্দ শুনেই বাঙালি মাঝিরা নৌকা ফেলে পানিতে লাফ দিয়েছে। সাথে সাথে নৌকা চক্কর খেতে শুরু করেছে। গাদাদাদি করে মিলিটারি উঠেছিল, সেগুলো নৌকার ওপর লাফঝাঁপ দিতে লাগল, কেউ কেউ আমাদের গুলি করার চেষ্টা করল। নৌকা গেল কাত হয়ে, কিছু বোঝার আগেই মিলিটারিগুলো পানিতে হাবুডুবু খেতে লাগল, একটাও সাঁতার জানে না, সবগুলি মার্বেলের মতো ডুবে যেতে লাগল।
