এর আগে এই ক্লাসে কোনো মেয়ে কোনো ছেলের সাথে কথা বলেনি। যদি কেউ বলে ফেলে তখন কিভাবে তার উত্তর দিতে হয় সেটাও কেউ জানে না। গায়ক ছেলেটা তাই কথা না বলে চুপ করে রইল। রাশা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কারো কাছে গান শেখো?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল, বলল, “না।”
“তাহলে এত সুন্দর গান কেমন করে শিখেছ?”
“নিজে নিজে।”
“নিজে নিজে! কিভাবে?”
“ঐ তো সুবলের চায়ের দোকানে ক্যাসেট বাজে সেইটা শুনে শুনে শিখেছি।”
“কী আশ্চর্য! তুমি ক্যাসেট শুনে শুনে এত সুন্দর গান গাইতে পারো। তোমার যদি গানের ওস্তাদ থাকত তাহলে না জানি কত সুন্দর গান গাইতে!”
পিছনের দিকে বসে থাকা একজন বলল, “গানের ওস্তাদ! হ্যাঁহ্!” রাশা জিজ্ঞেস করল, “কেন? কী হয়েছে?”
“গাজীর বাপ যদি খালি খবর পায় হে গান গাইছে তাহলে তার শরীরের সবগুলি হাড়ি গুঁড়া করে ফেলবে।”
“কেন?”
“হের বাপ মুসুল্লি।”
রাশা জিজ্ঞেস করল, “মুসুল্লি মানুষ গান শুনতে পারে না?”
পিছনে বসে থাকা ছেলেটা বলল, “হের বাবা শুনে না।”
অন্যান্য ছেলে গাজীকে আরো গান শোনাতে বলল, গাজীর তখন একটু লজ্জা কেটেছে। সে একটা হাসন রাজার গান আরেকটা পল্লীগীতি গেয়ে শোনাল। গান শেষ করে গাজী যখন তার জীয়গায় ফিরে যাচ্ছে তখন রাশা বলল, “তুমি এত সুন্দর গান গাইতে পারো! আমার যদি অনেক টাকা থাকত তাহলে তোমার গলাটা আমি সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিতাম।”
কথাটা রাশা ঠাট্টা করে বলেনি, কিন্তু সেটা শুনে সবাই হি হি করে হাসতে থাকে। আনন্দে, ঠিক কিসের জন্য আনন্দ কে জানে!
.
ঘণ্টা পড়ার পর তাদের ক্লাসে এসে ঢুকলেন রাজ্জাক স্যার, হাতে লম্বা একটা বেত। রাশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আহারে না জানি কোন ছেলে বা মেয়েটাকে এই মানুষটা বেত দিয়ে মারবে। কে জানে, তাকেই মেরে বসবেন কিনা!
রাজ্জাক স্যার বেতটা বাতাসে নাড়াতে নাড়াতে প্রথমে ক্লাসের সামনে একটা চক্কর দিলেন। তারপর জানতে চাইলেন সবই পড়া শিখে এসেছে কিনা–ক্লাসের ছেলেমেয়েরা কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে বসে রইল। রাজ্জাক সার তখন একপাশ থেকে পড়া ধরতে শুরু করলেন। স্যার একটা প্রশ্ন করেন উত্তর ঠিক হলে স্যার ছেড়ে দেন উত্তর ভুল হলে স্যার হাতের বেতটা দিতে নির্দয়ভাবে মারতে থাকেন। যখন মারেন তখন নিচের ঠোঁটটা একটু বের হয়ে আসে, মুখ দিয়ে একধরনের শব্দ করেন–মনে হয় বুঝি লোল টেনে নিচ্ছে। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার।
কিছুক্ষণের মাঝে রাশা একটা জিনিস আবিষ্কার করল। ঠিক উত্তর দিলে স্যার ছেড়ে দিচ্ছেন আর ভুল উত্তর দিলে নির্দয়ভাবে মারছেন। কিন্তু কোনটা ঠিক উত্তর কোনটা ভুল উত্তর সেটা পুরোপুরি রাজ্জাক স্যারের ওপর নির্ভর করছে। রাশা আবিষ্কার করল পুরোপুরি ভুল উত্তর দিয়ে একটা ছেলে পার পেয়ে গেল কিন্তু তার পাশে বসে থাকা আরেকজন একটা শুদ্ধ উত্তর দিয়েও প্রচণ্ড মার খেল। ক্লাসে বসে কথা বলা বিপজ্জনক জেনেও রাশা পাশে বসে থাকা সানজিদাকে জিজ্ঞেস করল, “ঠিক উত্তর দিলেও স্যার মারছেন। আবার ভুল উত্তর দিয়েও—”
“ভুল-শুদ্ধ কোনো ব্যাপার নাই।” সানজিদা নিচু গলায় বলল, “যারা স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে না স্যার তাদের মারেন।”
“প্রাইভেট পড়ে না?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি পড়?”
