তারপর হঠাৎ করে আমি যখন তোমার টেলিফোন পেলাম আমি ভয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল তোমার মুখে আমি না জানি কী শুনব। তোমার মা গহীন কোনো এক গ্রামে তোমার নানির কাছে ফেলে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছেন–তোমার লেখাপড়া শেষ, তোমার জীবন শেষ, তুমি ইচ্ছে করলে আমাকে এটা বলতে পারতে। এটা বললে খুব একটা মিথ্যা কথা বলা হতো না। কিন্তু তুমি আমাকে সেটা বলনি, তুমি আমাকে বলেছ যে তুমি একা–হ্যাঁ পুরোপুরি একা এই ভয়ংকর দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়েছ। গহীন এক গ্রামের অখ্যাত একটা স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করার প্রস্তুতি নিচ্ছ। আমি যদি তোমাকে স্যালুট না করি কাকে করব?
আমি যে স্কুলে শিক্ষকতা করি সেটা বাংলাদেশের খুব বিখ্যাত একটা স্কুল। প্রতিবছর ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে, পত্রপত্রিকায় তাদের ছবি ছাপা হয়। কিন্তু আমি জানি আমরা তাদের লেখাপড়া শিখাই না, আমরা তাদের ভালো নম্বর পাওয়া শিখাই। তাই তুমি যে এই খুব ভালো স্কুলে না পড়ে কোনো গহিন গ্রামের অখ্যাত একটা স্কুলে লেখাপড়া করছ সেটা কি আসলেই খুব ক্ষতি হলো? মনে হয় না, আমার ছাত্রছাত্রীরা সারাদিন স্কুল করে। স্কুলের পর বাকি সময়টা প্রাইভেট পড়ে আর কোচিং করে। এর চাইতে নিরানন্দ জীবন আর কী হতে পারে। তোমাকে অন্তত সেটা করতে হচ্ছে না, তুমি মনে হয় গাছ দেখতে পাচ্ছ, আকাশ দেখতে পাচ্ছ, ধানক্ষেত, নদী দেখতে পাচ্ছ। তুমি নিশ্চয়ই পূর্ণিমা দেখবে, জোছনার আলো দেখবে। আমরা বহুদিন সেগুলো দেখি না।
লেখাপড়াটা নিজের ওপর। আমি বিশবছর ধরে শিক্ষকতা করছি কিন্তু আমি জীবনে কখনো কাউকে কিছু শিখাইনি, আমার ছাত্রছাত্রীরা যা শিখেছে সব নিজে নিজে শিখেছে। আমি শুধু তাদের শিখতে উৎসাহ দিয়েছি। আমি তাই তোমাকে উৎসাহ দেয়ার জন্যে এই চিঠিটা লিখছি। আমি তোমাকে তিনটি বই পাঠাচ্ছি। প্রথম বইটা গণিতের বই–ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করতে যাওয়ার আগে যেটুকু গণিত জানা দরকার এখানে তার পুরোটুকু আছে। তুমি এর চ্যাপ্টারগুলো পড়বে, উদাহরণগুলো দেখবে আর চ্যাপ্টারের শেষে অঙ্কগুলো করবে। যেদিন তুমি এই বইটা নিজে নিজে শেষ করবে–সেদিন তুমি নিজে তোমার পিঠ চাপড়ে বলবে, “রাশা! তুমি সত্যিকার জীবনে ঢোকার জন্যে প্রয়োজনীয় গণিত শিখে গেছ।” দুই নম্বর
বইটা ফিজিক্সের। ভূমিকাটা পড়লে বুঝবে এটা আসলে লেখা হয়েছে। কলেজের ছেলেমেয়েদের জন্যে কিন্তু আমি দেখেছি যে এটা আসলে যে কেউ পড়তে পারবে। তুমি যদি এই বইটা শেষ করতে পারো তাহলে আমি নিজে গিয়ে তোমার দুই গালে দুটি চুমো দিয়ে আসব। তোমার নিজের বিশাল একটা লাভ হবে, স্কুলের বিজ্ঞান নিয়ে তোমার জীবনে কোনোদিন কোনো সমস্যা হবে না।
