“গিয়ে বলব সানজিদাকে বিয়ে দিতে পারবে না। আঠারো বছরের আগে কোনো মেয়েকে বিয়ে দেওয়া বেআইনি।”
“তুই ভাবছিস সানজিদার বাপ-চাচারা তোর কথা শুনবে?”
“কেন শুনবে না?”
“আয়নাতে কোনোদিন তুই নিজেকে দেখেছিস?”
“কেন দেখব না? একশবার দেখেছি।”
“দেখিস নাই। দেখলে তুই জানতি তুই হচ্ছিস পুঁচকি একটা মানুষ। তার ওপর মেয়েমানুষ। তোর কথা কেউ শুনবে না।”
“শব্দটা হচ্ছে পুঁচকে। পুঁচকি না। তা ছাড়া মানুষ, মেয়ে মানুষে কিছু আসে যায় না। সত্যি কথা যে কেউ বলতে পারে, ছোট-বড় পুরুষ-মেয়ে কিছুতে কিছু আসে যায় না।”
“ঠিক আছে। যা, যখন সানজিদার বাপ-চাচা তোকে দৌড়িয়ে দেবে তখন আমাকে দোষ দিস না।”
“আমি কি একা যাব নাকি?”
“কাকে নিয়ে যাবি?”
“তোকে।”
“আমাকে?”
“হ্যাঁ, চল যাই।”
জয়নব কিছুক্ষণ রাশার দিকে তাকিয়ে হতাশভাবে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “তোর সাথে থেকে আমি যে কোনদিন কী বিপদে পড়ব, খোদাই জানে।
রাশ বলল, “চল আমরা দুইজন গিয়ে সানজিদার বাসাটা আগে চিনে আসি। তারপর ক্লাসের সব ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাড়িটা ঘেরাও করব। মানববন্ধন করব। অনশন করব।”
জয়নব বলল, “তুই গ্রামের মানুষকে চিনিস না!”
“না চিনলে নাই। আয় যাই।”
জিতু বলল, “আমিও যাব।”
রাশা বলল, “না, তুই এখন থাক। যখন পুরো ক্লাস নিয়ে যাব তখন তুই যাবি। আমি আমাদের ক্লাসের ছেলেমেয়েদের জন্যে একটা চিঠি লিখে যাচ্ছি, ছেলেমেয়েরা এলে তুই দিয়ে দিস। আমরা যাব, বাড়িটা চিনেই চলে আসব। আমাদের বই-খাতা রেখে যাচ্ছি, তুই দেখে রাখিস।”
রাশা তার ক্লাসের ছেলেমেয়েদের একটা চিঠি লিখে সেটা জিতুর হাতে দিল। জিতু একটু মন খারাপ করে সেই চিঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, রাশা তখন জয়নবকে নিয়ে ঢ্যাঙ্গা ছেলেটার সাথে রওনা দিল। জয়নব বিড়বিড় করে বলল, “যদি কোনোভাবে বাড়িতে খবর পায় আমি স্কুল পালিয়ে তোর সাথে আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি তাহলে আমার কপালে দুঃখ আছে।”
“দুঃখ থাকলে থাকবে। আমরা যাচ্ছি সানজিদাকে রক্ষা করতে। সে লিখেছে তাকে উদ্ধার করতে না পারলে গলায় দড়ি দিবে মনে আছে?”
