রাশা আবার তার জায়গায় এসে বসে চোখ বন্ধ করে উপরের দিকে তাকাল, বিড়বিড় করে বলল, “হে খোদা। আমার কলিই। আমি করেছি বাকিটা তোমার দায়িত্ব। তুমি বাকিটা করে দাও, প্লিজ।”
সবাইকে দিয়ে বক্তৃতা দেয়ানোর একটা ব্যাপার ছিল কিন্তু কোট-টাই পরা মানুষটি তার মাঝে যেতে চাইলেন না, সামনে বসে থাকা কমবয়সী একটা মানুষকে কী যেন ইঙ্গিত করলেন, সেই মানুষটা তখন তড়াক করে লাফ দিয়ে স্টেজে উঠে মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। মানুষটা হাসি-খুশি আর কথা বলে সুন্দর করে, সবাই তাই বেশ আগ্রহ নিয়ে তার কথা শুনতে থাকে। মানুষটা বলল, “এইখানে বেশিরভাগ হচ্ছে বাচ্চা ছেলেমেয়ে! বাচ্চা ছেলেমেয়েরা বক্তৃতা দুই চোখে দেখতে পারে না, তাই আজকে কোনো বক্তৃতা হবে না। আমরা সরাসরি মজার জায়গায় চলে যাব। মজার জিনিসটা কী কে বলতে পারবে?”
সবাই একসাথে চিৎকার করে বলল, “কম্পিউটার!”
মানুষটা হাসিমুখে বলল, “ভেরি গুড! এবারে বলো দেখি কম্পিউটার দিয়ে কী কী করা যায়?”
ছাত্রছাত্রীরা চুপ করে বসে রইল। একজন ভয়ে ভয়ে বলল, “হিন্দি সিনেমা দেখা যায়!”
মানুষটা হেসে ফেলল, বলল, “যদি বলতে সিনেমা দেখা যায় তাহলেও একটা কথা ছিল, একেবারে হিন্দি সিনেমা! অবশ্যি তোমাকে দোষ দিই কেমন করে–তুমি নিশ্চয়ই কোনো দোকানে দেখেছ কম্পিউটারে হিন্দি সিনেমা দেখাচ্ছে! ঠিক আছে, এবারে বলে আর কী করা যায়?”
একজন বলল, “চিঠি লেখা যায়?”
মানুষটা বলল, “ভেরি গুড়! চিঠি লেখা যায়। আর কী করা যায়?”
আরেকজন বলল, “ছবি আঁকা যায়।”
“আর কী করা যায়?”
“গেম খেলা যায়।”
“আর কী করা যায়?”
রাশা ইচ্ছে করলেই কম্পিউটার দিয়ে কী করা যায় সেরকম কয়েক ডজন কাজের কথা বলতে পারত, কিন্তু সে কিছু বলল না।
মানুষটা অনেকগুলো কাজের কথা শুনে শেষ পর্যন্ত বলল, “তোমরা যে কয়টা কাজের কথা বলেছ কম্পিউটার দিয়ে তার সবগুলো করা যায়–শুধু যে সেগুলো করা যায় তা নয়, সেগুলো ছাড়াও আরো অনেক কাজ করা যায়! আমি সেগুলো নিয়ে বকবক না করে তোমাদের দেখাব। ঠিক আছে?”
সবাই চিৎকার করে বলল, “ঠিক আছে।”
মানুষটা কম্পিউটারের পাশে রাখা সিডিগুলো এবারে হাতে তুলে নেয়, সাথে সাথে রাশার বুকটা ধক করে উঠল। মানুষটা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল, আমি তোমাদের জন্যে অনেকগুলো সিডি নিয়ে এসেছি, এর মাঝে কোনোটা গেম, কোনোটা এনসাইক্লোপিডিয়া, কোনোটা বিজ্ঞানের এক্সপেরিমেন্ট, কোনোটা গান, কোনোটা ছবি আঁকার প্রোগ্রাম! আমি এখন সেগুলো তোমাদের একটু একটু করে দেখাব। বলো তোমরা কোনটা আগে দেখতে চাও?”
বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে চিৎকার করে উঠল, “গেম। গেম!”
মানুষটা সিডিগুলোর উপর চোখ বুলাতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল, রাশার রেখে আসা সিঁড়িটা হাতে নিয়ে বলল, “কী ইন্টারেস্টিং, এখানে একটা নতুন সিডি! কেউ একজন রেখে গেছে, উপরে লেখা আমাদের স্কুল! তার মানে তোমাদের স্কুলের ওপরে কেউ একটা কিছু তৈরি করেছে। এটা দিয়েই শুরু করা যাক। কী বলো? দেখি তোমাদের স্কুল কী রকম!”
হেডমাস্টারকে এবারে খানিকটা বিভ্রান্ত দেখা গেল, গলা নামিয়ে রাজ্জাক স্যারকে বিষয়টা গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। রাজ্জাক স্যার বললেন তিনি এটা সম্পর্কে কিছু জানেন না। তাদের দুজনকেই এবারে খানিকটা দুশ্চিন্তিত দেখাতে থাকে।
কম্পিউটারের মানুষটা তখন সিডিটা কম্পিউটারে ঢুকিয়ে দিয়ে মাইক্রোফোনে বলল, “কম্পিউটারের মনিটর হয় ছোট। শুধু একজন সেটা দেখতে পারে। আজকে আমরা যেন সবাই দেখতে পারি সে জন্যে একটা ভিডিও প্রজেক্টর এনেছি, একটা বড় স্ক্রিন এনেছি। এখন আমরা সবাই দেখতে পারব। একসাথে দেখতে পারব।”
রাশা নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলল, উত্তেজনায় তার চোখ দুটি বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক তক্ষুণি স্পিকার থেকে রাজ্জাক স্যারের বিকট গলায় চিৎকার শোনা গেল, “শুওরের বাচ্চা, হারামজাদা!”
স্টেজে বসে থাকা অতিথিরা, সামনে বসে থাকা সার-ম্যাডামরা আর বেঞ্চে বসে থাকা কয়েকশ ছেলেমেয়ে একসাথে চমকে উঠল। সবাই চোখ বড় বড় করে স্ক্রিনের দিকে তাকায়, সেখানে রাজ্জাক স্যারকে দেখা যায়, হাতে একটা বেত নিয়ে সঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, “খুন করে ফেলব আমি তোরে। বেতিয়ে শরীরের চামড়া তুলে ফেলব, পিটিয়ে লাশ করে ফেলব।” ১০৮
সবাই দেখল রাজ্জাক স্যার তার হাতের বেত নিয়ে একটা ছেলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তারপর অমানুষের মতো তাকে মারতে লাগলেন। নিজের চোখে না দেখলে কেউ এটা বিশ্বাস করবে না। স্টেজে বসে থাকা অতিথিরা, সামনে বসে থাকা স্যার, ম্যাডামেরা আর কয়েকশ ছেলেমেয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে এই ভয়ঙ্কর দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
রাশা রাজ্জাক স্যারের দিকে তাকিয়েছিল, সে দেখল স্যার লাফিয়ে উঠলেন, কম্পিউটারের দিকে ছুটে গিয়ে সেটা বন্ধ করার চেষ্টা করলেন। চিৎকার করে একবার বললেন, “কী হচ্ছে? কী হচ্ছে এখানে?”
কেউ তার কথা শুনল না, কম্পিউটারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সবাই দেখল, রাজ্জাক স্যার ছেলেটাকে মারছেন, ছেলেটা হাত দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করল, তাতে সার যেন আরো খেপে গেলেন, তখন চুলের মুঠি ধরে তাকে বেঞ্চের ওপর প্রায় শুইয়ে ফেলে মারতে লাগলেন। বেতের শপাং শপাং শব্দ তার সাথে ছেলেটার কাতর চিৎকার।
