“নৌকা?”
“হ্যাঁ। নৌকা করে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নাই।”
“নৌকা কোথায় পাব?”
“গ্রামের মানুষের নৌকা আছে, ভাড়া করবি, যাবি।”
“প্রতিদিন নৌকা ভাড়া করতে হবে?”
“এ ছাড়া আর রাস্তা কী?”
মতি কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল, সে বলল, “আমাদের নিজেদের একটা নৌকা থাকলে আমরা নৌকা বেয়ে চলে যেতাম!”
রাশা ভুরু কুঁচকে বলল, “তুই নৌকা বাইতে পারিস?”
মতি কোনো কথা না বলে হাসল, কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “তুমি ভাত খেতে পারো?” তখন সে যেভাবে হাসে সেই হাসি।
রাশা বলল, “তাহলে আমরা একটা নৌকা জোগাড় করি না কেন?”
জয়নব বলল, “কোত্থেকে জোগাড় করবে?”
রাশা মাথা চুলকাল, বলল, “সেইটা তো জানি না।”
.
রাত্রিবেলা সে নানিকে জিজ্ঞেস করল, “নানি, নৌকা কোথায় পাওয়া যায় তুমি জানো?”
“নৌকা? নদীতে, খালে-বিলে।”
রাশা মাথা নাড়ল, বলল, “না, না সেই কথা বলছি না। আমাদের স্কুলে যাবার জন্যে একটা নৌকা দরকার। সেই নৌকাটা কোথায় পাব?”
নানি মাথা চুলকালেন, বললেন, “তোর নানার একটা ছোট নৌকা ছিল, সে তো অনেক আগে। কোথায় গেছে তাও জানি না। খালে ডুবে ছিল হয়তো, ভেঙেচুরে ভেসে গেছে “
রাশা বলল, “ইস! নানি, কেন তুমি নৌকাটাকে ভেঙেচুরে ভেসে যেতে দিলে?”
নানি হাসলেন, বললেন, “কতদিন আগের কথা, সেই নৌকা কি আর এতদিন থাকত? নৌকা সারতে হয়, বছর বছর মেরামত করতে হয়, আলকাতরা দিতে হয়।”
“তাহলে এখন কী করি নানি?”
“এই গ্রামে ঘুরে দেখ। হয়তো কারো ছোট নৌকা আছে, তোদের ব্যবহার করতে দেবে।”
রাশা পরদিন জয়নব, জিতু আর মতিকে নিয়ে ঘুরতে বের হলো। রাশা একটু অবাক হয়ে আবিষ্কার করল গ্রামের অনেকেরই ছোটখাটো নৌকা আছে। যাদের নৌকা নাই তাদের অনেকেরই ডোঙ্গা নামে নৌকার মতো একটা জিনিস আছে। তালগাছের মাঝে গর্ত করে এই ডোঙ্গা তৈরি করা হয়, একজন মানুষ বসে সেটাকে বেয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু রাশাদের দিয়ে দেয়ার মতো বাড়তি একটা নৌকা কারো নেই। চারজন একটু হতাশ হয়ে ফিরে আসছিল, কিভাবে সমস্যাটা মেটানো যায় সেটা নিয়ে জোর আলোচনা হচ্ছে, তখন জিতু বলল, “আমরা কলাগাছ দিয়ে একটা ভেলা বানাতে পারি।”
“ভেলা?”
“হ্যাঁ। সেই ভেলায় করে আমরা স্কুলে যেতে পারি।”
মতি কম কথার মানুষ, সে কোনো কথা না বলে হাসার ভঙ্গি করল। জিতু রেগে বলল, “কী হলো, তুমি হাস কেন?”
“তোর কথা শুনে।”
“আমার কোন কথাটা হাসির?”
“যদি কলাগাছের ভেলা দিয়ে স্কুলে যেতে হয় তাহলে দিনে দুইটা করে ভেলা বানাতে হবে। যাওয়ার জন্যে একটা আসার জন্যে আরেকটা! এই দশ গ্রামের যত কলাগাছ আছে সব কেটে ফেলতে হবে!”
জিতু চিৎকার করে বলল, “কেন দশ গ্রামের কলাগাছ কাটতে হবে? কেন কাটতে হবে?”
