“আপনি গরিব মানুষ মানলাম, কিন্তু আমাদের ছেলে গ্রামের মাঝে একজন সম্মানী মানুষ। সে যখন বউ নিয়ে যাবে, তখন দশজন জিজ্ঞেস করবে শ্বশুরবাড়ি থেকে কী দিল? তখন আমরা কী বলব? হ্যাঁ?”
“কিন্তু সেইরকম তো কথা ছিল না। যখন বিয়ের আলাপ হয় তখন আপনারা বলেছেন কোনোরকম দেয়া-থোয়া নাই। সুন্দর একটা বউ হলেই হবে। আমার মেয়ে ফুলের মতন সুন্দর—”
ধুরন্ধর মানুষটা বলল, “আরে, সুন্দর না হলে কি আমরা এই বাড়িতে আসি—”
রাশার মনে হলো মানুষটার টুঁটি চেপে ধরে, কিন্তু সে টুঁটি চেপে ধরল! সেখান থেকে সরে এলো। এরকম নির্লজ্জভাবে কেউ কথা বলতে পারে সে কখনো কল্পনাও করেনি। এতক্ষণ তার মাঝে একটু দুশ্চিন্তা ছিল, এখন তার সাথে যোগ হলো রাগ। মোটামুটি সে ঠিক করে ফেলেছে, যা হয় হবে সে কিছু একটা করে ফেলবে আজ।
জয়নব বাড়ির ভেতর থেকে ঘুরে এসেছে, রাশা জিজ্ঞেস করল, “দেখেছিস সানজিদাকে?”
“না। একটা ঘরের ভিতর বন্ধ করে রেখেছে।”
রাশা কোনো কথা না বলে একটা নিশ্বাস ফেলল।
জয়নব জিজ্ঞেস করল, “কী করবি ঠিক করেছিস?”
রাশা মাথা নাড়ল, “এখনো ঠিক করি নাই।”
“জামাইকে গিয়ে সোজাসুজি বলে দেখলে হয়। বলবি, মেয়ের বয়স মাত্র চৌদ্দ। চৌদ্দ বছরের মেয়েকে বিয়ে করা বেআইনি। একটু ভয় দেখা।”
“কিভাবে ভয় দেখাব?”
“বল যদি বিয়ে করে তাহলে আমরা পুলিশকে খবর দিব। এস.পি. ডি.সি. আমাদের পরিচিত। মনে নাই তুই যখন কম্পিউটারে রাজ্জাক স্যারের ছবি দেখালি-”
রাশার চোখ হঠাৎ চকচক করে উঠে, সে ফিসফিস করে বলল, “আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।”
“কী আইডিয়া?”
“আমার একটা মোবাইল ফোন দরকার।”
জয়নবের মুখের আলো দপ করে নিভে গেল। বলল, “মোবাইল ফোন এখন কোথায় পাব?”
“সত্যিকারের মোবাইল ফোন না হলেও হবে। খেলনা হলেও হবে।”
“খেলনা মোবাইল ফোনই আমি কোথায় পাব?”
“দেখতে মোবাইল ফোনের মতো কোনো কিছু হলেও হবে।”
“কেন? কী করবি আগে শুনি।”
“আমি ভান করব মোবাইল ফোনে কথা বলছি। ঐ যে শুটকা জামাইটা দেখছিস, তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথা বলব।”
“তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কী বলবি?”
“এমন ভান করব যেন আমি পুলিশকে ফোন করে বলছি যে এখানে আঠারো বছরের কম বয়সের একটা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে আর সে জন্যে তারা যেন তাকে ধরতে আসে, এই সব।”
জয়নব কিছুক্ষণ চিন্তা করে মাথা নাড়ল, বলল, “মন্দ না বুদ্ধিটা। মনে হয় কাজ করতেও পারে। ভয় দেখাতে হবে শুটকা জামাইকে। কিন্তু—”
“কিন্তু কী?”
“কিন্তু জামাইকে শোনাবি কেমন করে?”
