“রাশা শোনো। “বলেন ম্যাডাম।”
“তুমি আমার সাথে যোগাযোগ রাখবে। বুঝেছ?”
“রাখব ম্যাডাম। আমার জন্যে দোয়া করবেন ম্যাডাম।”
জাহানারা ম্যাডাম কোনো কথা বললেন না।
.
আধা ঘণ্টা পরে আহাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার অবাক হয়ে দেখলেন তার স্কুলে ভর্তি হতে চাইছে মেয়েটি হাতে কিছু কাগজপত্র নিয়ে চলে এসেছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার?”
“আপনি যে কাগজ চেয়েছিলেন। আমার স্কুল থেকে ফ্যাক্স করে দিয়েছে। অরিজিনালগুলো কুরিয়ার করেছে, কাল-পরশু পৌঁছে যাবে।”
হেডমাস্টার কাগজগুলো দেখে জানতে পারলেন এই মেয়েটি অত্যন্ত মেধাবী একটি ছাত্রী। গণিত অলিম্পিয়াডে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। খুব ভালো ডিবেট এবং আবৃত্তি করতে পারে। পারিবারিক একটা সমস্যার কারণে এই স্কুল থেকে টিসি নিচ্ছে এবং তাকে সবরকম সাহায্য করার জন্যে অনুরোধ করা যাচ্ছে। স্কুলের হেডমিস্ট্রেস আলাদা একটা চিঠি দিয়ে লিখেছেন এই মেয়ে সম্পর্কে অন্য যে কোনো তথ্যের দরকার হলে যেন তার সাথে যোগাযোগ করা হয়। হেডমিস্ট্রেস লিখেছেন মেয়েটি সোনার টুকরো মেয়ে। বিখ্যাত একটা স্কুলের হেডমিস্ট্রেস, হেডমাস্টার তার নাম শুনেছেন, সবাই তাকে চিনে।
হেডমাস্টার নিজেই এবার উঠে দাঁড়ালেন, রাশার কাগজপত্র আর রাশাকে নিয়ে পাশের ঘরে গেলেন। একটা কেরানি অনেকগুলো ফাইলের মাঝখানে বসে পান চিবুচ্ছে, হেডমাস্টারকে দেখে উঠে দাঁড়াল। হেডমাস্টার ফ্যাক্সে আসা কাগজগুলো তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “হরিপদ, তুমি এই মেয়েটাকে ক্লাস এইটে ভর্তি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করো।”
“ভর্তির ফি?”
“পরে দিবে। কাল-পরশু নিয়ে আসবে। শুধু যেটা দরকার সেটা দিবে, এক পয়সাও যেন বাড়তি চার্জ না হয়।”
ঠিক এরকম সময় রাজ্জাক মাস্টার সেখানে হাজির হলো। সে কেরানির হাত থেকে কাগজগুলো নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে বলল। “স্যার, এইগুলি তো ফ্যাক্স। ফ্যাক্স এর কোনো ভ্যালু নাই। অরিজিনাল কাগজ ছাড়া তো ভর্তি করা যাবে না। তাছাড়া ভর্তি ফিয়ের একটা ব্যাপার আছে না।”
হেডমাস্টার এই প্রথমবার কঠিন হলেন, মুখ শক্ত করে বললেন, “রাজ্জাক সাহেব আমি কুড়ি বছর থেকে হেডমাস্টারি করি। কোথায় অরিজিনাল কাগজ লাগে আর কোথায় ফ্যাক্স দিয়ে কাজ চলে যায় আমি সেটা জানি। আর এই মেয়ে যদি ভর্তি ফি না দেয় আমি সেটা দিব। বুঝেছেন?”
