রাশ জিজ্ঞেস করল, “তুই কেমন করে শিখাবি?”
“ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দিব। রাশাপু একটু পানি খেয়েটেয়ে সাঁতার দিয়ে পাড়ে উঠবে।”
রাশা চিৎকার করে উঠল, “জিতু, তোকে আমি খুন করে ফেলব। এক্কেবারে খুন করে ফেলব। খবরদার আমার কাছে আসবি না। আমার একশ মাইলের ভিতরে তুই আসবি না।”
জিতু রাশার আতঙ্কটা উপভোগ করে হি হি করে খানিকক্ষণ হাসিল তারপর নিজের শার্ট খুলে পুকুর ঘাটে রেখে ঝপাং করে একটা লাফ দিয়ে পানিতে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। অনেকক্ষণ পর ভুস করে পুকুরের মাঝামাঝি সে ভেসে ওঠে। দেখে মনে হয় সে যে পানিতে আছে সেটা তার মনেই নেই। হাত-পা কিছু না নাড়িয়ে পানিতে সে শুয়ে থাকতে পারে, কে জানে মনে হয় ঘুমিয়েও যেতে পারে। রাশা জিতুর দিকে হিংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
অনেকবার অনেকভাবে চেষ্টা করেও রাশা যখন কোনোভাবেই ভেসে থাকতে পারল না, যখন সে প্রায় সাঁতার শেখার আশা ছেড়েই দিল ঠিক তখন সে হঠাৎ করে খানিকটা জায়গা পানিতে ভেসে চলে এলো। জয়নব খুশি হয়ে বলল, “এই তো হয়ে গেছে! তোর আর কোনো চিন্তা নাই! তুই এইবারে সাঁতার শিখে যাবি।”
রাশা চোখ বড় বড় করে বলল, “সত্যি?”
“সত্যি!”
জয়নবের কথা সত্যি বের হলো। গত কয়েকদিন রাশা কতবার কতভাবে ভাসার চেষ্টা করেছে, পারেনি, এখন হঠাৎ করে সে ভেসে থাকতে পারছে। ব্যাপারটা কিভাবে সম্ভব রাশা কিছুতেই বুঝতে পারল না, একটা মানুষ একসময় ভেসে থাকতে পারে না, পানিতে ছেড়ে দিলে মারবেলের মতো ডুবে যায়। সেই মানুষটাই আবার একসময় পানিতে ভেসে থাকতে পারে তাকে তখন চেষ্টা করেও ডোবানো যায় না! জিতুকে দেখেছে শরীরের একটা আঙুলও না নাড়িয়ে সে পানিতে ভেসে থাকে!
পরের কয়েকদিন রাশাকে পানি থেকে সহজে তোলা গেল না। পানিতে ডুবে থাকতে থাকতে তার আঙুলগুলি হয়ে যেত শুকনো কিশমিশের মতো, যখন পানি থেকে শেষ পর্যন্ত সে উঠত তখন তার চোখ হতো টকটকে লাল এবং তার চারপাশের সবকিছু কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া দেখাত। আজকাল যখন সে খেতে বসে তখন আবিষ্কার করে তার খিদে পায় রাক্ষসের মতো, পিঁড়িতে বসে সে একগাদা ভাত খেয়ে ফেলে! প্রথম যখন সে এখানে এসেছিল তার গায়ের রং ছিল ইটের নিচে চাপা পড়ে থাকা ঘাসের মতো বর্ণহীন ফর্সা, এখন তার গায়ের রং হয়েছে তামাটে বাদামি। সেখানে বিচিত্র একধরনের সজীবতা, রাশা নিজেকে দেখে নিজেই কেমন অবাক হয়ে যায়। তিন মাইল হেঁটে স্কুলে যায়, তিন মাইল হেঁটে ফিরে আসে, সাঁতরে পুকুর এপার-ওপার করতে পারে অবলীলায়। নিজের ভেতরে সে কেমন যেন শক্তি অনুভব করে। দৈহিক একধরনের শক্তি। যে শক্তি তার আগে কখনো ছিল না।
সাঁতার শেখার পর রাশা গাছে ওঠা শেখায় মন দিল। এখানে তার ওস্তাদের দায়িত্ব পালন করল মতি। রাশা আবিষ্কার করল গাছে চড়তে শেখা সাঁতার শেখার মতো এত কঠিন না। কাজটা অনেক সহজ, গাছে চড়ার জন্যে দরকার খানিকটা সাহস আর অনেকখানি আত্মবিশ্বাস। জয়নব রাশাকে সাঁতার শিখিয়েছে অনেক আগ্রহ করে কিন্তু দেখা গেল তার গাছে চড়ার ব্যাপারে জয়নবের আগ্রহ অনেক কম। রাশা যখন পেয়ারা গাছ, আমগাহু চড়া শেষ করে একটা নারকেল গাছে চড়া শেখার চেষ্টা করতে লাগল, তখন জয়নব তাকে বাধা দিল। বলল, “দেখ রাশা, এটা কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।”
“কোনটা?”
