রাশার ধারণী সত্যি! নৌকার দুই পাশের দুটি অংশ জোড়া দেয়ার পর গৌরাঙ্গ ঘরামি সেটা উল্টো করলেন, তারপর বাঁশের টুকরো দিয়ে সেটাকে ফাঁক করে মাঝখানে এক টুকরো কাঠের পাটাতন লাগালেন, তখন হঠাৎ করে রাশার কাছে পুরো নৌকাটার আকার স্পষ্ট হয়ে গেল! সে হাততালি দিয়ে বলল, “কী সুন্দর!”
গৌরাঙ্গ ঘরামি রাশার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, কিছু বললেন না। পাটাতনের কাঠগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। রাশার নিজের চোখকে বিশ্বাস হলো না যখন দেখল সত্যি সত্যি সন্ধের আগে পুরো নৌকাটা তৈরি হয়ে গেছে! কী সুন্দর একটা নৌকা, দেখে মনে হয় একজন আর্টিস্ট একটা ভাস্কর্য তৈরি করেছে।
সালাম নানা এমন ভান করতে লাগলেন যেন গৌরাঙ্গ ঘরামি না, সালাম নানাই নৌকাটা তৈরি করেছেন। বুকে থাবা দিয়ে বললেন, “আমি তোমাদের বলেছিলাম না আমার বন্ধু একদিনে একটা নৌকা বানাতে পারে! বলেছিলাম কিনা?”
রাশা বলল, “আপনি বলেছিলেন না, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি নাই, আমি ভেবেছিলাম আপনার বন্ধু তো সেই জন্যে আপনি বাড়িয়েচাড়িয়ে বলেছিলেন।”
“আমি মোটেই বাড়িয়েচাড়িয়ে বলি নাই! আমার বন্ধু একদিনে একটা নৌকা বানাতে পারে, একমাস সময় দিলে একটা জাহাজ বানিয়ে ফেলতে পারবে! তাই না রে গৌরাঙ্গ?”
গৌরাঙ্গ ঘরামি খুক খুক করে হাসল, বলল, “তারপরে তুমি বলবা তিন মাসে একটা উড়োজাহাজ বানাতে পারবে!”
“পারবেই তো। তোমাকে উড়োজাহাজ বানাতে শেখালে তুমি উড়োজাহাজও বানাতে পারতে!”
“ভালো হয়েছে কেউ শিখায় নাই, তাহলে এই নৌকা আর তৈরি হতো না।
রাশা বলল, “গৌরাঙ্গ নানা, থ্যাংকু। আপনাকে অনেক থ্যাংকু।”
গৌরাঙ্গ ঘরামি বললেন, “এখনই থ্যাংকু দিও না সোনা। নৌকাটা মা তৈরি হয়েছে, আসল কাজই বাকি আছে।”
“আসল কাজ কী?”
“ফুটোফাটা বন্ধ করতে হবে, আলকাতরা মারতে হবে সেই আলকাতরা শুকাতে হবে তারপর তুমি নৌকা পানিতে নামাবে।”
রাশা নৌকাটার মসৃণ গায়ে হাত দিয়ে বলল, “এখন নৌকাটার কী সুন্দর রং! আলকাতরা দিলে তো কালো হয়ে যাবে!”
“সেই কালো রং আরো সুন্দর হবে দেখো! কুচকুচে কালো পানকৌড়ির মতো। কালো রং খারাপ কে বলেছে? তোমার সালাম নানাকে জিজ্ঞেস করে দেখো
“কী জিজ্ঞেস করব?”
“তার চুল যে পেকে সাদা হয়েছে সে জন্যে খুশি হয়েছে নাকি যখন কালো ছিল তখন খুশি ছিল?”
রাশা হি হি করে হাসল এবং অন্য সবাই সেই হাসিতে যোগ দিল।
গৌরাঙ্গ ঘরামি তার যন্ত্রপাতি একটা ব্যাগে ভরে বলল, “আজকে এই পর্যন্তই। কালকে আলো হলে, আলকাতরা মারব।”
নানি রাতের বেলাতেও খেয়ে যেতে বলেছিলেন, সালাম নানা রাজি হলেন না। গৌরাঙ্গ ঘরামি তার বাড়িতে খাবে, রাত কাটাবে, দুজনের নাকি অনেক গল্প বাকি আছে।
রাশা দেখল সালাম নানা তার ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, গৌরাঙ্গ ঘরামি তার ব্যাগটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে হাঁটছে। সালাম নানা কী একটা বললেন তখন দুজনেই একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হি হি করে হাসতে লাগলেন, একজন আরেকজনের পেটে গুতো মারতে লাগলেন–যেন দুটি বাচ্চা মানুষ।
.
