হঠাৎ ভিডিও স্ক্রিনে রাশার তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা গেল, “স্যার।”
সকল দর্শক চমকে উঠে চোখ বড় বড় করে তাকাল। স্ক্রিনে দেখা গেল রাজ্জাক স্যার ঘুরে তাকিয়েছেন। তাকে দেখতে অবিকল একটা জানোয়ারের মতো দেখাচ্ছে। হিংস্র গলায় বললেন, “কে?”
রাশাকে দেখা গেল না, শুধু তার কথা শোনা গেল, “আমি স্যার।”
“কী হয়েছে?”
“আপনি এভাবে ওকে মারতে পারেন না।”
সবাই চোখ বড় বড় করে দেখার চেষ্টা করছে কোন মেয়ের এত সাহস, কোন মেয়ে এভাবে কথা বলছে। স্ক্রিনে তাকে দেখা যাচ্ছে না, শুধু রাজ্জাক স্যারকে দেখা যাচ্ছে। রাজ্জাক স্যার যখন রাশার কাছে হাজির হলেন তখন স্ক্রিনে প্রথমবার রাশাকে দেখা গেল, একটু পিছন থেকে কিন্তু তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
এরকম সময় রাজ্জাক স্যার স্টেজে ছুটে এসে আবার কম্পিউটারটা বন্ধু করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। কম্পিউটারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তাকে এত জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল যে রাজ্জাক স্যার স্টেজ থেকে পড়তে পড়তে কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিলেন।
সবাই দেখল রাজ্জাক স্যরি কিভাবে শপাং শপাং করে বেত দিয়ে রাশার হাতটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিলেন। সবাই দেখল কিভাবে সব ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে গেল, কিভাবে রাজ্জাক স্যার হঠাৎ করে থেমে গেলেন, কিভাবে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন, কিভাবে রাশা কান্নায় ভেঙে পড়ল, কিভাবে ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে ছুটে এলো তার কাছে। এরকম জায়গায় ভিডিওটা শেষ হয়ে হঠাৎ করে স্ক্রিনটা অন্ধকার হয়ে গেল।
কেউ কোনো কথা বলল না, সবাই নিজের জায়গায় পাথরের মধ্যে বসে রইল। রাশা দেখল কোট-টাই পরে থাকা মানুষটা খুব সাবধানে তার টাইটা দিয়ে চোখ মুছলেন। হেডমাস্টার মাথা নিচু করে বসে রইলেন। শুধু রাজ্জাক স্যারকে দেখা গেল কিছু একটা বলতে চাইছেন কিন্তু বলতে পারছেন না, তার মুখ ফ্যাকাসে এবং বিবর্ণ, মনে হচ্ছে বিশাল একটা কুৎসিত পোকা।
কোট-টাই পরা মানুষটা কিছু একটা বললেন, কিন্তু সামনে মাইক্রোফোন নেই বলে তার কথাটা শোনা গেল না। কম্পিউটারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা স্ট্যান্ড থেকে মাইক্রোফোনটা খুলে তার হাতে ধরিয়ে দিল। কোট-টাই পরা মানুষটা বললেন, “আমরা স্কুলে স্কুলে কম্পিউটার দিচ্ছি, বড় বড় কথা বলছি–কিন্তু কী লাভ? আমাদের ছেলেমেয়েদের আমরা রাক্ষসের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। সেই রাক্ষসেরা আমাদের ছেলেমেয়েদের মেরে ফেলছে, খুন করে ফেলছে, আমরা সেটা জানি না! কী লাভ তাহলে? কী লাভ?”
কোট-টাই পরা মানুষটা হেডমাস্টারের দিকে তাকিয়ে বলল, “হেডমাস্টার সাহেব। আপনার স্কুলে এই ভাবে ছেলেমেয়েদের মারা হয় আপনি সেটা জানেন না? আপনি কিসের হেডমাস্টার? আপনার হাতে আমরা কিভাবে ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব দিব? কিভাবে?”
হেডমাস্টার বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। কোট-টাই পরা মানুষটা পুলিশের পোশাক পরা মানুষটাকে বলল, “এস. পি. সাহেব, আপনি এই রাক্ষসটাকে ধরেন, বুক করেন। চৌদ্দ বছরের আগে যদি জেলখানা থেকে ছাড়া পায়–”
রাজ্জাক স্যার তখন পাগলের মতো ছুটে এসে হাউমাউ করে কোট-টাই পরা মানুষটার পা ধরার চেষ্টা করতে থাকেন। কোট-টাই পরা মানুষটা তখন রাজ্জাক স্যারকে এত জোরে একটা ধমক দিলেন যে সারা স্কুল কেঁপে উঠল, “খবরদার! আমাকে তুমি যদি স্পর্শ করো আমি তোমাকে খুন করে ফেলব।”
তারপর পিছন দিকে তাকিয়ে বললেন, “সরিয়ে নিয়ে যাও একে। সরিয়ে নাও। আমি কোনো নাটক দেখতে চাই না।”
তখন বেশ কয়েকজন মানুষ রাজ্জাক স্যারকে ধরে সরিয়ে নিল। কোট-টাই পরা মানুষটা এতক্ষণ বসে বসে কথা বলছিলেন, এবার মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর হেঁটে হেঁটে সামনে এসে থামলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানী মানুষ কারা জানো? সবচেয়ে সম্মানী মানুষ হচ্ছে শিক্ষক, বুঝেছ? একজন শিক্ষককে কোনোভাবে অসম্মান করতে হয় না। যদি সেই শিক্ষক নিজেকে নিজে অসম্মান করেন তখন আমরা কিছু করতে পারি না, আমরা খুব মনে কষ্ট পাই কিন্তু কিছু করতে পারি না। যাই হোক, আমার প্রিয় ছেলেমেয়েরা, আজকে আমি খুব মনে কষ্ট পেয়েছি। এ রকম যদি একটা ঘটনা ঘটে তাহলে দেশে আরো যে আশি হাজার স্কুল আছে, সেখানেও নিশ্চয়ই এরকম ঘটনা ঘটে। হয়তো এখন এই মুহূর্তে কোনো স্কুলে কোনো ছেলেকে কিংবা কোনো মেয়েকে কোনো একজন স্যার মারছেন! চিন্তা করতে পারো? আমরা দেশের শিক্ষার দায়িত্ব নিয়ে আছি। খোদা কি আমাদের মাফ করবেন? করবেন না। খোদ আমাদের মাপ করবেন না।”
মানুষটা একটা নিশ্বাস নিয়ে বললেন, “খুব মন খারাপ হয়েছে সত্যি কথা, তারপরেও কিন্তু একটা জিনিস দেখে আমার বুকটা ভরে গেছে। এইটুকুন একটা মেয়ে, কী তার সাহস, সে কী রকম তার বন্ধুকে রক্ষা করার জন্যে দাঁড়িয়ে গেল, কিভাবে মার খেল তবু সে পিছিয়ে গেল না। মাই গুডনেস্! তুমি এখানে আছ কি না আমি জানি না, তুমি যদি থাকো মা তোমাকে স্যালুট।” বলে কোট-টাই পরা মানুষটা হাত তুলে স্যালুট করার ভঙ্গি করলেন।
সব ছেলেমেয়ে হাততালি দিতে থাকে, কয়েকজন রাশাকে ঠেলে দাঁড়া করানোর চেষ্টা করে, রাশা উঠল না, মাথা নিচু করে বসে রইল।
