মতির সাথে সাথে রাশা ধানক্ষেতে গিয়ে ফাঁদ পেতে এসেছে তারপর দূরে একটা বটগাছের ছায়ায় বসে অপেক্ষা করেছে। মতি বলেছে বক ধরা খুব সহজ নয়, দুই-চারদিনে হয়তো একটা বক ধরা পড়বে, কিন্তু রাশার কপাল ভালো প্রথম দিনেই একটা বক ধরা পড়ল। ফঁদে আটকে পড়ে বকটা যখন ছট ফট করছে তখন মতির সাথে সাথে রাশা ছুটে গিয়েছে, গলা থেকে ফস খুলে মতি শক্ত করে বকটাকে ধরে রেখে রাশাকে বলল, “রাশবু, বক থেকে খুব সাবধান।”
“কেন?”
“বক কিন্তু ঠোকর দিয়ে তোমার চোখ গেলে দেবে।”
মতির হাতে বকটাকে দেখে এত শান্তশিষ্ট আর নিরীহ মনে হচ্ছিল যে রাশার বিশ্বাসই হচ্ছিল না এই বক ঠোকর দিয়ে কারো চোখ গেলে দিতে পারে। তারপরেও সে সাবধানে থাকল! মতি তাকে বকটা দিয়ে এটাকে পোষার জন্যে কী করতে হবে, দুই বেলা কখন কী খাওয়াতে হবে সবকিছু বলে দিল।
রাশা বকটাকে বাড়ি এনে একটা ঝাঁপির নিচে আটকে রাখল। মতির উপদেশমতো সে তাকে খেতে দিয়েছে কিন্তু বুকটা সেই খাবার ছুঁয়েই দেখল না। সারাক্ষণ সে ঋপির ভেতরে অস্থিরভাবে এক মাথা থেকে আরেক মাথায় হেঁটে বেড়াতে লাগল। পারবে না জেনেও বকটা বারবার বের হয়ে যাবার চেষ্টা করে। মানুষের যখন মন খারাপ হয় তখন তার মুখ দেখে বোঝা যায় পাখিদের বেলায় সেরকম কিছু নেই। বকটার চোখ-মুখ দেখে বোঝার কোনো উপায়ই নেই যে তার মন খারাপ, কিন্তু সারাক্ষণ তার হাঁটাহাঁটি দেখে বোঝা যাচ্ছে তার মনটা খুব খারাপ। হয়তো এই বকটা মা বক, তার বাচ্চাদের রেখে তাদের জন্যে খাবার নিতে এসেছিল। হয়তো এখন তার বাচ্চারা মায়ের জন্যে অপেক্ষা করছে, মা আর আসছে না। ব্যাপারটা চিন্তা করে রাশার কেমন জানি মন খারাপ হয়ে গেল। বিকেলবেলা সে ঝাঁপির ভেতর হাত ঢুকিয়ে বকটাকে বের করে এনে গায়ে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তোকে আমি ছেড়ে দিচ্ছি, তুই তোর বাচ্চাদের কাছে যা। যাবার সময় দুইটা টেংরা মাছ ধরে নিয়ে যাস। ঠিক আছে? আর শোন, একটু ভদ্র ব্যবহার করা শিখবি। ঠোকর দিয়ে মানুষের চোখ গেলে দেওয়া এইটা আবার কী রকম অভ্যাস। আর যদি এটা শুনি তাহলে কিন্তু ভালো হবে না–”
তারপর রাশা বকটাকে উপরের দিকে ছুঁড়ে দিল, সাথে সাথে সেটা ডানা ঝাঁপটিয়ে উঠে যায়, মাথার উপরে একটা চক্কর দিয়ে সেটা ধানক্ষেতের দিকে উড়ে গেল। রাশার স্পষ্ট মনে হলো সেটা তার মাথার উপর চক্কর দিয়েছে তাকে থ্যাংকু বলার জন্যে।
.
