রাশা এবারে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, ফোনটা এস.পি, সাহেবকে দিতে যতক্ষণ সময় লাগার কথা ততক্ষণ সময় দিয়ে সে এবারে এস.পি. সাহেবের সাথে কথা বলার অভিনয় করতে থাকে, “মালিকুম।” একটু বিরতি, তারপর হাসি হাসি মুখে, “জি জি ভালো আছি। আমরা সবাই ভালো আছি।” একটু বিরতি তারপর হঠাৎ খুবই গম্ভীর গলায়, “আপনি যখন আমাদের স্কুলে এসেছিলেন, তখন মনে আছে আমার সাথে সুন্দর একটা মেয়ে ছিল, সানজিদা? সেই মেয়েটাকে তার বাবা-মা জোর করে একটা মানুষের সাথে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। আমাদের দেশে আইন আছে না আঠারো বছরের কম হলে বিয়ে দেওয়া যাবে না? তাহলে?”
রাশা এবারে কিছুক্ষণ শোনার ভান করল, হুঁ-হ্যাঁ করল তারপর উত্তেজিত গলায় বলল, “খুবই ভালো হয় তাহলে! খুবই ভালো হয়। সবাইকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে? হাতে হ্যান্ডকাফ দিয়ে কোমরে দড়ি? ইস! কী মজা হবে! কখন আসবে পুলিশ?”
কিছুক্ষণ আবার শোনার ভান করল, তারপর বলল, “আধাঘণ্টার মাঝে? গুড!” একটু বিরতি, তারপর, “না না আমি কাউকে বলব না। ওরা কেউ জানতে পারবে না। তারপর হঠাৎ মনে পড়েছে সেরকম ভান করে বলল, “স্যার, স্যার আপনি কি সাথে কোনো সাংবাদিক পাঠাতে পারবেন? তাহলে যখন অ্যারেস্ট করে তখন ছবি তুলতে পারত। পত্রিকায় ছাপা হতো, নাবালিকা বিবাহ করিতে গিয়ে জামাই গ্রেপ্তার।” রাশ তখন হি হি করে অনেকক্ষণ হাসল।
সে একবারও উপর দিকে তাকাল না কিন্তু চোখের কোনা দিয়ে বুঝতে পারল সেখানে রজব আলী দাঁড়িয়ে সবকিছু শুনছে যা যা বলা দরকার সব সে বলে দিয়েছে এখন আর রজব আলীকে কিছু শোনানো দরকার নেই। কাজেই সে ফোনে কথা বলার ভঙ্গি করে হেঁটে হেঁটে একটু সরে এলো। তার খুব ইচ্ছে করছিল একবার চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে রজব আলী মানুষটার মুখের ভাব কেমন হয়েছে কিন্তু সে কোনো ঝুঁকি নিল না।
কিছুক্ষণের মাঝে জয়নব এসে রাশার সাথে যোগ দিয়ে হাত-পা নেড়ে চোখ উপরে তুলে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, রাশা থামাল, বলল, “জয়নব, খবরদার বেশি খুশি হবি না। খুবই নরমাল ভাব দেখা–এখন কিন্তু আমাকে অনেকে লক্ষ করবে। আমার সাথে সাথে তাকেও।”
জয়নব তখন বাড়াবাড়ি খুশির ভঙ্গিটা চেপে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কী মজা হয়েছে তুই চিন্তা করতে পারবি না।”
“কেন? কী হয়েছে?”
“তোর কথা শুনে গজব আলীর মনে হয় ভয়ে কাপড় নষ্ট হয়ে গেছে। ভিতরে হইচই শুরু হয়ে গেছে। ফিসফিস করে শুধু কথা বলে একজন আরেকজনের সাথে!”
রাশা মুখ টিপে বলল, “এখন আরেকটা কাজ বাকি।”
“কী?”
“ভিতরে গিয়ে গুজব ছড়িয়ে দিতে হবে রাস্তার মোড়ে অনেক পুলিশ দেখা গেছে।”
“কিভাবে ছড়াবি?”
