“কিন্তু পুলিশ আসলে তাদের সমস্যা কী? তারা কী চোর না ডাকাত?”
যারা হাজির ছিল তারা কেউ এর উত্তর দিতে পারল না, তখন রাশা বলল, “আসলে চাচা, চুরি-ভাকাতি অপরাধ, আবার আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়ে বিয়ে করাও অপরাধ। মনে হয় সেই জন্যে!”
সানজিদার বাবা চোখ বড় বড় করে রাশার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কে?”
“আমি সানজিদার সাথে পড়ি।”
“তুমি কখন এসেছ?”
“সানজিদার বিয়ের খবর শুনেই স্কুল থেকে ছুটতে ছুটতে চলে এসেছি।”
সানজিদার বাবার হঠাৎ কী যেন সন্দেহ হলো, জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কি?”
“আমার নাম রাশা।”
সানজিদার বাবার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, বললেন, “তুমি সেই মেয়ে, তোমাদের এক মাস্টারের চাকরি গিয়েছে তাকে তুমি ধরিয়ে দিয়েছ?”
রাশা ঠিক বুঝতে পারল না সানজিদার বাবা এটা প্রশংসা হিসেবে বলছেন নাকি অভিযোগ করে বলছেন। তাই সে ইতস্তত করে বলল, “আমি আসলে কিছু করি নাই। ডিসি সাহেব এসপি সাহেব ছিলেন, তারা খুব রাগ করলেন—”
হঠাৎ করে সানজিদার বাবা কিছু একটা অনুমান করলেন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাশার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কী পুলিশ খবর দিয়েছ?”
“জি না আমি পুলিশকে কিছু বলি নাই।” একটু ইতস্তত করে বলল, “তবে—”
“তবে কী?”
“বরপক্ষ মনে করেছে আমি বলেছি। তাতেই যা ভয় পেয়েছে।”
সানজিদার বাবা বিস্ফারিত চোখে রাশার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাকে দেখে মনে হতে লাগল, নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি রাগবেন না হাসবেন বুঝতে পারছিলেন না, কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন
তখন রাশা বলল, “চাচা, ভালোই হয়েছে বর পার্টি ভেগে গেছে!”
“কী বললে? ভালো হয়েছে?”
“জি চাচা। কমবয়সী মেয়ের বিয়ে দিলে অনেক ঝামেলা। আপনিও বিপদে পড়তেন।”
সানজিদার বাৰা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে রাশার দিকে তাকিয়েছিলেন, তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে এইটুকুন একটা মেয়ে তাকে বড় মানুষের মতো উপদেশ দিচ্ছে। তিনি রেগে উঠার চেষ্টা করছিলেন, তখন রাশা বলল, “চাচা, আপনি যাই বলেন, জামাইটাকে আমার একদম পছন্দ হয় নাই। গাল ভাঙা, শুকনা দেখে মনে হয় যক্ষ্মারোগী। ভালো করে কথাও বলতে পারে না, মনে হয় তোতলা! আমাদের সানজিদার বিয়ে হবে স্মার্ট একটা ছেলের সাথে। ডাক্তার না হলে ইঞ্জিনিয়ার না হলে পাইলট। আমরা সবাই গেট ধরব–এক লক্ষ টাকার এক পয়সা কম দিলে আমরা গেট ছাড়ব না!”
“কত বললে? এক লক্ষ টাকা?”
“জি। সানজিদার জামাইয়ের কাছে এক লক্ষ টাকা হবে হাতের ময়লা!”
“হাতের ময়লা?”
“জি চাচা। সানজিদা এত সুন্দর তার সাথে এইরকম ভুসভুসা জামাই মানায় না চাচা।”
আশেপাশে যারা দাঁড়িয়েছিলেন তাদের একজন মাথা নেড়ে বলল, “কথাটা ঠিক। জামাইয়ের চেহারাটা জানি কেমন।”
আরেকজন বলল, “শুধু জামাই কেন? জামাইয়ের বাপের চেহারাও তো খাটাশের মতো।”
“শুধু চেহারা খাটাশের মতো না, স্বভাব-চরিত্রও জানি কেমন? আগে কথা বলেছে যে দেয়া-থোয়া লাগবে না, এখন বলে মোটরসাইকেল না দিলে বিয়া হবে না! কী ছোটলোক।”
সানজিদার বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মনে হয় আল্লাহ্ যেটা করেন ভালোর জন্যেই করেন।”
রাশা মাথা নাড়ল, বলল, “জি চাচা সেইটা সত্যি কথা।”
সানজিদার বাবা মাথা ঘুরিয়ে রাশার দিকে তাকালেন, রাশা বলল, “চাচা, আমি কি সানজিদার সাথে একটু দেখা করতে পারি?”
“যাও। ভিতরে যাও।”
“চাচা, আরেকটা কথা চাচা।”
“কী কথা?”
কালকে থেকে সানজিদাকে আবার স্কুলে পাঠাবেন। প্লিজ। সে লেখাপড়ায় এত ভালো!”
সানজিদার বাবা কিছুক্ষণ রাশার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “ঠিক আছে।”
সানজিদাকে একটা লাল শাড়ি পরানো হয়েছে, রাশাকে দেখে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। রাশা বলল, “এই মেয়ে, কাঁদছিস কেন বোকার মতো? তোর জামাই ভেগে গেছে, তোর আর চিন্তা নাই।” তারপর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তোকে যা সুন্দর লাগছে। আমি ছেলে হলে নির্ঘাত তোকে বিয়ে করতাম!”
বয়স্ক একজন মহিলা মাথায় থাবা দিয়ে বললেন, “এত রান্নাবান্না হয়েছে, এতো খাবার এখন কী করব?” রাশা মাথা ঘুরিয়ে বলল, “সেটা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না খালাম্মা। আমাদের ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে চলে আসবে! অনশন করতে এসে পেট ভরে খেয়ে যাবে! হি হি হি…”
১০. গৌরাঙ্গ ঘরামি
সকালবেলা জিতু দেখা করতে এলো, তার মুখে এগাল-গাল জোড়া হাসি। রাশাকে দেখে বলল, “কাজ হয়েছে!”
“কী কাজ?”
“রাস্তা ডুবে গেছে।”
“কোন রাস্তা?”
“স্কুলে যাবার রাস্তা। আর স্কুলে যেতে হবে না।” জিতুর মুখের হাসি আরো বিস্তৃত হলো।
“সর্বনাশ! তাহলে কী হবে?”
“কী আর হবে। আমরা বাড়িতে বসে থাকব।”
“কি স্কুলে না গেলে কেমন করে হবে? মনে নাই আমাদের কম্পিউটারের ল্যাবরেটরিটা মাত্র তৈরি হলো। এখন কম্পিউটার ডেলিভারি দেবে?”
জিতুর মনে আছে, কিন্তু স্কুলে যেতে না হওয়ার আনন্দ অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। রাশা জিতুর কথা পুরোপুরি বিশ্বাস না করে নিজে একটু খোঁজখবর নিল। সত্যি সত্যি স্কুলের রাস্তা জায়গায় জায়গায় ডুবে গেছে। জায়গায় জায়গায় হাঁটুপানি, জুতো হাতে নিয়ে চলে যাওয়া যায়। কয়দিন পর পানি আরো বাড়বে, বুকপানি গলাপানি হয়ে যেতে পারে। রাশা একটু দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। জয়নবের সাথে সেটা নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন জয়নব বলল, “দরকার হচ্ছে নৌকা।”
