রাশা বলল, “কী?”
“তু-ই মানে তুমি মানে তুই–”
“আমি?”
“তুই কী এখন আমাদের স্কুল ছেড়ে চলে যাবি?
“না! স্কুল ছেড়ে কোথায় যাব?”
“যাস না! ঠিক আছে? আমরা সবাই তোর সাথে আছি।”
রাশা বলল, “আমি জানি।”
রাশা সত্যি সত্যি জানে রাজ্জাক স্যারের এই ঘটনায় হঠাৎ করে পুরো ক্লাস তার আপন হয়ে গেছে। তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ছিল এটা, কিন্তু এই ঘটনার জন্যেই সে সারা ক্লাসের আপনজন হয়ে উঠল।
০৭. উচিত থেকেও উচিত শিক্ষা
রাজ্জাক স্যারের মারের দাগটা লাল হয়ে ফুলে গিয়েছিল, নানির চোখ থেকে আড়াল রাখার জন্য রাশাকে কয়েকদিন খুব সাবধান থাকতে হলো। নানি অবশ্যি কোনো কিছুকেই খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না, তাই তার চোখে পড়লেও ব্যাপারটা ধরতে পারতেন বলে মনে হয় না। রাশা তবু কোনো ঝুঁকি নিল না। নানি যদি জিজ্ঞেস করতেন তাহলে তাকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলতেই হতো–রাশা কিছুতেই সেটা করতে চাচ্ছিল না।
রাজ্জাক স্যারের মারের ঘটনার পর তার ক্লাসের সবাই তাকে একটু অন্যচোখে দেখে, কিন্তু একটা ছেলের ব্যবহারের মাঝে একটা বড় পরিবর্তন দেখা গেল। লাজুক ধরনের ছেলে, নাম রতন, প্রথম দিনেই তাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছে সে স্কুল ছেড়ে চলে যাবে কিনা। রাশা লক্ষ করল, রতন ছেলেটা সবসময়েই তার আশেপাশে থাকছে, মনে হয় তাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে। রাশা একসময় তাকে জিজ্ঞেস করে ফেলল, “তুই কি আমাকে কিছু বলবি?”
রতন আশেপাশে তাকাল তারপর গলা নামিয়ে বলল, “হ্যাঁ।”
“কী বলবি? বল।”
“এখানে তো বলতে পারব না।”
“কেন?”
“অন্যেরা শুনে ফেলবে।” রাশা অবাক হয়ে বলল, “শুনে ফেললে কী হবে?” রতন মাথা নাড়ল, বলল, “না অন্যদের শোনানো যাবে না।”
“তাহলে কখন বলবি?”
“তুই যখন বাড়ি যাবি, তখন বলব। রাস্তায়।”
“ঠিক আছে।”
.
সেদিন বিকেলবেলা রাশ যখন জয়নব, জিতু আর মতি অন্যদের নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি যাচ্ছে তখন একটা নিরিবিলি জায়গায় হঠাৎ করে কোথা থেকে জানি রতন এসে হাজির হলো। সে এদিক-সেদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে ডাকল, “এই রাশা শোন।”
রাশা দাঁড়িয়ে গেল, সাথে সাথে জয়নব, জিতু, মতি আর অন্যরাও। রতন রহস্যময় একটা ভঙ্গি করে বলল, “শুধু তুই। অন্যদের চলে যেতে বল।”
রাশা বলল, “চলে গেলে হবে কেমন করে? ওরা অপেক্ষা করুক।”
“ঠিক আছে। কিন্ত্র অনেক দূরে অপেক্ষা করতে হবে।” রাশা জয়নবকে বলল, “তোরা হেঁটে ঐ ব্রিজটার ওপর অপেক্ষা করো, আমি রতনের সাথে কথা বলে আসছি।”
জয়নব খুব সন্দেহের চোখে একবার রতনকে আরেকবার রাশাকে দেখল, তারপর হেঁটে হেঁটে সামনে এগিয়ে গেল।
রাশা রতনের দিকে তাকিয়ে বলল, “বল কী বলবি।”
“কাউকে বলবি না তো?”
