.
স্কুলে গণিত ক্লাসে কালোমতন টাকমাথাওয়ালা স্যার আজকেও কয়েকটা অংক তার নোটবই থেকে বোর্ডে টুকে দিলেন। আজকেও ইংরেজি ক্লাসে কোনো স্যার এলেন না, তখন গাজী দুটি গান শোনাল, তারপর মতিন নামে একটা ছেলে ক্যারিক্যাচার করে দেখাল। ছেলেমানুষি কেরিক্যাচার, রাশা তারপরেও জোর করে হাসার ভান করল। বিজ্ঞান ক্লাসে আবার রাজ্জাক স্যার হাতে বেত নিয়ে ঢুকলেন। বেতটা টেবিলে রেখে স্যার ক্লাসের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত কয়েকবার হেঁটে ক্লাসের সামনে এসে থামলেন, তারপর ক্লাসের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, “আজকে আমি তোদের কয়েকটা কথা বলব, তোরা মন দিয়ে শুনবি।
সারা ক্লাস নড়েচড়ে বসে। রাজ্জাক স্যার বললেন, “আমরা যখন স্কুলে পড়তাম তখন স্যারদের আমরা আলাদাভাবে সম্মান করতাম। যেখানেই স্যারদের সাথে দেখা হতো আমরা গিয়ে সালাম দিতাম। যদি দেখতাম স্যারেরা বাজারের ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছেন আমরা স্যারের বাসায় সেই ব্যাগ পৌঁছে দিতাম। আর এখন?”
রাজ্জাক স্যার চোখ পাকিয়ে তাকালেন, “সেইদিন একটা ছাত্র আমাকে দেখে সালাম দেয়া তো দূরের কথা, না দেখার ভান করে সুট করে একটা গলিতে ঢুকে পড়ল। সে কী ভেবেছে আমি তাকে দেখি নাই? ঠিকই দেখেছি, আমি একদিন চাবুকে তার ছাল তুলে দেব।”
স্যার গম্ভীর হয়ে বললেন, “এই দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই দেশ কোনো ভালো মানুষের জন্ম দেয় না। শুধু চোর-ছ্যাচড়ের জন্ম দেয়। এই দেশ শিক্ষকের মর্যাদা দেয় না। শিক্ষকের বেতন এত কম যে সংসার চলে না। তারপরেও আমি শিক্ষক হয়েছি। বুঝেছিস? শত শত চোর-উঁচড় বের করার মাঝে যদি একজনও ভালো মানুষ তৈরি করতে পারি তাহলে মনে করব শিক্ষকের জীবন সার্থক হয়েছে। বুঝেছিস?”
ছাত্রছাত্রীরা কলের পুতুলের মতো মাথা নাড়ল। স্যার বললেন, “একটা সাবজেক্ট ভালো করে পড়াতে অনেক সময় লাগে, আমাদের কি কেউ সেই সময় দেয়? দেয় না। সেই জন্যে ক্লাসে পড়া শেষ করতে পারি না। অন্য মাস্টারেরা হাল ছেড়ে দেয়, আমি দিই না। আমি আমার বাসায় পড়াই। যারা আমার বাসায় প্রাইভেট পড়ে তারা সবাই ভালো রেজাল্ট করে। আমি গত তিন-চার বছরের বোর্ডের প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা করে সাজেশন দেই, সেই সাজেশন থেকে প্রশ্ন আসে। আমি ইচ্ছা করলে সেই সাজেশন লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারতাম, আমি করি না। খালি আমার ছাত্রছাত্রীদের দিই।”
স্যার ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “কাজেই তোরা যারা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে চাস, ঠিকমতন লেখাপড়া করে মানুষ হতে চাস তারা স্কুলের পরে আমার বাসায় পড়তে আসবি। মনে থাকবে?”
