নানি লক্ষ করেন তার হাতটা থরথর করে কাঁপছে। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যেতে চায়, সবকিছু কেমন যেন অস্পষ্ট হয়ে আসতে চায়। তার মাঝেও নানি স্থির হয়ে বসে থাকতে চান।
০৯. পাত্রী যখন সানজিদা
রাশা আর গ্রামের অন্য ছেলেমেয়েরা আজ একটু সকাল সকাল স্কুলে চলে এসেছে। প্রতিদিনই সবাই দলবেঁধে আসে, অনেকগুলো ছেলেমেয়ে তাই দেখা যায় কোনোদিন কারো ভাত খাওয়া হয়নি, কারো ইংরেজি খাতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কারো প্যান্টের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বোতামটা গেছে ছিঁড়ে, এক্ষুণি সেখানে বোতাম সেলাই করতে হবে। আবার কোনো কোনোদিন দেখা যায় কেউ মন ঠিক করতে পারছে না সে আজকে স্কুলে যাবে কি যাবে না–সব মিলিয়ে প্রতিদিনই অনেক সময় নষ্ট হয়, তাই বেশ আগে থেকেই স্কুলে যাওয়ার কাজ শুরু করতে হয়। আজকে কিভাবে কিভাবে জানি কারো দেরি হয়নি, তাই যখন স্কুলে এসেছে তখন স্কুলে আর কেউ পৌঁছায়নি, স্কুলের দপ্তরি মাত্র ক্লাসঘর খুলছে।
রাশা তখন বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসেছে আর ঠিক তখন ঢ্যাঙ্গা মতন একটা ছেলেকে ইতস্তত এদিক-সেদিক তাকিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। গ্রামের ছেলে চেহারায় তার স্পষ্ট ছাপ আছে। ছেলেটা ইতিউতি তাকিয়ে একটু এগিয়ে এসে জিতুকে জিজ্ঞেস করল, “ক্লাস এইট কোনখানে?”
জিতু হাত দিয়ে ক্লাস এইট দেখানোর চেষ্টা করে।
তখন রাশা জিজ্ঞেস করল, “কেন? ক্লাস এইটের কী হয়েছে?”
“একটা চিঠি।”
“চিঠি? কে দিয়েছে চিঠি?”
ছেলেটা এদিক-সেদিক তাকাল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, “সানজিদা।”
“দেখি! আমি ক্লাস এইটে পড়ি।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ সত্যি।”
“গোপনীয় চিঠি সানজিদা বলেছে ক্লাস এইটে দিতে। একটা মেয়ের নাম বলেছিল খাসা না মাসা
রাশা মুখ শক্ত করে বলল, “রাশা?”
“হ্যাঁ। হ্যাঁ, রাশা।”
“আমি রাশা। দেখি চিঠিটা।”
ছেলেটা আবার এদিক-সেদিক তাকাল তারপর তার বুক পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে রাশার হাতে দিল। কাগজে লেখা :
“আমার খুব বিপদ। আজকে দুপুরবেলা
আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবে।
তোমরা যদি আমাকে উদ্ধার না করো তাহলে
আমাকে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হবে।
-সানজিদা”
রাশা দুইবার চিঠিটা পড়ল, তারপর ফিসফিস করে বলল, “সর্বনাশ!” জয়নব পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
“আমাদের সানজিদাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।”
জয়নব একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “সবসময় এই এক ঘটনা। দেখিস একদিন আমাকেও জোর করে বিয়ে দিয়ে দিবে।”
“কক্ষণো না। আঠারো বছর হওয়ার আগে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যায়। এইটা বেআইনি।”
জয়নব বাঁকা করে হাসল, “তোর এই বেআইনি ঘটনার খবরটা কে জানছে?”
“আমরা জানাব।”
“কাকে জানাবি?”
