রাশা চোখ কপালে তুলে বলল, “তুই পুরোটা ভিডিও করেছিস?”
রতন গম্ভীর মুখে বলল, “পুরোটা। একেবারে ফার্স্ট ক্লাস ভিডিও। কেউ টের পায় নাই!”
“দেখি দেখি—”
রতন তার হাতে মোবাইলটা দেয়, সেখানে দেখা গেল রাজ্জাক স্যার হিংস্র মুখে এগিয়ে যাচ্ছেন, রাশার সাথে দুই-একটা কথা তারপর শপাং করে হাতের মাঝে বেত এসে পড়ল। রাশা দৃশ্যটি দেখতে পারে না; একধরনের আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলে। মোবাইলের ভেতর থেকে স্যারের হিংস্র গালিগালাজ বের হতে থাকে। রতন বলল, “মামা লন্ডন চলে যাবে।”
রাশা জিজ্ঞেস করল, “এই ফোনটা নিয়ে যাবে?”
“হ্যাঁ।“
“এই ভিডিওটার একটা কপি আমাদের রাখতে হবে। এইটা খুবই জরুরি।”
রতন বলল, “সেই জন্যে আমি তোর সাথে নিরিবিলি কথা বলতে চাচ্ছিলাম।”
রাশা বলল, “সেটা তো আগে বলবি। এর পরেরবার যখন কোনো জরুরি বিষয় নিয়ে কথা বলবি তখন ধানাই-পানাই না করে সোজাসুজি কাজের কথায় চলে আসবি। বুঝেছিস?”
রতন একটু আহত গলায় বলল, “আমি কখন ধানাই-পানাই করেছি? আমি তো সোজাসুজি কাজের কথাই বলেছি।”
“না বলিস নাই।”
“বলেছি।”
“থাক বাবা এখন এটা নিয়ে আর তর্ক করে লাভ নাই। এখন আমাকে বল এইটা কিভাবে কপি করা যায়।”
“মামাকে জিজ্ঞেস করব?”
“উঁহু। বড় মানুষদের জিজ্ঞেস করলেই ঝামেলা। বাজারে একটা ফোন-ফ্যাক্স-কম্পিউটারের দোকান আছে না?”
“হ্যাঁ আছে।”
“সেইখানে নিয়ে গিয়ে একটা সিডিতে কপি করতে হবে।”
“সিডি কী?”
“সেটা এখন আমি তোকে শিখাতে পারব না। কালকে মোবাইল ফোনটা নিয়ে আসিস। দুপুরবেলা কপি করাতে নিয়ে যাব।”
“ঠিক আছে।”
“কাউকে বলবি না।”
“বলব না।”
“গোপন রাখবি।” রতন মুখভঙ্গি করে বলল, “আমি তো গোপনই রাখতে চাচ্ছি, তুই-ই সবার সামনে কথা বলতে চাস!”
.
পরদিন দুপুরে মোবাইল টেলিফোন থেকে ভিডিওটা দুটো সিডিতে কপি করে নেয়া হলো। রাশা সিডি দুটি খুব যত্ন করে রেখে দিল, কোনো একদিন নিশ্চয়ই কাজে লাগবে। পরেরবার যখন জাহানারা ম্যাডামের সাথে কথা বলবে তখন তাকে জিজ্ঞেস করবে। তাকে এভাবে মেরেছেন শুনলে কষ্ট পাবেন কিন্তু কিছু তো আর করার নেই। স্কুলে ছেলেমেয়েদের পেটানো যাবে না দেশে নিশ্চয়ই এরকম আইন আছে, সেই আইনে রাজ্জাক স্যারের নিশ্চয়ই শাস্তি পাবার কথা। তার একটা উচিত শিক্ষা হওয়া উচিত, কিন্তু সেই শিক্ষাটা তাকে দেবে কে?
