“হ্যাঁ। একটা বোতলের মাঝে পানি রেখে ছেড়ে দেব, দেখিস এটা কমপক্ষে একবছর বেঁচে থাকবে। তা ছাড়া আরো একটা জিনিস হবে।”
“কী হবে?”
“জোঁক বাতাসের চাপ বুঝতে পারে। ঝড় আসার আগে আগে দেখবি জোক পানি থেকে বের হয়ে আসবে।”
“যাহ।”
রাশা বলল, “সত্যি কথা। আমি ইন্টারনেটে পড়েছি।”
.
কাজেই জেঁকটাকে খুব সাবধানে বাড়ি এনে একটা প্লাস্টিকের বোতলে পানি ভরে সেখানে ছেড়ে দেয়া হলো। সেঁকটা বেশ আনন্দেই সেখানে ঘোরাঘুরি করতে লাগল।
রাশা বলল, “এই জোকটার একটা নাম দিতে হবে।”
“কী নাম দেবে?” জিতু মিয়ার চোখ আনন্দে চকচক করতে থাকে।
“তোরা বল।”
“তোমার রক্ত খেয়েছে, তাই এটার নাম দাও রক্তখেকো।”
“উঁহু। এটা বেশি কঠিন নাম, সোজা দেখে একটা নাম দে।”
“রক্ত খেয়ে যেমন ভোটকা হয়েছে। তাহলে এটার নাম দাও ভোটকা মিয়া। না হয় মটকু মিয়া।”
রাশা বলল, “ মটকু মিয়া নামটা ভালো। মটকু মিয়া নামটাই দেয়া যাক। কী বলিস?”
সবাই মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল।
নানি অবশ্যি মটকু মিয়াকে দেখে নাক-মুখ কুঁচকে বললেন, “জোঁক? বোতলের ভিতরে জোঁক? রাশা তোর কি ঘেন্না বলে কিছু নাই?”
“নানি এটার নাম হচ্ছে মটকু মিয়া।”
“জোঁকের আবার নামও আছে?”
“হ্যাঁ নানি। আমার রক্ত খেয়ে মোটা হয়েছে তাই মটকু মিয়া।”
“তুই আর কী কী রাখবি, আগের থেকে শুনে রাখি। সাপ, ব্যাঙ, বিছা?”
“না নানি, আর কিছু রাখব না। এই জোকটা আসলে হচ্ছে ব্যারোমিটার। যদি দেখো এটা পানি থেকে বের হয়ে উপরে উঠে যায় তাহলে বুঝবে সেদিন ঝড় হবে।”
নানি মাথা নাড়লেন, বললেন, “ঝড় হবে কি হবে না সেটা দেখার জন্যে তোর জোককে দেখতে হবে না। আকাশের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে।”
গ্রামে এমন কোনো মানুষ নেই কিংবা এমন কোনো গরু-ছাগল নেই যাকে সেঁক কামড়ায়নি, কাজেই জোঁক নিয়ে কারো আলাদা কৌতূহল থাকার কথা নয়, তারপরও মটকু মিয়া এখানকার সবার মাঝে জনপ্রিয় হয়ে গেল। এদিকে কেউ এলেই মটকু মিয়াকে একনজর দেখে যায়। মটকু মিয়া নিরিবিলি পানিতে গুটিশুটি মেরে শুয়ে বসে থাকে, তাকে ঘিরে যে অনেক উত্তেজনা সেটা সে জানেও না।
তবে মটকু মিয়া রাশার সম্মানটা নষ্ট করল না। একদিন দুপুরবেলা খুব গরম, কেমন যেন দম আটকানো একটা পরিবেশ। নানি বললেন, “দিনটা ভালো লাগছে না।”
রাশা বলল, “কেন নানি? দিনটা ভালো লাগছে না কেন?”