রাশা জিতুর কাছ থেকে শিখল কেমন করে ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে হয়। মাছ ধরার জন্যে দরকার টোপ আর জিতুর মতে মাছের সবচেয়ে পছন্দের টোপ হচ্ছে কেঁচো। শুনেই রাশার গা ঘিন ঘিন করে উঠল, কিন্তু তার পরেও সে জিতুর পিছে পিছে গেল। সঁতসেঁতে জায়গায় ছোট ছোট যে মাটির টিবি সেগুলো নাকি কেঁচোর পেট থেকে বের হয়েছে। একটা কোদাল দিয়ে সেরকম একটা জায়গায় কোপ দিতেই অসংখ্য ছোট-বড় মাঝারি কেঁচো কিলবিল করে বের হয়ে এলো। একটা কচু পাতায় খানিকটা মাটি রেখে তার মাঝে জিতু কয়েকটা পুরুষ্ট কেঁচো এনে ছেড়ে দেয়। তারপর দুটো ছিপ আর মাছ রাখার জন্যে একটু চোপড়া নিয়ে সে রাশাকে নিয়ে বের হয়ে গেল। গ্রামের এক কোনায় গাছগাছালি দিয়ে ঢাকা একটা মজা পুকুরে এসে জিতু ছিপ ফেলল। ছিপের বড়শিতে টোপ লাগানোর বিষয়টি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। জিতু নখ দিয়ে ঘামচি মেরে কেঁচোর খানিকটা ছিঁড়ে নেয় তারপর সেটা বড়শিতে গেঁথে ফেলে। রাশা অবাক হয়ে দেখে যে অংশটা ছিঁড়ে বড়শিতে লাগানো হয়েছে আর যে অংশটা রয়ে গেছে দুটোই কিলবিল করে নড়ছে। কী আশ্চর্য! কী ঘেন্না!
ছিপ ফেলে রাশা ফাতনার দিকে তাকিয়ে রইল। একটু পর হঠাৎ সেটা টুকটুক করে নড়তে থাকে। জিতু বলল, “মাছ ঠোকরাচ্ছে।”
“তুলব?”
“না–না–এখনই না। যখন ফাতনা ডুবে যাবে তখন।” রাশা অপেক্ষা করতে থাকে কিন্তু ফাতনা আর ডোবে না। শেষে ছিপটা তুলে দেখে মাছ টোপটা খেয়ে চলে গেছে! জিতু বলল, “মাছদের অনেক বুদ্ধি! খুব সাবধানে শুধু টোপটা খায়, বড়শিটা গিলে না।”
রাশা বলল, “এখন কী করব?”
“নূতন করে টোপ লাগাও।”
“আমি?”
“নয়তো কে? মাছ ধরতে এসেছ তুমি আর টোপ লাগাবে আরেকজন?” রাশা জীবনে কখনো কল্পনা করে নি যে সে নখ দিয়ে লাল রঙের পুরুষ্ট একটা কেঁচোকে ছিঁড়ে ফেলবে। সেটা তার হাতে কিলবিল করতে থাকবে এবং সে চিৎকার না দিয়ে শান্তভাবে ভেঁড়া অংশটা বড়শিতে গেঁথে ফেলবে। কিন্তু সে সেটাই করল এবং সেটা করার সময় সে ঘেন্নায় বমি পর্যন্ত করে দিল না।
দ্বিতীয়বার ছিপটা ফেলার কিছুক্ষণের ভেতরেই ফাতনাটা নড়তে থাকে তারপর হঠাৎ সেটা ডুবে গেল, সাথে সাথে রাশা টান মেরে ছিপটা তুলে ধরে! আর কী আশ্চর্য ছিপের মাথায় কুচকুচে কালো রঙের ভয়ঙ্কর একটা মাছ কিলবিল কিলবিল করছে।
জিতু আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “ইস! কত বড় মাগুর মাছ।”
“এইটা মাগুর মাছ? দেখে তো সাপের ভাতিজা মনে হচ্ছে।“
“ধুর। সাপের ভাতিজা কেন হবে? এটা মাগুর মাছ। মাগুর মাছ খেতে খুব মজা।”
মাগুর মাছটা ছটফট করতে থাকে, জিতু মুখ থেকে বড়শিটা খুলে খলুইয়ের ভেতর রেখে দেয়। রাশা অবাক হয়ে মাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে–তার জীবনের প্রথম ধরা একটি মাছ। কুতকুতে দুটি চোখে সেই মাছ তার দিকে তাকিয়ে আছে। রাশা বলল, “আমার কী মনে হয় জানিস?”