“এই যে নারকেল গাছে ওঠা শেখার চেষ্টা করছিস।”
“কেন? এটা বাড়াবাড়ি কেন?”
“সবকিছুর একটা নিয়ম আছে। কিছু কিছু কাজ হচ্ছে পুরুষ মানুষের, কিছু কিছু কাজ মেয়ে মানুষের।”
রাশা মাথা নাড়ল, বলল, “এটা সত্যি না। যে কাজ পুরুষ মানুষ করতে পারে, সেই কাজ মেয়ে মানুষেও পারে।”
“ঠিক আছে তুই তাহলে একজন মেয়ে মানুষকে বল দাড়ি কামাতে।”
রাশা মুখ শক্ত করে বলল, “সেটা অন্য জিনিস। মেয়েদের দাড়ি না উঠলে সেটা কামাবে কেমন করে?”
“মোটও অন্য জিনিস না। কিছু কিছু জিনিস মেয়েদের করা ঠিক না। মেয়েদের নারকেল গাছে ওঠা ঠিক না।”
“কেন?”
“তুই চিন্তা করে দেখ, বানরের মতো তুই নারকেল গাছে উঠছিস, পী বাঁকিয়ে গাছটাকে খিমচে ধরে রাখছিস, দৃশ্যটা কী সুন্দর হলো? মোটেও সুন্দর দৃশ্য না। দৃশ্যটা জঘন্য!”
রাশা এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার মানুষ না, কিন্তু জয়নব তখন অন্য একটা কায়দা করল। সে রাশার ওস্তাদ মতিকে ভয় দেখিয়ে বলল, মতি যদি রাশাকে নারকেল গাছে ওঠার তালিম দেয় তাহলে জয়নব তার ঠ্যাং ভেঙে দেবে! জয়নব চুপচাপ মানুষ কিন্তু তার পরিচিতরা তাকে বেশ সমীহ করে চলে। তাই মতি পিছিয়ে গেল, রাশার আর নারকেল গাছে চড়া শেখা হলো না।
মতি তাকে নারকেল গাছে চড়া না শেখালেও অন্য একটি জিনিস শেখাল সেটা হচ্ছে পাখি ধরার ফাঁদ দিয়ে বক ধরা। ফাঁদটা সে তৈরি করে নিজে। এক-দেড় হাত লম্বা একটা গাছের ডাল কেটে নেয় যেটা সামনে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ডালের একমাথায় সাইকেলের একটা স্পেক গেঁথে নেয়। স্পোকের মাথায় শক্ত সুতোয় একটু ফাঁস লাগানো থাকে, পাখির খাবার জন্যে কিছু একটা রাখা হয়, বক যখন সেখানে ঠোকর দেয় সাথে সাথে তার গলায় ফাসটা আটকে যায়। পাখির এই ফাঁদের সবকিছুই রাশা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখেছে, কিন্তু যখন তার খাবারটা দেখল তার গা গুলিয়ে এলো। সেখানে রাখা হয়েছে জীবন্ত এবং পুরুষ্ট একটা তেলাপোকা!
