কোট-প্যান্ট পরা মানুষটা বললেন, “তোমরা যখন বড় হবে, যখন এই দেশের দায়িত্ব নিবে তখন কোনো ছেলেমেয়ে আর ক্লাসরুমে কষ্ট পাবে না। দুঃখ পাবে না। ঠিক আছে?”
ছেলেমেয়ের মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে।”
“কথা দাও।”
সবাই মাথা নেড়ে কথা দিল। এরকম সময় কম্পিউটারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি এসে কোট-টাই পরা মানুষটার সাথে কথা বলল, কিছু একটা হিসাব করল, তারপর মাথা নাড়ল, আবার কথা বলল, তারপর আবার মাথা নাড়ল, তারপর মনে হলো দুজনে কোনো একটা বিষয়ে একমত হলো। কমবয়সী মজার মানুষটা তখন কোট-টাই পরা মানুষটার হাত থেকে মাইক্রোফোনটা নিয়ে বলল, “আমার ওপর দায়িত্ব ছিল তোমাদের কম্পিউটার দেখানো। কম্পিউটার দিয়ে কিভাবে তথ্যপ্রযুক্তি করতে হয় সেটা বোঝানো! আমি কী দেখলাম? আমি দেখলাম, তোমরা আমার থেকে কম্পিউটার অনেক ভালো বোঝো! তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তোমরা বিশাল একটা অন্যায়কে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছ। কাজেই তোমাদের আমার শেখানোর কিছু নাই, উল্টো আমি তোমাদের কাছ থেকে আজকে অনেক কিছু শিখে গেলাম।”
ছেলেমেয়েরা খুশিতে হাততালি দিতে থাকে। মানুষটা বলল, “আমি স্যারের সাথে কথা বলেছি। স্যারকে বলেছি এই স্কুল যখন কম্পিউটারের এত সুন্দর ব্যবহার করে এদের মাত্র একটা কম্পিউটার দিলে কি হয়? এদের বেশি করে কম্পিউটার দিতে হবে। বলো তোমরা কয়টা কম্পিউটার চাও?”
সামনে বসে থাকা একজন চিৎকার করতে লাগল, “দশটা! দশটা!”
“মাত্র দশটা? আমরা তোমাদের তিরিশটা কম্পিউটার দিব! তিরিশটা!”
ছেলেমেয়েদের চিৎকারে মানুষটার কথা চাপা পড়ে গেল। তারা উঠে দাঁড়িয়ে লাফাতে থাকে। ছেলেমেয়েরা একটু শান্ত হলে মানুষটা বলল, “আমরা দেখতে পাচ্ছি তোমাদের স্কুলে এতগুলো কম্পিউটার রাখার জায়গা নাই, তাই স্যার বলেছেন, ওই কোনায় একটা ঘর তুলে দেবেন। সেটা হবে তোমাদের কম্পিউটার ল্যাবরেটরি।
ছেলেমেয়েগুলোর সাথে এবারে স্যার আর ম্যাডামরাও আনন্দে লাফাতে লাগলেন। শুধু রাশা চুপ করে বসে রইল। তার মনে হতে লাগল সে বুঝি আর বাচ্চা মেয়ে না। সে বুঝি অনেক বড় হয়ে গেছে। তার বুঝি আর লাফ-ঝাঁপ করা মানায় না।
শুধু তার মুখে একটা হাসি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে।
০৮. মটকু মিয়া এবং অন্যেরা
পুকুর ঘাটের একপাশে বুকপানিতে রাশা দাঁড়িয়ে আছে, অন্যপাশে জয়নব। জয়নব রাশাকে সাঁতার শেখানোর দায়িত্ব নিয়েছে, গত কয়েকদিন থেকে তার প্র্যাকটিস চলছে।
জয়নব বলল, “মাথাটা ডুবিয়ে তুই আমার কাছে চলে আয়।”
রাশা বলল, “বলা খুব সোজা। মাথা ডুবিয়ে চলে আসব কিভাবে? মাথা ডোবালে নাকে-মুখে-চোখে পানি ঢুকে যাবে না?”