জয়নব মাথা নাড়ল, বলল, “তা ঠিক।”
ঢ্যাঙ্গা ছেলেটার সাথে রওনা দিয়ে একটু পরেই রাশা বুঝতে পারল কাজটা তারা বুদ্ধিমানের মতোই করেছে। ছেলেটা এমন বিচিত্র সব রাস্তা ঘাট দিয়ে যেতে লাগল যে রাশা বুঝতে পারল সে কোনোদিন একা একা এখানে আসতে পারত না। ছেলেটা বলেছিল বাড়িটা কাছেই, কিন্তু রাশার বোঝা উচিত ছিল গ্রামের মানুষের কাছে কাছে কিংবা দূরে শব্দগুলোর কোনো অর্থ নেই। হেঁটে হেঁটে যেখানে যাওয়া সম্ভব সেটাই হচ্ছে কাছে।
শেষ পর্যন্ত যখন তারা সানজিদার বাড়িতে পৌঁছল তখন রাশা আর জয়নব দুজনেই ঘেমে-নেয়ে উঠেছে। ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা বলল, “বরযাত্রী চলে এসেছে মনে হয়।”
রাশ চমকে উঠে বলল, “বরযাত্রী চলে এসেছে? সানজিদা যে বলল দুপুরে? এখন তো সকাল।”
জয়নব বলল, “গ্রামের মানুষের কাছে সকাল-দুপুর এক ব্যাপার। তাদের কাছে পার্থক্য শুধু দুইটা, দিন আর রাত।”
“সর্বনাশ। এখন যদি জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়?”
জয়নব কোনো কথা বলল না, মুখ শক্ত করে রাশার দিকে তাকাল। রাশা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিন্তা করল, তারপর একটা নিশ্বাস ফেলে ঢ্যাঙ্গা ছেলেটাকে বলল, “তুমি কি আমাকে সানজিদার বাপের কাছে নিয়ে যাবে?”
ছেলেটা বলল, “মাথা খারাপ? আমার ঘাড়ে দুইটা মাথা? আমি তোমাদের কারো কাছে নিতে পারব না। তোমরা নিজেরা যার কাছে যেতে চাঁও যাও।”
রাশা বলল, “তাহলে অন্তত একটা জিনিস করো।”
“কী?”
“কাউকে বলো না আমরা সানজিদার স্কুল থেকে এসেছি। ঠিক আছে?”
“ঠিক আছে।”
রাশা জয়নবকে বলল, “চল যাই।”
“দাঁড়া।”
“কী হলো?”
“তিনবার কুলহু আল্লা পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে দিই।”
জয়নব তিনবার কুলহু আল্লা পড়ে প্রথমে নিজের বুকে তারপর রাশার বুকে ফুঁ দিল। তারপর দুজন সানজিদার বাড়িতে গিয়ে ঢুকল।
বিয়ে বাড়িতে আরো অনেক হইচই হয়, আরো অনেক আনন্দের ছাপ থাকে। এখানে আনন্দের ছাপ নেই, মানুষজন একটু গম্ভীর মুখে ঘোরাঘুরি করছে। খুব বেশি মানুষ নেই, ছোট বাচ্চারা সেজেগুজে ছোটাছুটি করছে সেরকম দেখা গেল না। রাশা এবং জয়নব যে বাইরে থেকে এসেছে সেটা কেউ ধরতে পারল না, দুপক্ষই ধরে নিল তারা অন্যপক্ষের।
ভিতরে ঢুকেই তারা বরযাত্রীর দলটাকে আবিষ্কার করল। যে মানুষটা বিয়ে করতে এসেছে সে যক্ষ্মা রোগীর মতো শুকনো, গাল ভেঙে ঢুকে গেছে। গায়ের রঙ বিবর্ণ। একটা সিল্কের পাঞ্জাবি পরে এসেছে, মাথায় পাগড়ির বদলে একটা টুপি। গলায় একটা মালা, কোরবানির সময় কোরবানির গরুর গলায় এরকম মালা দেয়, রাশা এর আগে কখনো মানুষকে এরকম মালা পরতে দেখেনি। কিছু নানা বয়সী মানুষ ঘরে গম্ভীর মুখে বসে আছে।
উঠানে কয়েকটা চেয়ার সেখানে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ নিচু গলায় কথা বলছে, মুখ দেখে মনে হয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। রাশা কাছাকাছি গিয়ে মানুষগুলোর কথী শোনার চেষ্টা করল, ধুরন্ধর টাইপের একজন বলল, “মোটরসাইকেল ছাড়া কী রকম হয়? আজকাল কি দেখেছেন মোটরসাইকেল ছাড়া কেউ বিয়ে দেয়?”
বয়স্ক একজন মানুষ, মনে হয় সানজিদার বাবা, ভীত মুখে বললেন, “মোটরসাইকেল আমি কোথা থেকে দেব। গরিব মানুষ–”
