ছেলেমেয়েরা আবার আনন্দের শব্দ করল, হেডমাস্টার ছেলেমেয়েদের উচ্ছ্বাস দেখে খুশি হলেন। হাসি হাসি মুখে বললেন, আমাদের সায়েন্স টিচার রাজ্জাক সাহেব কম্পিউটারের ওপর ট্রেনিং নিতে আগামী সপ্তাহ ঢাকা যাবেন। তারপর ঢাকা থেকে লোকজন এসে আমাদের স্কুলে কম্পিউটার বসিয়ে দিয়ে যাবে। আমরাও তখন সাবইকে বলতে পারব আমাদের স্কুল তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছেয়ে নাই।
হেটমাস্টার বক্তৃতার ভঙ্গিতে হাত উপরে তুলে একটা ঝাঁকুনি দিলেন, সব ছেলেমেয়ে তখন আবার তাল মিলিয়ে চিৎকার করে উঠল। শুধু রাখা চিৎকার না করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কয়েকজন ছেলেমেয়ের জন্য কম্পিউটার আর সেই কম্পিউটারের দায়িত্বে থাকবেন রাজ্জাক স্যার। কোনো ছেলেমেয়ে আর সেই কম্পিউটার ব্যবহার করা দূরে থাকুক ছুঁয়েও দেখতে পারবে না। পুরো ব্যাপাটার মাঝে শুধু একটা ভারো দিক, কম্পিউটারের ট্রেনিং নেবার জন্যে রাজ্জাক স্যার এক সপ্তাহের জন্য ঢাকা থাকবেন, সেই একসপ্তাহ ছেলেমেয়েদের আনন্দ, সেই সপ্তাহে তার পিটুনি খেতে হবে না।
পরের সপ্তাহে স্কুলে একটু উত্তেজনা দেখা গেল। বালতিতে পানির মাঝে চুন গুলিয়ে সেই চুনের পানি দিয়ে দেয়াল হোয়াইট ওয়াশ করার চেষ্টা করা হলো। ফলাফল হলো ভয়ঙ্কর, স্কুলের জায়গায় জায়গায় ক্যাটক্যাটে সাদা রঙের কারণ স্কুলটাকে কেমন যে অপরিচিত দেখাতে থাকে। স্কুলের ছেলেমেয়েদের দিয়ে মাঠের আগাছা পরিষ্কার করানো হলো, ক্লাসঘর পরিষ্কার করানো হলো। ___
“তোমরা সবাই পরিষ্কার কাপড় পরে আসবে। খবরদার, কেউ খালি পায়ে আসবে না, জুতো না হয় স্যাভেল পরে আসবে। মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে আসবে। ঢাকা থেকে যারা আসবেন তারা যদি তোমাদের কিছু জিজ্ঞেস করেন তাহলে সুন্দর করে শুদ্ধ ভাষায় উত্তর দিবে। অনুষ্ঠান চলার সময় তোমরা কেউ গোলমাল করত্বে না, কথা বলবে না। যা যা বলা হবে সবকিছু মন দিয়ে শুনবে। মনে রেখো তোমরা যদি ঢাকার গেস্টদের মাঝে একটা ভালো ধারণা দিতে পারো তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে আরো কম্পিউটার পাবে।”
পরের দিন স্কুলে যাবার সময় কী মনে হলো কে জানে রাশা রতনের ভিডিও থেকে তৈরি করা সিডিটা তার বইয়ের মাঝে করে স্কুলে নিয়ে এলো।
স্কুলে এসে দেখে সেখানে সাজ সাজ রব। সব ক্লাসঘর থেকে বেঞ্চগুলো বের করে মাঝখানে আনা হয়েছে। স্কুলের বারান্দায় চেয়ার টেবিল পেতে বসার জায়গা করা হয়েছে। চেয়ারগুলো টাওয়েল দিয়ে সাজানো! টেবিলে সাদা টেবিল ক্লথ। একপাশে মাইক্রোফোন, বারান্দায় দুটি বড় বড় স্পিকার। যে কম্পিউটারটা স্কুলে দেয়া হবে সেটাকে টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কম্পিউটারের পাশে অনেকগুলো সিডি সাজানো। টেবিলের ওপর ফুলদানি, সেই ফুলদানিতে চকচকে প্লাস্টিকের ফুল।
বারান্দায় একটু ভেতরের দিকে একটা বড় সাদা স্ক্রিন। সামনে ছোট একটা টেবিলে একটা ভিডিও প্রজেক্টর। হেডমাস্টার গলায় একটা টাই লাগিয়ে খুব ব্যস্তভাবে হাঁটাহাঁটি করছেন। রাজ্জাক স্যার একটা চকচকে সাফারি স্যুট পরে এসেছেন। স্কুলের অন্য শিক্ষকরাও সেজেগুজে চলে এসেছেন।