“ঝড় হবে মনে হয়।”
রাশা তখন তার মটকু মিয়াকে নিয়ে আসে, সত্যি সত্যি সেটা পানি থেকে বের হয়ে উপরে উঠে এসেছে। রাশা বলল, “নানি! তুমি ঠিকই বলেছ। এই দেখো মটকু মিয়া পানি থেকে বের হয়ে এসেছে। মনে হয় আজকে আসলেই ঝড় হবে।”
আসলেই কিছুক্ষণের মাঝে আকাশের এক কোনায় এক টুকরো কালো মেঘ দেখা গেল, তারপর দেখতে দেখতে পুরো আকাশ কালো হয়ে উঠল। রাশা নিশ্বাস বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, সে কখনো এমন কুচকুচে কালো এমন ক্রুদ্ধ আর এমন ভয়ঙ্কর আকাশ দেখেনি। কিছুক্ষণের মাঝে আকাশ চিরে বিদ্যুৎ ঝলকে উঠতে থাকে, সাথে সাথে মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন। প্রথমে এতটুকু বাতাস নেই, তারপর হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা দমকা হাওয়া এলো, গাছের পাতা, খড়কুটো উড়তে থাকে, ধুলায় চারিদিক ঢেকে যায়। গরু-বাছুর গলা ছেড়ে ডাকতে ডাকতে ছুটতে থাকে, পাখি তার স্বরে শব্দ করতে করতে উড়তে থাকে! রাশা বাইরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল, বাতাসের ঝাঁপটার জন্যে পরিচিত মাঠঘাট, গাছপালা সবকিছুকে কী বিচিত্র দেখাচ্ছে, মনে হচ্ছে তাকে বুঝি বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
নানি চিৎকার করে ডাকলেন, “রাশ ভিতরে আয়। এক্ষুণি ঝড় শুরু হবে।”
“আমি বাইরে থাকি নানি? বৃষ্টিতে ভিজি?” নানি অবাক হয়ে রাশার দিকে তাকালেন, জিজ্ঞেস করলেন, “কী বললি?”
“বলেছি বৃষ্টিতে ভিজি?”
নানি কয়েক মুহূর্ত রাশার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “ঠিক আছে।”
রাশা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রইল, প্রথমে বড় বড় কয়েকটা পানির ফোঁটা পড়ল, তারপর আরো কয়েকটা, তারপর আরো কয়েকটা। তারপর ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। রাশা তার দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে মুখ উপরে তুলে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে নাচতে থাকে। তার মনে হয় সে বুঝি কোনো এক জঙ্গলের আদিম একজন মানুষ, তার চারপাশে কেউ নেই, শুধু পশুপাখি, গাছপালা আর বনলতা। সেখানে সে নাচছে তার সাথে সাথে নাচছে বনের সব পশু, সব পাখি, সব গাছপালা! রাশা প্রথমে বিড়বিড় করে তারপর জোরে জোরে চেঁচিয়ে গাইতে লাগল :
“মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে
তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ।
তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে
তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ।”
রাশা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে নাচতে নাচতে গাইতে থাকে তখন হঠাৎ শুনল কে যেন ডাকছে, “রাশাপু রাশাপু—”
রাশা ঘুরে তাকাল, জিতু, মতি, জয়নব আরো অন্য বাচ্চারাও ভিজতে ভিজতে চলে এসেছে। রাশা আনন্দে হেসে ফেলল, “কী মজা দেখেছিস?
বৃষ্টির প্রচণ্ড শব্দে কেউ কারো কথা শুনতে পাচ্ছে না কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। সবাই আনন্দে লাফাতে থাকে, নাচতে থাকে, গাইতে থাকে, সে গানের যেন কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই।
নানি ঘরের দাওয়ায় বসে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। প্রায় চল্লিশ বছর আগে তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তার স্বামীও এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গান গাইত। যেদিন রাজাকারেরা তাকে ধরে নিয়েছিল সেদিন ঠিক এভাবে বৃষ্টি হচ্ছিল।