“পড়ি।”
“তাহলে তুমি মার খাবে না?”
“না। কিন্তু শিউলী মার খাবে।”
“শিউলী প্রাইভেট পড়ে না?”
রাশা জিজ্ঞেস করল, “আর আমি?”
“প্রথম দিন এই জন্য মনে হয় তোমাকে ছেড়ে দেবেন।”
সানজিদার কথা সত্যি হলো। তাকে স্যার ছেড়ে দিলেন, শিউলী মার খেল। রাশাকে বললেন, প্রথম দিন বলে ছেড়ে দিচ্ছেন পরেরবার কিন্তু ছাড়বেন না।
গায়ক ছেলেটি প্রচণ্ড মার খেল। রাশা বুঝতে পারল স্যারের হিসেব খুব সোজা। যারা তার কাছে প্রাইভেট পড়বে স্যার তাদের দেখেশুনে রাখবেন। পরীক্ষার আগে প্রশ্ন বলে দেবেন, পরীক্ষায় ভালো নম্বর দেবেন, ক্লাসে পিটাবেন না। যারা প্রাইভেট পড়বে না তাদের পিটিয়ে সোজা করে দেবেন।
রাশা ক্লাসে বসে শীতল চোখে এই দানবটির দিকে তাকিয়ে রইল।
০৬. প্রথম শাস্তি
অনেক দিন পর রাশা তার সুটকেসটা খুলল, আসার সময় সে তার দরকারি জিনিসপত্রগুলো এই স্যুটকেসে করে এনেছে। তার মনে ছিল শেষ মুহূর্তে সে তার কিছু পাঠ্যবই স্যুটকেসটাতে ঢুকিয়েছিল। আজ স্যুটকেসটা খুলে সে সেগুলো বের করল। সবগুলো বই নেই, সেগুলো এখান থেকে কিনে নিতে হবে। অনেক খুঁজে দুটো খাতাও সে পেয়ে গেল, কালকে স্কুলে যাওয়ার মতো জোগাড়যন্ত্র আছে।
রাশা বিছানায় তার বইগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে খুলে খুলে দেখছিল, তখন নানি পাশে এসে বসলেন। বললেন, “তোর লেখাপড়ার জন্যে একটা চেয়ার টেবিল লাগবে, তাই না?”
“সেগুলো ধীরে ধীরে করলেই হবে নানি। বিদ্যাসাগর ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে পড়তেন–আমার তো তবু নিজের কুপি বাতি আছে।”
“তোর অনেক কষ্ট হচ্ছে, তাই না?”
“নানি, আমি তোমার কাছে মিথ্যা কথা বলব না, আসলেই অনেক কষ্ট হয়েছে। আমি জীবনেও কখনো এত দূর হেঁটে যাইনি। পা ব্যথা হয়ে গেছে।”
“দেখি তোর পাগুলো বের করো। টিপে দিই-”
রাশা হি হি করে হাসল, বলল, “নানি তুমি যে কী বলো! তুমি আমার পা টিপে দিবে কেন? তার চেয়ে তুমি আমার পিঠ চাপড়ে বলো, সাবাশ মেয়ে সাবাশ!”