“পুলিশকে।”
“পুলিশের তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নাই। তোর কথা শুনে যাবে বিয়ে থামাতে।”
কথাটা সত্যি। পুলিশ তার কথায় বিয়ে থামাতে যাবে বলে মনে হয়। রাশা দাঁত কামড়ে চিন্তা করছিল তখন ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা বলল, “আমি যাই।”
“কোথায়?”
“বাড়িতে। লুকিয়ে এসেছি, না গেলে সন্দেহ করবে।”
“তুমি সানজিদার কী হও?”
“ভাই। মামাতো ভাই।”
“সানজিদার কী অবস্থা?”
“খারাপ। কান্নাকাটি করছে। তাই ঘরের ভেতর দরজা বন্ধ করে আটকে রেখেছে।”
রাশা একটা নিশ্বাস ফেলল, “যে ছেলের সাথে বিয়ে দেবে, সেই ছেলে কী করে?”
“ছেলে? ছেলের সাথে বিয়ে দেবে নাকি। বিয়ে দেবে একটা বড় মানুষের সাথে।”
“একই কথা।” রাশা অধৈর্য হয়ে বলল, “কী করে সেই লোক?”
“কিছু করে না। জমিজিরাত আছে।”
রাশা ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল, বলল, “লেখাপড়া?”
ছেলেটা হাসার চেষ্টা করল, “লেখাপড়া? গ্রামের মানুষ লেখাপড়া করে কী করবে?”
“লেখাপড়া নাই কাজকর্ম নাই কিন্তু বিয়ে করার শখ?”
ছেলেটা উদাসমুখে বলল, “বিয়ে করার শখ তো সবারই থাকে!”
রাশা কোনো কথা না বলে ছেলেটার দিকে কটমট করে তাকাল, তখন ছেলেটা বলল, “আমি যাই।”
“দাঁড়াও, দাঁড়াও, সানজিদার বাড়ি কোথায় বলে যাও। কতদূর?”
“কাছেই। গোকুলপুর গ্রামে। বাবার নাম মাহতাব হোসেন। গিয়ে জিজ্ঞেস করলে বলে দেবে।”
“গ্রামের নাম কী বললে, গোকুলপুর?”
“না, গোকুলপুর।”
“তাই তো বললাম, গোকুলপুর।”
“উঁহু। তুমি বলেছ গোকুলপুর। আসলে নাম হচ্ছে গোকুলপুর।”
রাশা ভালো করে লক্ষ করেও তার আর এই ছেলের গোকুলপুরের উচ্চারণের মাঝে কোনো পার্থক্য খুঁজে পেল না। সে তাই হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “কেমন করে যেতে হয়?
“বাজারটা পার হয়ে দক্ষিণ দিকে যাবে।”
“আমি উত্তর-দক্ষিণ বুঝি না। ডানদিক না বামদিক বলো–”
ছেলেটাকে একটু বিভ্রান্ত দেখা গেল, রাশা যেরকম উত্তর-দক্ষিণ বুঝে না এই ছেলেটা সেরকম ডান-বাম বুঝে না। খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, “পুব দিক থেকে এলে বাম দিকে। আর পশ্চিম দিক থেকে এলে ডান দিকে।”
রাশা অধৈর্য হয়ে বলল, “পুব-পশ্চিম তো আমি জানি না!”
ছেলেটাও অধৈর্য হয়ে বলল, “বাজারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো সুখনকান্দি কোনদিকে–”
“একটু আগে না বললে গোকুলপুর। এখন সুখনকান্দি কেন বলছ?”
“সুখনকান্দির পুব দিকে হচ্ছে গোকুলপুর।”
রাশা হাল ছেড়ে দিল, বলল, “তুমি একটু দাঁড়াও। আমি তোমার সাথে যাব।”
জয়নব ভুরু কুঁচকে বলল, “তুই যাবি? এখন?”
“যেতে হবে না? অবশ্যই যেতে হবে।”
“গিয়ে কী করবি?”
