নানি পিঠ চাপড়ে বললেন, “সাবাশ মেয়ে সাবাশ!”
তারপর বলো, “তুমি আমার যোগ্য নাতনি! তুমি নিজে নিজে স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছ।”
নানি বললেন, “তুমি আমার যোগ্য নাতনি! তুমি নিজে নিজে স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছ।”
“এখন আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে আমার কপালে একটা চুমা দেও।”
নানি তার পিঠ চাপড়ে কপালে মাথায় গালে ঘাড়ে অনেকগুলো চুমো দিলেন।
রাশা একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বলল, “নানি, তুমি শুধু কোনোদিন আমাকে আমার স্কুলের নাম জিজ্ঞেস করো না। ঠিক আছে?”
“কেন?”
“এই স্কুলটার নাম একটা রাজাকারের নামে দেয়া হয়েছে। আমি আমার মুখে কোনোদিন রাজাকারের নাম উচ্চারণ করব না।”
নানি রাশার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কোনো কথা বললেন না। রাশা বলল, “আমার নানা এত বড় একটা মুক্তিযোদ্ধা আর আমি রাজাকারের নামে দেয়া একটা স্কুলে পড়ব, এটা তো হতে পারে না। এই নামটা বদলাতে হবে।”
“কিভাবে বদলাবি?”।
“আমি জানি না। তারপর নানির দিকে তাকিয়ে বলল, “মনে নাই তুমি আমাকে একটা মাদুলি দিয়েছ, বলেছ পাকসাফ হয়ে এই মাদুলি হাতে নিয়ে যা চাওয়া যায় সেটাই পাওয়া যায়?”
“হ্যাঁ বলেছি।”
“আমি সেটাই চাইব।”
“ঠিক আছে।”
রাশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “নানি।”
“কী হলো?”
“আমার আম্মু কোনোদিন নানার কথা কিছু বলে নাই। আমি আসলে কিছুই জানি না। তুমি আমাকে একদিন বলবে?”
নানি রাশার দিকে তাকালেন, রাশা দেখল নানির দৃষ্টিটা দেখতে দেখতে কেমন যেন উভ্রান্তের মতো হয়ে গেল। তার হাত অল্প অল্প কাঁপতে শুরু করল, নানি ফিসফিস করে বললেন, “সোনা আমার, আমাকে জিজ্ঞেস করিস না। ওই দিনগুলোর কথা মনে হলেই আমার মাথার ভিতর সব ওলটপালট হয়ে যায়। আমি আর কিছু করতে পারি না।”
রাশা অবাক হয়ে দেখল, নানির সবকিছু সত্যি সত্যি যেন ওলটপালট হয়ে গেল, কেমন যেন দিশেহারা হয়ে বসে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। রাশা ভয় পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “সরি নানি, সরি! আমি আসলে বুঝতে পারি নাই। আমি আর কোনোদিন জিজ্ঞেস করব না নানি। কোনোদিন জিজ্ঞেস করব না! খোদার কসম নানি কোনোদিন জিজ্ঞেস করব না।”
.
রাশা বইয়ের লিস্টটা বের করে বইয়ের দোকানের মানুষটার হাতে দিয়ে বলল, “আপনার কাছে এই বইগুলি আছে?”
মানুষটা লিস্টটা দেখে বলল, “আছে।”
“আমাকে দিবেন।”
মানুষটা তাক থেকে বইগুলি এবং সাথে আরো কিছু বই নামাল তারপর সেগুলো রাশার দিকে ঠেলে দিল। রাশা বোর্ডের বইগুলো আলাদা করে অন্য বইগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওগুলো কী?
“গাইড বই।”
“আমার গাইড বই লাগবে না।”
মানুষটা রাশার হাত থেকে বোর্ডের বইগুলো নিয়ে গাইড বইসহ সবগুলো বই আবার তাকে রেখে দিল। রাশা অবাক হয়ে বলল, “কী হলো?”