“জামাইটা ঐ জানালার কাছে বসেছে না? আমি জানালার ঐ পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কথা বলব যেন শুনতে পায়।”
“কিন্তু ঐ পাশে কি দাঁড়ানোর জায়গা আছে? ঝোঁপঝাড়-”
“ঝোঁপঝাড়ই তো ভালো।”
জয়নব বলল, “না শুনলে তো হবে না–যেভাবে হোক কথাগুলো শোনাতে হবে।”
“হ্যাঁ। লিকলিকে জামাইয়ের নামটা আগে জেনে নিই, জোরে জোরে কয়েকবার নামটা বলব, তাহলেই মানুষটার কৌতূহল হবে। শুনতে চাইবে কে তার নাম বলছে।”
জয়নব মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিক বলেছিস।”
“এখন দরকার, একটা মোবাইল ফোন না হলে মোবাইল ফোনের মতো দেখতে কোনো জিনিস।”
রাশা আর জয়নব তখন চারপাশে খুঁজতে থাকে। ঠিক তখন একজন মানুষ সিগারেট ধরানোর জন্যে পকেট থেকে একটা ম্যাচের বাক্স বের করে ফস করে একটা কাঠি জ্বালিয়ে খালি বাক্সটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। মানুষটা এগিয়ে যাবার পর জয়নব ম্যাচের বাক্সটা তুলে এনে বলল, “এই যে নে তোর মোবাইল ফোন।”
“ম্যাচের বাক্স?”
“হ্যাঁ, এমনভাবে ধরবি যে শুধু উপরের অংশটা যেন দেখতে পায়, নিচে কী আছে কেউ জানবে না।”
রাশা একটু সরে গিয়ে ম্যাচের বাক্সটা একটু খুলে সেটাকে মোবাইল ফোনের মতো ধরে একটু প্রাকটিস করল, কেউ যদি না জানে তাহলে ভাবতে পারে যে সে আসলেই মোবাইল ফোনে কথা বলছে। রাশা জয়নবের দিকে তাকিয়ে বলল, “যা এবারে তুই জামাইয়ের নামটা জেনে আয়।”
জয়নব চলে গেল, কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে বলল, “শুটকো জামাইয়ের নাম রজব আলী। বাবার নাম-”
“থাক বাবার নামের দরকার নাই, আমি পরে উল্টোপাল্টা করে ফেলব। রজব আলী। নাম হওয়া উচিত ছিল গজব আলী।”
রাশা জয়নবের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে। আমি এখন যাচ্ছি। আমাকে আবার কুলহু আল্লাহ্ পড়ে ফুঁ দে।”
জয়নব আবার কুলহু আল্লাহ পড়ে রাশার বুকে ফুঁ দিল।
.
রাশা ঘরটার পেছনে ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে জানালার নিচে দাঁড়াল। ঠিক জানালার নিচে দাঁড়িয়েছে কিনা বোঝার চেষ্টা করতেই উপর থেকে রজব আলী স্বয়ং গলা খাকারি দিয়ে থুথু ফেলল, একটুর জন্যে রাশা বেঁচে গেল আরেকটু হলে তার মাথায় পড়ত।
রাশা ম্যাচের খালি বাক্সটা মোবাইল ফোনের মতো করে ধরে গলা উচিয়ে বলল, “রজব আলী, রজব আলী, বললাম তো নাম রজব আলী।”
রাশা সরাসরি তাকাল না, কিন্তু তার মনে হলো কাজ হয়েছে। সুতি সত্যি রজব আলী নিজের নাম শুনে জানালায় উঁকি দিয়েছে। রাশা না দেখার ভান করে বলল, “হ্যাঁ। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর সানজিদার বয়স আঠারো থেকে কম। সানজিদা আমার সাথে পড়ে আমি জানি।”
রাশা এবারে কিছুক্ষণ শোনার ভান করল, তারপর বলল, “দেখেন, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে একটা চিপা থেকে ফোন করছি, আমার হাতে সময় নাই, আপনি বরং এস.পি, সাহেবকে দেন। এসপি, সাহেব আমাদের স্কুলে এসেছিলেন, তখন একটা ঘটনা ঘটেছিল সেই থেকে এস.পি, সাহেব আর ডি.সি. সাহেব আমাকে খুব ভালো করে চিনেন। আপনি বলেন রাশা কথা বলতে চায়। রা-শা।”