তিন নম্বর বইটা ইংরেজি গল্পের সংকলন। পৃথিবীর সেরা লেখকদের লেখা গল্প এখানে আছে। এটা মোটেও তেরো-চৌদ্দ বছরের একটা মেয়ের বই না। কিন্তু আমার ধারণা তুমি এখন মোটেও তোরো-চৌদ্দ বছরের মেয়ে না। তুমি খুব অল্প সময়ে অনেক বড় হয়ে গেছ কে জানে হয়তো আমার থেকেও বড়। তোমার ইংরেজির চর্চাটা রাখা দরকার সে জন্যে এটা পাঠালাম।
আমি বহুদিন গ্রামে যাইনি, গ্রাম হয়তো আর আগের মতো নেই। গ্রামে নিশ্চয়ই এখন নোংরামো, কুসংস্কার, ধর্মের বিধি-নিষেধ এসব ঢুকে গেছে, তুমি খুব সাবধানে থাকবে। তোমার যদি কোনো সাহায্যের দরকার হয় যে কোনোরকম সাহায্য–তাহলে আমাকে জানাবে। আমার টেলিফোন নম্বরটা মুখস্থ করে রেখো, ঠিক আছে?
তোমার
জাহানারা ম্যাডাম
রাশা তার ম্যাডামের চিঠিটা পরপর তিনবার পড়ল তারপর চিঠিটা ভাঁজ করে রেখে একটু কাদল–জ্বালা ধরানো হতাশার কান্না না! অন্য একরকম কান্না। তারপর সে বইগুলো দেখল, নীলক্ষেতের ফটোকপি করা ভুসভুসে বই না, বিদেশি বাধাইয়ের ঝকঝকে বই। বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় নতুন বইয়ের তাজা গন্ধটা পর্যন্ত আছে। কী সুন্দর পিছলে পিছলে পৃষ্ঠা, ঝকঝকে ছাপা, রঙিন ছবি, দেখলেই মনে হয় বইটা বুকে চেপে ধরে রাখি। রাশা অনেকক্ষণ বইগুলো নাড়াচাড়া করল, তার বই রাখার কোনো টেবিল বা সেলফ নেই, তাই সে বইগুলো রাখল তার বালিশের নিচে, সারাদিন যখনই সে একটু সময় পেল তখনই এসে বইগুলোতে একটু হাত বুলিয়ে গেল।
এই সপ্তাহটা রাশার জন্যে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সপ্তাহ হলো সম্পূর্ণ অন্য কারণে এই সপ্তাহে সে জীবনের প্রথম মার খেল। সে কখনো কল্পনা করেনি যে কেউ তার গায়ের ওপর হাত তুলবে কিন্তু ঠিক সেটাই ঘটল। ঘটনাটা ঘটল এভাবে :
রাজ্জাক স্যারের ক্লাস, স্যার প্রত্যেকদিনের মতো হাতে বেত নিয়ে ঢুকেছেন। টেবিলের ওপর বেতটা রেখে প্রথমে খানিকক্ষণ বকবক করলেন, তারপরে একটু পড়ানোর ভঙ্গি করলেন। তারপর পড়া ধরার ভান করে ছেলেমেয়েদের পেটাতে শুরু করলেন। কোনো একটা কারণে আজকে স্যারের মেজাজটা বেশি খারাপ ছিল, আজকে পেটাতে লাগলেন অনেক বেশি হিংস্রভাবে। ক্লাসের মাঝামাঝি একটা ছেলে মার খেতে খেতে আর সহ্য করতে না পেরে হাত দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করল আর তার ফল হলো ভয়ানক। স্যার মনে হয় আরো খেপে গেলেন, ছেলেটার চুলের মুঠি ধরে টেনে এনে বেঞ্চের ওপর ফেলে এমনভাবে মারতে লাগলেন যে দেখে মনে হতে লাগল বুঝি আজকে ছেলেটাকে মেরেই ফেলবেন।