ক্লাসের সবাই কলের পুতালের মতো মাথা নাড়ল। স্যার বললেন, “আর যারা আসবি না, আমি ধরে নিব তাদের লেখাপড়ায় উৎসাই নাই। তাদের জন্যে আমার কোনো মায়াদয়া নাই। বুঝলি?” সবাই মাথা নেড়ে জানাল তারা বুঝেছে। রাজ্জাক স্যার তারপর পড়াতে শুরু করলেন, একজন একজন ছাত্রকে রিডিং পড়তে দিলেন। যারা তার কাছে প্রাইভেট পড়ে তাদের রিডিং পড়া শুনে বললেন, ভেরি গুড। যারা পড়ে না তাদের ভুল করে পড়ার জন্যে পেটাতে শুরু করলেন।
রাশা আগে কখনো কোনো স্যারকে পেটাতে দেখেনি, তাই সেই দৃশ্য দেখে তার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। সে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে, এই দৃশ্য তার পক্ষে দেখা সম্ভব না। কোনোভাবেই সম্ভব না।
পরের এক সপ্তাহ সময়টা রাশার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা সপ্তাহ বলে ধরে নেয়া যায়। তার প্রথম কারণ তার আগের স্কুলের জাহানারা ম্যাডামের পাঠানো একটা প্যাকেট। ম্যাডাম টেলিফোনে বলেছিলেন স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্যে কাগজপত্রের দুটো অরিজিনাল কপি করে একটা স্কুলে আরেকটা তার নানির বাড়িতে পাঠাবেন। রাশা তাই সাদামাটা পাতলা একটা খামের জন্যে অপেক্ষা করেছিল, কিন্তু যেটি এলো সেটি রীতিমতো একটা প্যাকেট। রেজিস্ট্রি করে পাঠানো হয়েছে তাই রাশাকে সাইন করে সেটা নিতে হলো আর পিয়নকে তার সাথে একটু বখশিশও দিতে হলো।
প্যাকেটের ভেতরে ভর্তির জন্যে দরকারি অরিজিনাল কাগজপত্র ছাড়াও রয়েছে দুটি বই আর আরেকটা চিঠি। জাহানারা ম্যাডাম চিঠিটা লিখেছেন, চিঠিটা পড়তে পড়তে কয়েকবার রাশার চোখে পানি এসে গেল। ম্যাডাম লিখেছেন :
প্রিয় রাশা,
আমি জীবনে খুব বেশি চিঠি লিখিনি, কিন্তু মনে হলো তোমাকে একটা চিঠি লিখি। চিঠিতে যে কথাগুলো লিখছি সেটা ইচ্ছে করলে টেলিফোনেও তোমাকে বলতে পারতাম, কিন্তু মনে হলো চিঠিতে লেখাটাই ভালো হবে। অনেক কথা আছে যেগুলো মুখে বলা যায় না, চিঠিতে লেখা যায়। আবার অনেক কথা আছে যেগুলো চিঠিতে লেখা যায় না, কিস্তু মুখে বলা যায়।
আমি অনেক দিন থেকে শিক্ষকতা করছি, আমার অনেক ছাত্রছাত্রী তাদের কেউ কেউ অনেক বড় হয়েছে। তুমি তাদের অনেকের মতোই একজন ছাত্রী ছিলে, আমি আলাদা করে তোমাকে কখনো দেখিনি। এখন দেখছি। তুমি প্রথম যেদিন বলেছিলে তোমার আম্মু তোমাকে ফেলে চলে যাবেন আমি তোমার কথা বিশ্বাস করিনি, কিন্তু আমার মনে একটা খটকা লেগেছিল। ছোট ছেলেমেয়েদের এসব বিষয়ে একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে। হঠাৎ করে তুমি যখন স্কুলে আসা বন্ধ করে দিলে আর আমি খোঁজ নিয়েও তোমার খোঁজ পেলাম না তখন আমি তীব্র অপরাধবোধে ভুগেছি। আমার মনে হয়েছে তুমি আমার কাছে সাহায্যের জন্যে এসেছিলে, আমি তোমাকে সাহায্য করিনি।
