রাশা আনন্দে হাততালি দিল, “বানিয়ে দেবে। আমাদের চোখের সামনে?”
“হ্যাঁ। তোমাদের চোখের সামনে।“
“কয়দিন লাগবে নানা?”
“সকালে শুরু করলে সূর্য ডোবার আগে সে একটা নৌকা বানাতে পারে। এখন অবশ্যি বয়স হয়েছে, এখন একদিনে পারবে কি না জানি না।”
জিতু বলল, “আমরা সবাই সাহায্য করব।”
“তাহলে মনে হয় একমাস লেগে যাবে।”
সালাম নানার কথায় সবাই হি হি করে হাসতে লাগল, জয়নব বলল, “আপনি ঠিকই বলেছেন নানা। জিতু হাত দিলেই সর্বনাশ–তখন একদিনের কাজ শেষ হতে একমাস লাগবে।”
রাশা জিজ্ঞেস করল, “নানা আপনার বন্ধুকে কবে খবর দিবেন?”
“আজকেই দিব।”
“কবে থেকে বানাবেন?”
“কাঠ কিনতে হবে, গজাল, শিরিষ, আলকাতরা এইসব কিনতে হবে, জোগাড়যন্ত্রে একটু সময় লাগবে। মনে করো পরশু না হলে তার পরের দিন।”
“কোথায় বানাবেন, নানা?”
“তোমার নানাবাড়িতে। সামনে খাল আছে, খালের পাড়ে তৈরি করে খালে ভাসিয়ে দেয়া হবে।”
রাশা আবার হাততালি দিল, “কী মজা হবে।”
সালাম নানা হাসলেন, বললেন, “হ্যাঁ। অনেক মজা হবে।”
সালাম নানার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চারজন বাড়ির দিকে রওনা দেয়, কয়েক পা অগ্রসর হয়ে রাশা থেমে গেল, অন্যদের বলল, “তোরা হাঁটতে থাক, আমি সালাম নানার কাছ থেকে একটা জিনিস জেনে আসি।”
রাশা দৌড়ে আবার সালাম নানার কাছে এসে বলল, “নানা।”
“বলো।”
“নৌকার জন্যে কাঠ, আলকাতরা এসব তো কিনতে হবে। তার জন্যে তো একটু টাকা লাগবে। আর আপনার বন্ধুকে তো নৌকা তৈরি করার জন্যে একটু মজুরি দিতে হবে। আমি বলছিলাম কী-”
“কী বলছিলে?”
“আমার মা যাবার সময় আমাকে কিছু টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। স্কুলে ভর্তি হবার সময় একটু টাকা খরচ হয়েছে। বাকি টাকাটা আছে। যদি কাঠ কিনতে টাকা লাগে—”
“কাঠ কিনতে টাকা লাগবে না। আমার বাড়িতে অনেক কাঠ পড়ে আছে। গজাল, আলকাতরা, শিরিষ এইসবের জন্যে এমন কিছু খরচ নাই। বাকি থাকল গৌরাঙ্গের মজুরি?”
“জি নানা।”
“আমি তোমাকে বলেছি গৌরাঙ্গ আমার খুব ভালো বন্ধু। প্রাণের বন্ধু। তোমার নানা যেরকম আমার প্রাণের বন্ধু ছিলেন সেরকম। বন্ধুর কাছে সব রকম আবদার করা যায়, কিন্তু বন্ধুকে কখনো মজুরি দিতে হয় না। সেইটা খুব লজ্জা–”
“ও আচ্ছা!” রাশা একটু লজ্জা পেয়ে যায়, “আমি আসলে বুঝতে পারি নাই। আপনারা একসাথে যুদ্ধ করেছিলেন?”
“হ্যাঁ। আমি, তোমার নানা, গৌরাঙ্গ আমরা সব একসাথে যুদ্ধ করেছিলাম। এখন একজন শিক্ষিত মানুষ আর নৌকার মিস্ত্রি বন্ধু হতে পারবে না। যুদ্ধের সময় হয়েছিল। স্কুলের মাস্টার আর কুলি, ইউনিভার্সিটির ছাত্র আর পকেটমার সব একজন আরেকজনের বন্ধু ছিল। বুঝেছ?”