কিন্তু হঠাৎ করে সেই সুযোগটা চলে এলো–রাশা নিজেও বুঝতে পারেনি এত তাড়াতাড়ি এরকম চমকপ্রদ একটা সুযোগ আসবে। ঘটনাটা শুরু হলো এভাবে :
সকাল বেলা মাঠে অ্যাসেম্বলিতে সবাই দাঁড়িয়েছে তখন হেডমাস্টার সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমাদের জন্যে একটা সুখবর আছে।”
স্যার-ম্যাডামরা যখন বলেন সুখবর আছে প্রায় সবসময়েই দেখা যায় খবরটা আসলে সুখবর না। কয়েকদিন আগে হেড স্যার বলেছিলেন, তোমাদের জন্য একটা সুখবর আছে, এমপি সাহেব আসছেন। সব ছাত্রছাত্রী এমপি সাহেবকে সংবর্ধনা দেয়ার জন্য ছোট ছোট পতাকা নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে। স্কুল থেকে সব ছেলেমেয়ে সকাল থেকে রাস্তার দুই পাশে ফ্ল্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে রইল। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, তার মাঝে গনগনে রোদ, ঘেমে একেকজন একাকার। শেষ পর্যন্ত এমপি সাহেব এলেন, তার গলায় ফুলের মালা, সামনে-পিছনে শুধু লোক আর লোক। কালো আর মোটা এমপি সাহেব হেঁটে হেঁটে চলে গেলেন, স্কুলের এত এত বাচ্চা যে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তাদের দিকে একবার ঘুরেও তাকালেন না।
তাই হেডমাস্টার যখন বললেন, তোমাদের জন্যে সুখবর আছে তখন সবাই ভয়ে ভয়ে হেডমাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সুখবরটা কী শোনার জন্য। হেডমাস্টার বললেন, “তোমরা কারা কারা কম্পিউটারের নাম শুনেছ?”
মোটামুটি সবাই হাত তুলল।
হেডমাস্টার জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কারা কারা কম্পিউটার দেখেছ?”
এবারে অনেক হাত নেমে গেল।
“তোমরা কারা কারা কম্পিউটার ব্যবহার করেছ?”
এবারে রাশা ছাড়া অন্য সবার হাত নেমে গেল। আর কারো হাত উঠে নাই বলে রাশাও তাড়াতাড়ি তার হাত নামিয়ে ফেলল। হেডমাস্টার বললেন, “উন্নত দেশে মানুষের ঘরে ঘরে কম্পিউটার। আমাদের খুবই কপাল খারাপ যে আমরা স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের পর্যন্ত কম্পিউটার দেখাতে পারি না। যাই হোক আমাদের সেই দুঃখের দিন শেষ হতে যাচ্ছে! তোমরা শুনে খুবই খুশি হবে যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সব স্কুলে কম্পিউটার দেয়া হচ্ছে। সেই প্রোগ্রামের আওতায় আমরাও আমাদের স্কুলে একটা কম্পিউটার পেতে যাচ্ছি।”
হেড স্যারের কথা শেষ হওয়া মাত্র ছেলেমেয়েরা সবাই আনন্দের একটা শব্দ করল, এটা ভেজাল সুখবর না, এটা সত্যি সুখবর!
হেডমাস্টার সাহেব বললেন, “তবে একটা জিনিস সবার মনে রাখতে হবে, কম্পিউটার কিন্তু টেলিভিশনের মতো না, যে টিপ দিলেই প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যাবে। নাচ-গান চলতে থাকবে। কম্পিউটার অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটা যন্ত্র। এটা ঠিক করে চালাতে জানতে হয়। যারা জ্ঞানী-গুণী মানুষ তারা কম্পিউটার দিয়ে প্রোগ্রামিং করে। কম্পিউটার দিয়ে চিঠি লেখে, ছবি আঁকে, ই-মেইল করে। ইন্টারনেট করে। সবাই বুঝেছ?”
হেডস্টার সাহেব কী বলছেন সেটা বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই ঠিক বুঝতে পারল না কিন্তু সবাই মাথা নাড়ল। হেডমাস্টার সাহেব বললেন, “আমরাও চাই আমাদের আহাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাও একদিন কম্পিউটার চালাতে শিখবে।”