ক্লাসঘর থেকে সব বেঞ্চ বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে, ক্লাসে বসার জায়গা নেই তাই সব ছাত্রছাত্রী সেই বেঞ্চে চুপচাপ বসে অপেক্ষা করছে। কেউ একজন মাইকটা চালু করে সেটা পরীক্ষা করার জন্যে বলল, “হ্যালো মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান টু থ্রি ফোর। ওয়ান টু থ্রি ফোর।”
রাশা দেখতে পেল বেশ কয়েকটা ফুলের তোড়া এনে এক কোনায় রাখা হয়েছে। তখন হঠাৎ করে হেডমাস্টারের কী একটা মনে পড়ল, তিনি ব্যস্ত হয়ে ছাত্রছাত্রীদের দিকে ছুটে এলেন, বললেন, “সর্বনাশ! অতিথিদের ফুলের তোড়া কে দেবে ঠিক করা হয় নাই। ক্লাস নাইনের মেয়েরা কোথায়?”
দেখা গেল ক্লাস নাইনে দুজন মেয়ে কম পড়েছে। তখন ক্লাস এইট থেকে দুজন মেয়ে নেয়া হলো। একজন সানজিদা অন্যজন রাশা। রাশা তখন চোখ বন্ধ করে উপরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “থ্যাংক ইউ আল্লাহ। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।”
অতিথিরা আসতে অনেক দেরি করলেন, সবাই একেবারে অধৈর্য হয়ে গিয়েছিল, শুধু রাশা অধৈর্য হলো না। সে শান্ত মুখে বসে রইল, কেউ টের পেল না তার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা চলন্ত ট্রেনের মতো ধক ধক করে শব্দ করছে।
শেষ পর্যন্ত অতিথিরা এলেন, স্কুলের মাঠে দুইটা গাড়ি এসে থামল, পিছনে পুলিশের একটা গাড়ি। অতিথিরা গাড়ি থেকে নামার পর হেডমাস্টার একেবারে বিগলিত ভঙ্গিতে তাদেরকে স্টেজে নিয়ে এসে বসালেন। এই গরমের ভেতর একজন কোট-টাই পরে এসেছেন, তাকে দেখেই রাশার গরম লাগতে থাকে। একজন পুলিশের পোশাক পরা, তিনি স্টেজে বসতে চাচ্ছিলেন না, হেডমাস্টার জোর করে তাকেও স্টেজে তুলে দিলেন। অতিথিদের অনেক তাড়া, এখান থেকে অন্য একটা স্কুলে যাবেন, কাজেই খুব দ্রুত অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন রাজ্জাক স্যার। তিনি গলা কাঁপিয়ে অতিথিদের সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা বললেন। এস.পি, এবং ভি.সি, সাহেব যে তাদের অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করে এরকম তুচ্ছ একটা স্কুলে চলে এসেছেন সে জন্যে কৃতজ্ঞতা জানতে জানাতে মুখে প্রায় ফেনা তুলে ফেললেন। তারপর তাদের ফুল দিয়ে বরণ করার জন্য মেয়েদের স্টেজে ডাকলেন। রাশা তার বইয়ের ভেতর থেকে সিডিটা নিয়ে রওনা দিল, হাতটা একটু পিছনে রাখল যেন কেউ সেটা লক্ষ না করে। মঞ্চের পাশে গিয়ে ফুলের তোড়াটা হাতে নেয়ার পর সে ফুলের তোড়ার পিছনে সিডিটা লুকিয়ে ফেলল। একজন একজন করে ফুলের তোড়া নিয়ে যাচ্ছে, সেও এগিয়ে গেল, টেবিলের পাশে দিয়ে যাবার সময় সে টুক করে সিভিটা অন্য সিডিগুলোর উপরে রেখে দিল। কোট-টাই পরা মানুষটা তার হাত থেকে ফুলের তোড়াটা নিয়ে কিছু একটা বললেন, উত্তেজনায় রাশার বুক এমন ধুকপুক করছিল যে কী বলেছেন সে ঠিক ভালো করে শুনতেও পেল না।