জয়নব বলল, “না যাবে না। মাথা ডুবিয়ে সাঁতার শেখা সবচেয়ে সোজা। যখন শিখে যাবি তখন আস্তে আস্তে মাথাটা পানি থেকে বের করা শিখবি। আয়, চলে আয়।”
রাশা বলল, “ভয় করে।”
জয়নব বলল, “ভয়ের কী আছে? আমি আছি না? আয়।”
রাশা বলল, “তবু ভয় করে।”
জয়নব বলল, “তুই হচ্ছিস একটা ভীতুর ডিম! ঠিক আছে আমি কাছে আসছি, আমি তোকে ধরে রাখছি, এখন আয়।”
রাশা জয়নবকে ধরে হাত-পা ছুঁড়ে অনেক পানি ছিটিয়ে সাঁতার দেয়ার চেষ্টা করল, তার ফলে যেটা ঘটল সেটাকে আর যাই হোক সাঁতার দেয়া বলে না।
এ রকম সময় জিতু এসে হাজির, সে খানিকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে রাশার হাত-পা ছুঁড়ে সাঁতার দেয়ার চেষ্টাটা দেখল, তারপর হি হি করে হাসতে শুরু করল। রাশা তার পানি ছিটানো বন্ধ করে বলল, “কী হয়েছে? তুই এরকম দাঁত কেলিয়ে হাসছিস কেন?”
“তুমি যদি এইভাবে আরো কয়দিন সাঁতার শেখার চেষ্টা করো তাহলে পুকুরের সব পানি পাড়ে উঠে যাবে।”
“ঢং করবি না। তুই যখন প্রথম সাঁতার শিখেছিলি তখন তুইও নিশ্চয়ই এইভাবে সাঁতার শিখেছিলি।”
জিতু মিয়া মাথা নাড়ল, বলল, “উঁহু আমি সাঁতার শিখেছি এক ঘণ্টায়।”
“মিছে কথা বলবি না। মানুষ একঘন্টায় সাঁতার শিখতেই পারে না।”
“আমি শিখেছিলাম।”
“কিভাবে?”
“আমার বাবা আমাকে ধরে পানিতে ফেলে দিয়েছিল।”
“কী করেছিল?”
“পানিতে ফেলে দিয়েছিল।”
রাশা চোখ কপালে তুলে বলল, “তুই সাঁতার জানিস না আর তোর বাবা তোকে পানিতে ফেলে দিল?”
“হ্যাঁ।”
“তারপর?”
“আমি পানি খেতে খেতে ডুবে গেলাম। যখন মরে যাচ্ছি তখন বাবা ঘাড় ধরে ওপরে তুলেছে। একটু নিশ্বাস নিয়ে যখন ঠিক হয়েছি, তখন আবার পানিতে ফেলে দিল।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। আমি তখন জান বাঁচানোর জন্যে কোনোমতে ভাসার চেষ্টা করি–যখন পারি না ভুবে যাই, নাকে দিয়ে মুখে দিয়ে পানি ঢোকে তখন বাবা ঘাড় ধরে টেনে তোলে। নিশ্বাস নেবার জন্যে একটু সময় দেয়। দুই একবার নিশ্বাস নেবার পর আবার পানিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।”
“খবরদার মিছে কথা বলবি না।”
“খোদার কসম, মিছা কথা না। এইভাবে কয়েকবার করার পর ভেসে থাকা শিখে গেলাম। একঘন্টার মাঝে।”
রাশা বুক থেকে একটা নিশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, “কী সর্বনাশ! তোর বাবার বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করা উচিত ছিল।”
জিতু হি হি করে হেসে বলল, “রাশাপু তুমি আজিব! এক্কেবারে আজিব।”
রাশা বলল, “ঠিক আছে আমি আজিব হলে আজিব। তুই আমাকে ডিস্টার্ব করবি না।”
জিতু খানিকক্ষণ রাশার সাঁতার শেখার কসরত দেখে হতাশভাবে মাথা নেড়ে জয়নবকে বলল, “জয়নব বুবু তুমি রাশাপুকে সাঁতার শেখাতে পারবে না। আমার কাছে দাও, আমি শিখিয়ে দিই।”
