“কী?”
“এটা আসলে মাছ না।”
“এটা তাহলে কী?”
“এটা আসলে একটা রাজকন্যা।”
“রাজকন্যা?”
“হ্যাঁ। একজন সন্ন্যাসী অভিশাপ দিয়ে এটাকে মাগুর মাছ বানিয়ে ফেলে এই পুকুরের নিচে রেখে গেছে।”
জিতু মিয়ার চোখে পরিষ্কার একটা ভয়ের ছাপ পড়ল, সে শুকনো গলায় বলল, “তোমার তাই মনে হচ্ছে?”
“হ্যাঁ। দেখছিস না কেমন করে তাকাচ্ছে। পরিষ্কার মনে হচ্ছে বলতে চাইছে আমাকে ছেড়ে দাও, পিজ ছেড়ে দাও। যখন আমার অভিসাপ কেটে যাবে তখন আমি আবার রাজকন্যা হয়ে যাব। কিন্তু যদি কেটেকুটে খেয়ে ফেল তাহলে আর রাজকন্যা হতে পারব না।
রাশা এমন করে গলার মাঝে আবেগ দিয়ে কথাটা বলল যে জিতু বিভ্রান্ত হয়ে গেল। বলল, তাহলে কী করব? ছেড়ে দেব?
রাজেই রাশা আর জিতু অভিশপ্ত রাজকন্যাকে আবার মজা পুকুরটাতে ছেড়ে দিল। এতে অবশ্যি একটা লাভ হলো, ফিরে এলে জিতু যখনই এই মাগুর মাছটার গল্প করছিল তখন হাত দিয়ে সেটা কত বড় দেখানোর সময় তার আর কোনো বাধা-নিষধ থাকল না। কার সাথে গল্প করছে তার ওপর নির্ভর করে সে মাছটার সাইজটাও বড় থেকে বড় করতে লাগল।
রাশা যে শুধু গাছে চড়া শিখল, সাঁতার শিখল, কক আর মাছ ধরা শিখল না নয়, সে গ্রামের গাছগাছালিও চিনতে শিখল। এ ব্যাপারে তার নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষক নেই–সবাই কম বেশি তার শিক্ষক। যেমন নানি হঠাৎ করে পুকুর পাড় থেকে কোনো একধরনের লতাপাড়া ভেঙে এনে বেঁধে ফেলেন সেগুলো নাকি কলমি শাক। কিংবা জয়নব ছোট ছোট একধরনের গাছ তার সারা ফুল আর ফল দেখিয়ে বলে, এই গাছ থেকে খুব সাবধান। এটা হচ্ছে ধুতুরা গাছ। ধুতুরার সবকিছু হচ্ছে বিষ।
রাশা গাছটা আরো করে চিনে রাখে, বলে যদি কখনো মরে যেতে চাই তাহলে এই গাছের ফল খেলেই হবে?
জয়নব মাথা নেড়ে বলে, ছিঃ! এরকম বলে না। তুই মরে যেতে চাইবি কেন?
জিতু খুন নিরীহ ছোট একটা গাছ দেখিয়ে বলে, এই যে, এইটে হচ্ছে চুতরা গাছ। বুঝলে রাশাপু তুমি যদি কাউকে একটা শিক্ষা দিতে চাও তাহলে এই গাছটা নিয়ে তার ঘাড়ের মাঝে লাগিয়ে দিবে। তাহলে সে বুঝবে মজা।”
“কী মজা?”
“চুলকাতে চুলকাতে তার বারটা বেজে যাবে।” দৃশ্যটা কল্পনা করে জিতুর নিশ্চয়ই অনেক আনন্দ হলো কারণ তার চোখে-মুখে আনন্দের একটা আভা ফুটে উঠল।
রাশা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “অরি আমি যে গাছটা হাত দিয়ে ধরব তখন আমার হাত চুলকাবে না?”