“না শুনে কেমন করে বলি?” রাশা একটু অধৈর্য হয়ে বলল, “আগে বল! শুনি কথাটা কী!”
“আমার এক মামা লন্ডনে থাকে।”
রাশা অবাক হয়ে রতনের দিকে তাকাল, তার মামা লন্ডনে থাকে সেটা বলার জন্যে এত গোপনীয়তা কেন?
“সেই মামা বাড়ি এসেছে। মামার তিন-চারটা মোবাইল ফোন।”
রাশা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে কখন মামার গল্প শেষ হয়ে আসল গল্প শুরু হবে। রতন বলল, “আমি মামাকে বললাম, মামা আমাকে একটা মোবাইল ফোন দিবে? মামা বলল, তুই বাচ্চা ছেলে মোবাইল ফোন দিয়ে কী করবি। আগে বড় হ তখন তোরে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিব।”
রতন এইটুকু বলে রাশার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকাল, রাশ ঠিক বুঝতে পারল না সে কী বলবে, রাশার সন্দেই হাতে থাকে রতনের মাথায় হয়তো একটু ছিট আছে, সে তাকে শেষ পর্যন্ত মোবাইল ফোনের গল্পই শোনাতে থাকবে। হলোও তাই, রতন বলল, “আমি তখন বললাম, মামা তোমার যে মোবাইল দিয়ে ছবি তোলা যায় সেইটা দিবা? কয়টা ছবি তুলি। মামী বলল, হারাবি না তো? অনেক দামি মোবাইল। আমি বললাম, না মামা হারাব না।”
রতন আবার থামল, রাশার দিকে তাকাল, মনে হলো সে আশা করছে বাশা এখন কিছু একটা বলবে। রাশা কিছু বলল না, অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল কখন গল্পটা শেষ হবে। রতনের গল্প শেষ করতে কোনো তাড়া নেই, সে বলল, “মামার মোবাইল অনেক দামি, ফটো তুলতে পারে, ভিডিও করতে পারে। আমি অনেক ফটো তুলেছি, ভিডিও তুলেছি।”
রাশা আর পারল না, বলল, “বেশ করেছিস! আরো ফটো তোল, আরো ভিডিও কর। এখন আমি যাই।”
“শোন না কী করেছি। একদিন আমি মামার মোবাইলটা স্কুলে নিয়ে আসছিলাম, কাউকে বলি নাই। পোলাপান যা বদ, নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করবে। বলবে আমার ছবি তোল, আমার ছবি তোল। শেষে হাত থেকে পড়ে ভেঙে যাবে। সেই জন্যে কাউকে দেখাই নাই।”
রাশা অধৈর্য হয়ে বলল, “রতন! আমার বাড়ি অনেক দূর। যেতে অনেকক্ষণ লাগবে। তোর মোবাইলের গল্প আজকে এইখানে শেষ কর, বাকিটা কালকে শুনব। এখন আমি যাব।”
রতনের মনে হলো একটু মন খারাপ হলো, বলল, “চলে যাবি?”
“হ্যাঁ।“
“আমি স্কুলে যে ভিডিও করেছি সেটা একটু দেখবি না?”
“কালকে দেখব।”
“একটু দেখ। বলে রতন তার পকেট থেকে একটা দামি মোবাইল বের করে টেপাটেপি করতে থাকে, হঠাৎ মোবাইলের ভেতর থেকে একজন মানুষের ক্রুদ্ধ গর্জন ভেসে আসে। রাশা কৌতূহলী হয়ে মোবাইলটার দিকে তাকায়, রাজ্জাক স্যার হাতে বেত নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন, একজনকে পেটাতে পেটাতে শুইয়ে ফেলেছেন। হঠাৎ করে রাশা তার তীক্ষ্ণ গলার চিৎকার শুনতে পেল, “স্যার!”