পরের দিন সকালবেলাই সালাম নানা তার বন্ধু গৌরাঙ্গ ঘরামিকে নিয়ে চলে এলেন। রাশা, জয়নব, জিতু মিয়া, মতি আরো বাচ্চা-কাচ্চা আগে থেকেই বসে আছে–কখন নৌকাটা শেষ হবে, কখন সেটাকে পানিতে নামানো হবে। গৌরাঙ্গ ঘরামি নৌকাটাকে সোজা করে তার ফুটোফাটাগুলো বুজিয়ে দিতে লাগলেন। নৌকা বানানোর সময় গৌরাঙ্গ ঘরামি একটা কথাও বলেননি, আজকে সেরকম না। কাজ করতে করতে কথা বলছেন, মাঝে মাঝে কাজ থামিয়েও কথা বলছেন। রাশা তাই একসময় বলল, “যুদ্ধের একটা গল্প বলেন না, নানা।”
তখন দুজনেই কথা থামিয়ে রাশার দিকে তাকালেন, সালাম নানা বললেন, “যুদ্ধের গল্প শুনতে চাও?”
“জি নানা।”
জিতু হাতে কিল দিয়ে বলল, “ফাটাফাটি গল্প!”
সালাম নানা গৌরাঙ্গ ঘরামির দিকে তাকিয়ে বললেন, “কোনটা বলি গৌরাঙ্গ?”
“ঐ যে তুমি আর আমি বাঘাই নদীতে অ্যামবুশ করলাম সেইটা বলো।”
সালাম নানা মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, এই গল্পটা খারাপ না! শোনো তাহলে!”
সালাম নানা খানিকক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর শুরু করলেন, “এইটা হচ্ছে যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়। যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন আমরা যুদ্ধের য’ও জানি না। বলতে পারো রাইফেল কোনদিক সোজা কোনদিক উল্টা সেইটাও জানি না। গ্রেনেড কী খাওয়ার জিনিস নাকি ছুঁড়ে মারার জিনিস সেইটা পর্যন্ত জানি না। যাই হোক আস্তে আস্তে ধাক্কা খেয়েটয়ে আমরা একটু একটু যুদ্ধ করতে শিখেছি। দেখি পাকিস্তানি মিলিটারির গুলিতে যেরকম আমরা মরি ঠিক সেরকম আমাদের গুলি কোনোমতে তাদের গায়ে লাগাতে পারলে তারাও মরে। তাহলে আর ভয়টা কী? তাদের সাইজ বড় তাদের কাছে হাজার রকম অস্ত্রপাতি, তাদের জামা-জুতো ভালো, আমরা পিচ্চি পিচ্চি প্রায় বাচ্চাকাচ্চা মানুষ, অস্ত্রপাতি কম, জামা-জুতোর তো প্রশ্নই নাই। বেশিরভাগ লুঙ্গি পরে থাকে খালি পা! কিন্তু সমস্যা তো নাই, সুযোগ বুঝে খালি গুলি করা। দেশটা আমার, দেশের মানুষও আমাদের-তারা বাইরের মানুষ কোথায় গিয়ে লুকাবে?”
“আস্তে আস্তে আমাদের সাহস গেল বেড়ে। খোঁজখবর রাখি কোথাও যাচ্ছে–আসছে, খবর পেলেই অ্যামিবুশ করি। যখন বর্ষা নেমেছে তখন একটু সমস্যা! ঝড়ের বেগে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারি না। নৌকা করে যেতে হয়। পাকিস্তানি মিলিটারিদেরও সমস্যা, তারাও যেতে পারে না। আমরা বাংলাদেশের মানুষ, পানির মাঝে বড় হয়েছি, পানি দেখে ভয় পাই না। ঐ ব্যাটারা পানি দেখে ভয়ে কাঁপে, সাঁতার জানে না হাঁটুপানিতেই ডুবে মরে এমন অবস্থা!”