“জি বুঝেছি।”
“যাও তাহলে। তোমার বন্ধুরা অপেক্ষা করছে।”
রাশা উঠে দাঁড়াল, বলল, “নানা।”
“বলো।”
“আমার নানিকে আমি নানার কথা জিজ্ঞেস করতে পারি না, জিজ্ঞেস করলেই নানি জানি কেমন হয়ে যান। আপনি কি কোনো একদিন আমাকে একটু বলবেন কী হয়েছিল?”
সালাম নানা কিছুক্ষণ রাশার দিকে তাকিয়ে রইল তারপর একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “বলব? নিশ্চয় বলব।”
.
সালাম নানার বন্ধু গৌরাঙ্গ ঘরামি দেখতে যেরকম হবে বলে রাশা ভেবেছিল দেখা গেল মানুষটা দেখতে ঠিক সেরকম। হালকা-পাতলা, শুকনো, মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মুখে বয়সের চিহ্ন কিন্তু চোখ দুটি সজীব, একেবারে বাচ্চাদের মতো। সালাম নানা আর গৌরাঙ্গ দুজন পাশাপাশি বসে অনেকক্ষণ গল্প করলেন, পুরানো বন্ধুদের খোঁজ নিলেন। অনেকে মারা গিয়েছে তাদের কথা বলে নিশ্বাস ফেললেন, যারা বেঁচে আছে তারা কে কেমন আছে সেটা নিয়ে গল্প করলেন। নানি বাড়ির ভেতর থেকে চা বানিয়ে পাঠালেন। সালাম নানা আর গৌরাঙ্গ বসে বসে চা খেলেন, তারপরে গৌরাঙ্গ ঘরামি কাজ শুরু করলেন।
রাশা মুগ্ধ হয়ে তার হাতের কাজ দেখতে লাগল। সালাম নানা আগেই কাঠগুলো মাপমতো কেটে রেখেছিলেন, গৌরাঙ্গ ঘরামি সেগুলো ব্ল্যাদা দিয়ে একটু সমান করে নিলেন। তারপর মাপজোখ করে কেটে সাইজ করলেন। কানের ওপর একটা ছোট পেন্সিল গুঁজে রাখা আছে সেটা দিয়ে কাঠের ওপর লাইন টানলেন, করাত দিয়ে সেই লাইন ধরে কাটলেন। তারপর কাঠগুলো ঠুকে ঠুকে একটার সাথে আরেকটা লাগালেন, রাশা খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থেকেও বুঝতে পারল না নৌকার কোন অংশটা তৈরি হচ্ছে।
দুপুরে নানি খাবারের আয়োজন করেছিলেন, সবাই বসে তখন খেয়ে নিল। রাশা ভেবেছিল গৌরাঙ্গ ঘরামি এত পরিশ্রম করেছেন নিশ্চয়ই ভালো করে খাবেন, কিন্তু আসলে বলতে গেলে কিছুই খেলেন না। এত কম খেয়ে মানুষ কেমন করে এত কাজ করে কে জানে। খেয়ে একটুও বিশ্রাম না নিয়ে আবার কাজ শুরু করলেন। সালাম নানা আর গৌরাঙ্গ ঘরামি দুজন এত বন্ধু, সারাক্ষণই এটা-ওটা নিয়ে গল্প করছেন কিন্তু মজার ব্যাপার হলো গৌরাঙ্গ ঘরামি যখন কাজ শুরু করেন তখন একটা কথাও বলেন না, মুখ যেন সেলাই করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বিকেলবেলা রাশা একটু একটু করে নৌকার আকারটা ধরতে পারল, দুই পাশের দুটি অংশ তৈরি করা হয়েছে। মাপজোখ করে গৌরাঙ্গ চাচা সন্তুষ্ট হলেন বলে মনে হলো, তখন দুই পাশের দুই অংশ একত্রে জুড়ে দিলেন, নৌকার মতো হলো সত্যি কিন্তু অত্যন্ত সরু একটা নৌকা! এত সরু নৌকায় তারা কেমন করে বসবে? কিন্তু রাশা কিছু জিজ্ঞেস করল না। ব্যাপারটা মনে হয় ছবি আঁকার মতো, ছবি আঁকার মাঝামাঝি সময়ে ছবির মাথামুণ্ডু কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু যখন শেষ হয়ে আসে তখন সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যায়।