“খুবই সোজা, খালি কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করব, পুলিশ কেন আসছে?”
জয়নব চোখ কপালে তুলে রাশাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, “ইস! তুই যা পাজি! তোর মাথায় যা ফিচলি বুদ্ধি।”
“শব্দটা ফিচলি না। শব্দটা ফিচলে।”
রাশা আর জয়নব এবার বাড়ির উঠানে গিয়ে প্রথম যে মানুষটাকে পেল তাকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা আপনি কি জানেন, পুলিশ কেন আসছে?”
মানুষটা অবাক হয়ে বলল, “পুলিশ? পুলিশ কেন আসবে?”
“আমি জানি না, তাই আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম।”
“কোথায় পুলিশ?”
“ঐ রাস্তার মোড়ে। তাই তো বলল।”
“কে বলল?”
রাশা ঠোঁট উল্টে বলল, “ঐ যে একজন, চিনি না আমি!”
মানুষটাও মাথা নেড়ে হেঁটে চলে গেল, তখন তারা একটু সামনে গিয়ে বুড়োমতন একজনকে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, এখানে কী কিছু হয়েছে?”
“না তো। কিছু হয়নি।”
“তাহলে পুলিশ কেন আসছে?”
“পুলিশ আসছে নাকি?”
“আমি তো জানি না–” বলে রাশা হেঁটে চলে গেল।
.
কয়েক মিনিটের ভেতর পুরো বাড়িতে গুজব রটে গেল যে পুলিশ আসছে, শুধু যে আসছে তা নয়, কয়েকজন বলল, তারা পুলিশকে দেখেও ফেলেছে। তারপর যা একটা মজা হলো সেটা দেখার মতো! রজব আলী তার গলা থেকে মালা খুলে, টুপি পকেটে ভরে কোনোমতে তার স্যান্ডেল পরে রীতিমতো দৌড়। সাথে সাথে বুড়ো আধবুড়ো যারা আছে তারাও।
রাশা দেখল সানজিদার বাবা অবাক হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?”
মানুষটা মুখ খিঁচিয়ে বলল, “আপনারা মানুষ খুব খারাপ, বিয়ে করাতে ডেকে এনে পুলিশ খবর দেন!”
সানজিদার বাবা চোখ কপালে তুলে বললেন, “আমরা? আমরা পুলিশ কখন খবর দিলাম?”
মানুষটার সেটা ব্যাখ্যা করার সময় নাই, কোনোমতে পায়ে স্যান্ডেল পরে ছুটতে থাকে।
রাশা আর জয়নব কোনোমতে হাসি চেপে রজব আলীর পিছনে পিছনে ছুটতে থাকে, চিৎকার করে ডাকে, “দুলাভাই! দুলাভাই?”
মানুষটা পিছনে ফিরে রাশাকে দেখে আঁতকে ওঠে। রাশা মিষ্টি করে বলল, “আপনারা চলে যাচ্ছেন কেন? বসেন। একটুক্ষণ বসেন। প্লিজ!”।
মানুষটা হাত তুলে রাশাকে দেখিয়ে বলল, “তু-তু-তুমি। তু-তু-তুমি!”
“আমি কী?”
“ম-মনে করেছ আমি কি-কিছু জানি না। আমি সব জানি।”
“কী জানেন?”
রজব আলী সেটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল না। রাস্তা ছেড়ে মাঠের মাঝখান দিয়ে ছুটতে লাগল।
বাড়ির সামনে সবাই অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এখনো কেউ বুঝতে পারছে না কী হয়েছে। সানজিদার বাবা হতভম্বের মতো এদিক-সেদিক তাকিয়ে বললেন, “কী হয়েছে? আমি এখনো বুঝতে পারছি না।”
একজন বলল, “পুলিশ আসছে, পুলিশ আসছে বলে সবাই ছুটতে লাগল।”
