অঙ্কটা শেষ করার পর স্যার ক্লাসের দিকে তাকালেন, “সবাই লিখেছিস?”
“জি স্যার।”
স্যার এইবার বোর্ডটা মুছে নূতন একটা অঙ্ক লিখতে শুরু করলেন। রাশা লক্ষ করল, স্যার কিন্তু অঙ্কটা করছেন না, হাতে একটা নোট বই, সেই নোট বই দেখে দেখে অঙ্কটা বোর্ডে তুলছেন। কী আশ্চর্য!
পুরো ক্লাসটা এভাবে কেটে গেল। স্যার একটা একটা অঙ্ক বোর্ডে লিখে দিলেন ছেলেমেয়েরা সেটা তাদের খাতায় টুকে নিচ্ছে। এই তাহলে গণিতের ক্লাস।
এরকম সময় ঘণ্টা পড়ল এবং স্যার তার নোট বই, রেজিস্টার খাতা নিয়ে বের হয়ে গেলেন। ক্লাসের ছেলেমেয়েরা নিচু গলায় কথা বলতে শুরু করে। তার বেঞ্চে বসে থাকা মেয়েরা আড়চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু ঠিক কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। রাশা নিজেই কথা শুরু করল, তার পাশে যে মেয়েটা বসে ছিল সে পরীর মতো সুন্দরী! রাশা তাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?
“সানজিদা।”
“আমার আগের স্কুলে আমার প্রাণের বন্ধুর নাম ছিল সানজিদা।”
মেয়েটা কোনো কথা না বলে তার দিকে তাকিয়ে রইল। রাশা বলল, “আচ্ছা তোমার কী মনে হয়, আসলেই কী রাশা কারো নাম হতে পারে না?”
সানজিদা নামের মেয়েটা মাথা নাড়ল, বলল, “পারে। না হলে তোমার নাম হলো কেমন করে?”
“আমি তোমাকে একটা কথা বলি?”
সানজিদা মাথা নাড়ল, বলল, “বলো।”
“আগে বলো কাউকে বলবে না।”
“বলব না।”
“খোদার কসম?”
সানজিদা একটু অবাক হয়ে বলল, “খোদার কসম।”
আশেপাশের আরো কয়েকজন এবারে রাশার কাছে এগিয়ে এলো। কাউকে বলা যাবে না সেই গোপন কথাটা শোনার সবারই খুব আগ্রহ। রাশা গলা নামিয়ে বলল, “আসলে আমার নাম ছিল রাইসা। নামটা আমি দুই চোখে দেখতে পারতাম না। সেই জন্যে এটাকে বদলে রাশা করে ফেলেছি।”
মেয়েগুলো একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাল, নাম পছন্দ না হলে যে সেটা বদলে দেয়া যেতে পারে সেটা কোনোদিন তাদের মাথাতেই আসেনি।
শ্যামলা রঙের একটা মেয়ে জিজ্ঞেস করল, “যদি এখন এই নামটা তোমার পছন্দ না হয় তাহলে এইটাও বদলে ফেলবে?”
রাশ হাসল, বলল, “না আর বদলাব না।”
শ্যামলা রঙের মেয়েটা বলল, “রাইসা নামটা তো ভালোই ছিল, এটা বদলালে কেন?”
“তার একটা কারণ আছে।”
“কী কারণ?”
“আমাদের ক্লাসে একটা পাজি ছেলে ছিল সে আমার নাম নিয়ে একটা কবিতা তৈরি করেছিল।”
“কী কবিতা?”
“আগে বলো সেই কবিতা নিয়ে আমাকে খেপাবে না?”
“খেপাব না।”
“খোদার কসম?”
“খোদার কসম।”
“কবিতাটা ছিল এই রকম :
রাইসা
মাছের কাঁটা খায় বাইছা বাইছা–”
.
মেয়েগুলো এবারে শব্দ করে হেসে ফেলল, তখন অনেকগুলো ছেলে এবারে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কী নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে। রাশা জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের ক্লাসে এই রকম পাজি ছেলে নাই?”
মেয়েগুলো নিজেরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, একজন বলল, “জানি না।”
“জানো না? জানো না কেন?”
“আমরা ছেলেদের সাথে কথা বলি না। ছেলেরা ছেলেদের সাথে থাকে। মেয়েরা মেয়েদের সাথে থাকে।”
রাশা অবাক হয়ে বলল, “কোনোদিন কথা বলো নাই?”
“নাহ।”
“কেন?”
মেয়েরা কোনো কথা বলল না, ক্লাসের কেউ জানে না কেন ছেলেরা আর মেয়েরা একে-অন্যের সঙ্গে কথা বলে না। এভাবেই চলে আসছে।
এরকম সময় ছেলেদের অংশ একটু হট্টগেলি শোনা গেল। দেখা গেল সবাই মিলে একটা ছেলেকে তুলে তাকে সামনের দিকে ঠিলে দিচ্ছে। ছেলেটা সামনে আসতে চাইছে না কিন্তু কেউ তার কথা শুনছে না। রাশা মেয়েদের জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
“এই ছেলেটা সুন্দর গান গাইতে পারে। মনে হয় তাকে গান গাইতে বলছে?”
“গান গাইবে? এখন ক্লাস হবে না?”
“নাহ্। ইংরেজি স্যার বহুদিন থেকে আসে না।”
“কেন?”
“জানি না। স্যার নাকি লন্ডন চলে গেছে।”
রাশা অবাক হয়ে বলল, “লন্ডন চলে গেছে? তাহলে অন্যেরা ক্লাস নিবে না?”
“অন্য কেউ কি আছে নাকি! কোনো স্যারটার নাই।”
গায়ক ছেলেটি আবার তার সিটে গিয়ে বসে যাচ্ছিল, তখন রাশা গলা উঁচিয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, “প্লিজ, তুমি গান শোনাও আমাদের।”
পুরো ক্লাস হঠাৎ একেবারে চুপ করে গেল, একটা মেয়ে একটা ছেলের সাথে কথা বলছে সেটা আগে কখনো এই ক্লাসে ঘটেনি। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না, তারপর একজন বলল, “হ্যাঁ। গাজী, তুই গান শোনা আমাদের।”
অন্যেরাও তখন বলতে থাকে, “হ্যাঁ। শোনা, শোনা।”
ক্লাসে একটা হট্টগোল শুরু হয়ে যাচ্ছিল, তখন একজন বলল, “আস্তে! চেঁচামেচি করবি না তাহলে রাজ্জাক স্যার বেত নিয়ে চলে আসবে।”
হট্টগোলটা একটু কমে এলো তখন গাজী নামের গায়ক ছেলেটা লাজুক মুখে সামনে এগিয়ে এলো। তাকে দেখে মনে হয় সে বুঝি একটু নার্ভাস। সামনে দাঁড়িয়ে সে চোখ বন্ধ করে গান গাইতে শুরু করে। সাথে সাথে পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কী সুন্দর গলা, কী সুন্দর তাল-লয়ের ওপর দখল, রাশা একেবারে হতবাক হয়ে গেল। ছেলেটা চোখ বন্ধ করে গাইছে,
“সময় গেলে সাধন হবে না।
দিন থাকতে দিনের সাধন কেন করলে না”
দেখে মনে হয় সত্যিই বুঝি এই বাচ্চা ছেলেটার কিছু একটা সাধনা করার কথা ছিল, সে সময় থাকতে সেটা করতে পারেনি, তাই তার বুকটা বুঝি ভেঙে যাচ্ছে দুঃখে!
গান শেষ হবার পর সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। রাশা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “তুমি কি সুন্দর গান গাইতে পারো!”