“সাবধানে ধরবে। গাছের গোড়ায় ধরবে তাহলে চুলকাবে না। পাতাটা যেন হাতে না লাগে খুব সাবধান।”
এরকম অসংখ্য বিষয়ে রাশার জ্ঞান বাড়তে থাকে, সব জ্ঞানই যে তার জীবনে কাজে লাগবে তা নয় কিন্তু কোনো জ্ঞান তো আর ফেলে দেয়া যায় না! সে চাইছে কি না চাইছে তাতে কিছু আসে যায় না। হাজার রকমের প্রয়োজনীয় আর অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান তার মাথার ভেতরে এসে জমা হতে থাকে।
শুধু রাশার মাঝে যে জ্ঞান জমা হতে থাকে তা নয় সে নিজেও কিছু কিছু জ্ঞান অন্যদের মাঝে বিতরণ করল। যেমন ধরা যাক, জেঁকের ব্যাপারটা।
একদিন স্কুল থেকে আসছে, রাশার মনে হলো তার পায়ের কাছে একটু চুলকাচ্ছে, পা দিয়ে সেখানে একটু ঘষা দিয়ে সে হাঁটতে থাকে। যখন বাড়ির কাছাকাছি এসেছে তখন হঠাৎ মতি চিৎকার করে বলল, “রাশা বুবু। দাঁড়াও।”
রাশা ভয় পেয়ে বলল, “কী হয়েছে?”
“জোক।”
“জোক?” রাশা এবারে জোরে চিৎকার করে বলল, “কোথায়?”
“তোমার পায়ে।”
রাশা তখন আতঙ্কে লাফাতে থাকে, কী করবে বুঝতে পারে না। মতি বলল, “নড়বে না, তুমি নড়বে না।”
রাশার প্রায় হার্টফেল করার অবস্থা, কিন্তু তারপরেও সে স্থির হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, তখন যে কয়জন ছিল সবাই তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। রাশা দেখল কালোমতন তেলতেলে পিছলে একটা জিনিস তার গোড়ালিতে কামড়ে ধরে আছে। মতি সেটাকে টেনে ছোটানোর চেষ্টা করল, জিনিসটা রবারের মতন যতই টানা হয় ততই লম্বা হয় কিন্তু ছোটানো যায় না। কয়েকবার চেষ্টা করার পর শেষ পর্যন্ত সেটা ছুটে এলো। জোকটাকে মাটিতে ফেলে মতি পা দিয়ে সেটাকে পিষে ফেলতে যাচ্ছিল, রাশা তাকে থামাল, বলল, “দাঁড়া দাঁড়া।
“কী হয়েছে?”
“জোঁকটাকে মারিস না।”
“কেন?”
“কাজ আছে আমার।”
“কী কাজ?”
রাশা তার পায়ের গোড়াল্টিা দেখল, যেখানে জোকটা ধরেছে সেখান থেকে রক্ত বের হচ্ছে, সে জানে কিছুক্ষণ রক্ত বের হবে। ইন্টারনেটে সে পড়েছিল জোকের লালায় ব্যথানাশক জিনিস থাকে সেই জন্যে সে একটুও ব্যথা পায়নি, প্রথম যখন ধরছে তখন শুধু একটু চুলকিয়েছে। জোকের লালায় আরো একটা জিনিস থাকে যেটা দিয়ে সে রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। সে জন্যে জোক এত নিশ্চিন্ত আরামে রক্ত খেতে পারে।
রক্ত খেয়ে সেঁকটা মোটা ঢোলের মতো হয়েছে এখন সে ধীরে ধীরে সরে যেতে চেষ্টা করল। রাশা বলল, “এই জোকটাকে ধরে নিতে হবে।”
“কী করবি।”
“পালব।”
জয়নব বলল, “পালবি? ছিঃ!”
রাশা বলল, “জোক হচ্ছে একটা অসাধারণ জিনিস। আমি বইয়ে পড়েছি একটা জোক যদি ভালো করে একবার রক্ত খেতে পারে তাহলে পরে টানা দুই বছর সে কিছু না খেয়ে থাকতে পারে।”
“যাহ।”
“সত্যি কথা। আমার তো মনে হয় এই ব্যাটা বদমাইশটা ভালো করেই আমার রক্ত খেয়েছে, এখন দেখি এইটা কত দিন না খেয়ে থাকতে পারে।”
জিতুর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল, “তুমি সত্যি এটা পালবে?”