“গাইড বই ছাড়া আমরা বোর্ডের বই বিক্রি করি না।”
“সেটা আবার কী রকম কথা? আমার যেটা ইচ্ছা সেটা কিনব।”
মানুষটা বলল, “বোর্ডের বই বেঁচে আর কয় পয়সা পাওয়া যায়? আমাদের লাভ আসে গাইড বই বেচে। তুমি গাইড বইসহ কিনলে কিনো। ফিফটি পারসেন্ট ডিসকাউন্ট দিব।”
রাশা বলল, “কোনোদিনও আমি গাইড বই কিনব না।”
“তাহলে তোমার পাঠ্যবই কেনা হবে না। গাইড বই ছাড়া এই দেশে কেউ পাঠ্যবই বিক্রি করে না।”
“কে বলেছে?”
জয়নব রাশার কনুই ধরে ফিসফিস করে বলল, “সত্যি কথা।”
“সত্যি কথা?”
“হ্যাঁ। আমাদের সবার গাইড বই কিনতে হয়েছে।”
রাশা কিছুক্ষণ মানুষটার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে রইল তারপর বলল, “ঠিক আছে দেন।”
মানুষটা আবার বইগুলো নামিয়ে দিল। রাশা জিজ্ঞেস করল, “কত?”
মানুষটা একটা কাগজে হিসেব করে দাম বলল, রাশা তার ব্যাগ থেকে টাকা বের করে মানুষটার হাতে দিয়ে বলল, “আপনার কাছে একটা কঁচি আছে?”
“কাচি?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“একটু কাজ আছে।”
মানুষটা ডেস্কের নিচে খুঁজে একটা বড় কাঁচি বের করে দিল। রাশা তখন তার গাইড বইগুলো নিয়ে তার পৃষ্ঠাগুলো কাঁচি দিয়ে কাটতে শুরু করে। মানুষটা হা হা করে উঠল, বলল, “কী করছ? কী করছ?”
“পৃষ্ঠাগুলি কাটছি।”
“কেন?”
“ছোট ছোট টুকরো করব। ঐ যে মোড়ে চানাচুরওয়ালা আছে তাকে দিব। সে এইগুলিতে করে চানাচুর দেবে।”
“তু-তুমি টাকা দিয়ে বই কিনে সেগুলো নষ্ট করছ?”
“আমি মোটেও নষ্ট করছি না। আমি কাজে লাগাচ্ছি। গাইড বই কাজে লাগানোর এটা হচ্ছে উপায়!”
মানুষটা কেমন যেন অস্থির হয়ে যায়, “তুমি যখন নষ্টই করছ আমাকে দিয়ে দাও!”
“আমি মোটেও নষ্ট করছি না। আমি কাজে লাগাচ্ছি। আপনি যদি কোনো ছাত্র না হয় ছাত্রীর কাছে এই গাইড বই বিক্রি করেন সেটা হচ্ছে নষ্ট করা।”
রশি যত্ন করে সবগুলো পৃষ্ঠা কেটে ছোট ছোট টুকরো করল। বইয়ের দোকানের মানুষটা হাঁ করে রাশার দিকে তাকিয়ে রইল, আর রাশা কাগজের টুকরোগুলো হাতে নিয়ে মোড়ের চানাচুরওয়ালাকে দিয়ে দিল। চানাচুরওয়ালা অবাক হয়ে বলল, “এগুলো কী?”
রাশা বলল, “আপনি যখন চানাচুর বিক্রি করবেন তখন এই কাগজে করে দেবেন।”
চানাচুরওয়ালাকে কেমন জানি একটু বিভ্রান্ত দেখা গেল, তার কাগজের একটা মাপ আছে, এই কাগজগুলো মাপমতো হয়নি, একটু বড় হয়েছে। সে এগুলো দিয়ে কী করবে বুঝতে না পেরে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রাশ জয়নবের হাত ধরে তাড়াতাড়ি চলে আসে, চানাচুরওয়ালা যদি কাগজগুলো ফেলেও দেয় তবু মনে হয় সেটা কাজে লাগবে।
