রাশা আর সহ্য করতে পারল না, কী করছে না বুঝেই হঠাৎ সে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিলের মতো চিৎকার করে বলল, “স্যার।”
মনে হলো ক্লাসের মাঝে বুঝি একটা বোমা পড়েছে, স্যার ছেলেটার চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে ঘুরে তাকালেন। তার চোখ দুটি লাল, নাকটা ফুলে উঠেছে, নিচের চোয়ালটা একটু সামনে বের হয়ে এসে দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে। হিংস্র গলায় বললেন, “কে?”
রাশা বলল, “আমি স্যার।”
“কী হয়েছে?”
“আপনি এভাবে ওকে মারতে পারেন না।
মনে হলো স্যার নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। জিজ্ঞেস করলেন, “কী বললি?”
“বলেছি আপনি এভাবে ক্লাসের মাঝে মারতে পারেন না।”
স্যারের চোখ দুটি আরো লাল হয়ে উঠল, মনে হলো তার নিশ্বাসে বুঝি আগুন বের হয়ে আসবে। স্যার তার বেতটাকে শক্ত করে ধরে রাশার দিকে এগিয়ে এলেন, বললেন, “তুই আমাকে শেখাতে এসেছিস আমি কী করব? তোর এত বড় সাহস?”
“স্যার এটা সাহসের ব্যাপার না স্যার-এটা-”
রাশা কথা শেষ করতে পারল না, স্যার হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “তোর এত বড় সাহস তুই আমার মুখের ওপর কথা বলিস?”
“না স্যার–আসলে-” রাশা কথা শুরু করতে গিয়ে থেমে গেল। স্যার ততক্ষণে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, এত কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন যে স্যারের শরীরের বোটকা একটা গন্ধ রাশার নাকে এসে লাগল। স্যার হিংস্র চোখে রাশার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বেয়াদব মেয়ে। আমি তোর বেয়াদবি আজকে জন্মের মতো শিখিয়ে দেব।”
রাশা কিছু বলল না, হঠাৎ করে বুঝতে পারল, আজকে ভয়ানক একটা কিছু ঘটে যাবে। স্যার বললেন, “হাত পাত—”
রাশা তার হাতটা এগিয়ে দিল। স্যার তার বেতটা ওপরে তুললেন, রাশা দেখল বেতটা ওপর থেকে নিচে তার হাতের ওপরে নেমে আসছে শপাং করে একটা শব্দ হলো আর সাথে সাথে রাশার মনে হলো তার পুরো হাতটা বুঝি আগুনে ঝলসে গেছে। প্রচণ্ড ব্যথার একটা অনুভূতি হাত থেকে সারা শরীরের মাঝে ছড়িয়ে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে হাতটা সরিয়ে নেয়ার অদম্য একটা ইচ্ছা হলো রাশার, কিন্তু সে তার হাতটা সরাল না, দাঁতে দাঁত চেপে রাখল, চিৎকারও করল না। শুনতে পেল সারী ক্লাস এক সাথে একটা চাপা আর্তনাদ করল।
রাশা দাঁতে দাঁত ঘষে নিজেকে বলল, “আমি কাঁদব না। মরে গেলেও কাঁদব না। কাঁদব না, কাঁদব না, কাঁদব না—”
সে তার হাতটা সামনে ধরে রাখল, স্যার বেতটা উপরে তুলে আবার মারলেন, বাতাসে শপাং করে আবার একটা শব্দ হলো, যন্ত্রণার প্রচণ্ড অনুভূতিতে রাশার মনে হলো সারা পৃথিবী বুঝি অন্ধকার হয়ে গেছে।
হঠাৎ করে ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে একে একে দাঁড়িয়ে গেল, সবাই সামনের দিকে ঝুঁকে এসেছে কেউ কিছু বলছে না কিন্তু সবাই তীব্র দৃষ্টিতে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। স্যার কেমন যেন হকচকিত হয়ে গেলেন, আবার মারার জন্যে বেতটা উপরে তুলেছিলেন, না মেরে আস্তে আস্তে বেতটা নামিয়ে নিয়ে বললেন, “কী হয়েছে?”
কেউ কিছু বলল না, স্যার আবার চিৎকার দিয়ে বললেন, “কী হয়েছে?” তার নিজের কাছেই চিৎকারটা কেমন যেন ফাঁপা শোনাল। স্যার একটা টোক গিলে বললেন, “পঁড়িয়ে আছিস কেন। বস।”
এবারে ছেলেমেয়েরা আস্তে আস্তে বসে পড়ল, শুধু রাশা দাঁড়িয়ে রইল। সে হাতটা সামনে এগিয়ে পেতে রেখেছে! ইঙ্গিতটা খুব স্পষ্ট, তুমি মারতে চাইলে আরো মারতে পারো, আমি ভয় পাই না।
রাজ্জাক স্যার সারা ক্লাসের দিকে একবার তাকালেন তারপর টেবিল থেকে তার চক-ভাস্টার নিয়ে বের হয়ে গেলেন।
এতক্ষণ রাশা পাথরের মতো মুখ করে দাঁড়িয়েছিল, স্যার বের হয়ে যাওয়া মাত্র সে মাথা নিচু করে বসে পড়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
সারা ক্লাসের মাঝে হঠাৎ যেন কী ঘটে গেল, যে যেখানে ছিল সেখান থেকে সবাই রাশার কাছে ছুটে এলো। কয়দিন আগে এই ক্লাসের ছেলেরা মেয়েদের সাথে কথা পর্যন্ত বলত না, হঠাৎ করে সব পাল্টে গেল। কঠিন চেহারার একটা ছেলে রাশর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কান্দিস না। তুই কান্দিস না। আল্লাহর কসম লাগে।”
একটা ছেলে দৌড়ে বাইরে ছুটে গেল। টিউবওয়েলের পানিতে একটা রুমাল ভিজিয়ে এনে রাশার ডান হাতটা মেলে খুব সাবধানে ভিজে রুমালটা চেপে ধরে রাখল। সেখানে টকটকে লাল হয়ে দুটি দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একজন একটা খাতা দিয়ে তাকে বাতাস করতে থাকে। একজন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। রাশা তখন মুখ তুলে তাকাল, তার চোখ থেকে তখনো ঝরঝর করে পানি ঝরছে। সানজিদা তার চোখ মুছে দেয়ার চেষ্টা করল, রাশা তখন নিজেই চোখ মুছে নেয়। যে ছেলেটাকে নির্দয়ভাবে মারার জন্য রাশা লাফিয়ে উঠেছিল সেই ছেলেটা দুই হাত উপরে তুলে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বলল, “তুই এটা কী করলি? আমাদের মার খেয়ে অভ্যাস আছে, তাই বলে তুই? তুই?”
ঠাণ্ডা চেহারার ছোটখাটো একটা ছেলে দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “আমি খুন করে ফেলব। খুন করে ফেলব এই ব্যাটাকে।”
রাশা চোখ মুছে শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে। ঠিক আছে সবকিছু। আমি ঠিক আছি। তোরা ব্যস্ত হবি না।”
ছেলেরা এবং মেয়েরা রাশাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল, তারা ঠিক কী করবে বুঝতে পারছিল না।
.
বিকেলবেলা স্কুল ছুটির পর যখন সে অন্যদের সাথে বাড়িতে আসছে তখন তাদের ক্লাসের একটা লাজুক ধরনের ছেলে হঠাৎ তার কাছে এসে নিচু গলায় বলল, “রাশা।”