ঠিক তখন শুনল, কে জানি বলছে, “কী ব্যাপার তোমরা কী কাটাকাটি করতে চাইছ?”
তারা তাকিয়ে দেখে গাছে হেলান দিয়ে সালাম নানা বসে আছেন। হাতে একটা বই, মনে হয় চোখের খুব কাছে ধরে বইটা পড়ছিলেন, তাদের চেঁচামেচি শুনে এখন তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
চারজনই দাঁড়িয়ে গিয়ে সালাম দিল। সালাম নানা বললেন, “কী ব্যাপার, তোমরা এই সকালে কী কাটাকাটি করতে চাইছ?”
রাশা হাসল, “আমাদের জিতু মিয়া কলাগাছ কেটে ভেলা তৈরি করতে চাচ্ছে।”
“ভেলা? কলাগাছের ভেলা?” রাশা একটু গিয়ে সালাম নানার কাছে বসে পড়ে–তার দেখাদেখি অন্যেরাও। সালাম নানার ক্রাচ দুটো পাশে শুইয়ে রাখা ছিল, জিতু সাবধানে সেগুলো একবার ছুঁয়ে দেখল। রাশা বলল, “আসলে আমরা নৌকা খুঁজতে বের হয়েছিলাম। নৌকা পাই নাই তাই জিতু বলল কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানাবে।”
“নৌকা! নৌকা কী জন্যে?”
“রাস্তা ডুবে গেছে, তাই স্কুল যেতে পারছি না। একটা নৌকা হলে স্কুলে যাওয়া যেত সে জন্যে।”
সালাম নানা এবারে একটু ঘুরে চারজনের এই ছোট দলটার দিকে ভালো করে তাকালেন, তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “তার মানে মজা করার জন্যে নৌকা খুঁজছ না? রীতিমতো স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া করার জন্যে নৌকা খুঁজছ?”
“জি নানা।” রাশা মাথা নাড়ল, তার দেখাদেখি অন্যেরাও।
“হুম।” নানা এবার চশমা খুলে শার্টের কোনা দিয়ে চশমাটা মুছে বললেন, “এরকম একটা মহৎ কাজে আমাদের তো সাহায্য করা দরকার। কী বলো?”
রাশার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, “আপনার নৌকা আছে নানা? আছে?”
“নাই। কিন্তু তাতে কী আছে? আমি তোমাদের নৌকা জোগাড় করে দেব!”
“সত্যি? সত্যি?” রাশার চোখ-মুখ আনন্দে ঝলমল করতে থাকে।
“হ্যাঁ, সত্যি।”
“কোথা থেকে জোগাড় করবেন?”
“বাংলাদেশে নৌকা জোগাড় করা কোনো ব্যাপার নাকি? সারা দেশটাই তো চলে নৌকা দিয়ে। যুদ্ধের সময় আমরা সবসময়ে নৌকার ওপর ছিলাম। যুদ্ধের সময় আধঘণ্টার নোটিশে পাঁচ-দশটা নৌকা জোগাড় করেছি আর এখন শাস্তির সময় বাচ্চাদের স্কুলে যাবার জন্য নৌকা জোগাড় করতে পারব না? কী মনে করো তুমি আমাকে?”
জয়নব মাথা নাড়ল, “পারবেন নানা। আপনি চাইলেই পারবেন।
জিতু জানতে চাইল, “নৌকাটা কি আপনি কিনবেন?”
“কেন তো সোজা! তার থেকেও বেশি কিছু করব।”
“কী করবেন, বলেন না, নানা!” রাশা অনুনয় করল, “প্লিজ!”
নানা আবার চোখ থেকে চশমা খুলে সেটা মুছলেন, তারপর চোখে লাগিয়ে বললেন, “আমার একজন বন্ধু আছে, নাম হচ্ছে গৌরাঙ্গ। সে হচ্ছে ঘরামি। সে নৌকা বানায়। বহুদিন তার সাথে যোগাযোগ নাই। কয়দিন থেকে ভাবছিলাম তার একটু খোঁজ নিই। এখন তোমাদের অছিলায় তার সাথে যোগাযোগ করার একটা সুযোগ হলো, তাকে বল আসতে। গল্পগুজব করবে, তোমাদের একটা নৌকা বানিয়ে দেবে।”