বাশা দেখল রাজ্জাক মাস্টারের মুখটা অপমানে কালো হয়ে গেল। রাশা ইতস্তত করে বলল, “আমি ভর্তি ফি দিব, আমি কালকেই ফি নিয়ে আসব।”
হেডমাস্টার বললেন, “আমি জানি মা তুমি আনবে। তুমি কাল থেকে ক্লাস শুরু করো। আমাদের গ্রামের স্কুলের অবস্থা খারাপ। স্কুল ভাঙাচোরা মাস্টাররাও ভাঙাচোরা। লেখাপড়া ভালো হয় না, তোমার খুব কষ্ট হবে। কিন্তু লেখাপড়া নিজের ওপর। বিদ্যাসাগর ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে পড়তেন। বুঝেছ?”
“জি স্যার বুঝেছি।”
রাশা চলে না গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাই হেডমাস্টার জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি আর কিছু বলবে?”
“জি স্যার।”
“বলো।”
“আসলে আমরা বেশ কয়েকজন মিলে একসাথে অনেক দূর থেকে হেঁটে এসেছি, আবার একসাথে হেঁটে হেঁটে ফিরে যাব। আমাকে তো অপেক্ষাই করতে হবে। আমি কি আজকেই ক্লাসে বসতে পারি?”
“পারবে না কেন? অবশ্যই পারবে। আসো আমার সাথে।”
রাশা হেড স্যারের পিছু পিছু যেতে থাকে। স্কুল শুরু হয়ে গেছে, কোনো একটা ক্লাসে কোনো একজন স্যার কোনো একজন ছাত্রকে বেত দিয়ে শপাং শপাং করে মারছেন, তার চিৎকার শোনা যাচ্ছে। এটা মনে হয় এখানকার খুব সাধারণ ঘটনা, কারণ হেডমাস্টার সেটা শুনছেন বলেই মনে হলো না।
কোনার দিকে একটা ক্লাসঘরের সামনে গিয়ে হেডমাস্টার দাঁড়ালেন। ভেতরের ছেলেমেয়েরা হেডমাস্টারকে দেখে সবাই দাঁড়িয়ে গেল, মাথায় টাক কালোমতন একজন বোর্ডে কী যেন লিখছিলেন তিনিও বোর্ডে লেখা বন্ধ করে হেডমাস্টারের দিকে তাকালেন। হেডমাস্টার রাশাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের বসতে বললেন। তারপর কালোমতন মাথায় টাক স্যারকে বললেন, “মাজাহার সাহেব, এই মেয়েটা ক্লাস এইটে ভর্তি হবে। হরিপদ কাগজপত্র ঠিক করছে, আজ থেকেই ক্লাস করতে শুরু করুক।”
“ঠিক আছে স্যার।”
হেডস্যার ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাদের ক্লাসে নতুন এসেছে। সে খুব ভালো ছাত্রী! তোমরা সবাই তাকে সাহায্য করো। ঠিক আছে?”
ছাত্রছাত্রীরা কলের পুতুলের মতো মাথা নাড়ল। হেডস্যার চলে যাবার পর মাথায় টাক কালোমতন স্যার সরু চোখে রাশার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “নাম কী?”
“আমাকে সবাই রাশা নামে ডাকে।”
“রাশা?”
“জি স্যার।”
“রাশ তো মানুষের নাম না, রাশা তো দেশের নাম। রাশিয়াকে ইংরেজিতে বলে রাশা!”
ক্লাসের কয়েকজন ছেলেমেয়ে একটু হেসে উঠে আবার থেমে যায়, রাশা কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
স্যার বললেন, “রাশা না হয়ে তোমার নাম হওয়া উচিত ছিল রাইসা। রাইসা নামের একটা অর্থ আছে। রাশার কোনো অর্থ নাই।”
রাশা এবারেও কোনো কথা বলল না, এরকম সময়ে যত কম কথা বলা যায় ততই ভালো।
স্যার বললেন, “যাও। ৰসো।”
সামনের বেঞ্চের একটা মেয়ে সরে গিয়ে একটু জায়গা করে দিল, ‘রাশা সেখানে গিয়ে বসল। স্যার আবার চক নিয়ে বোর্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। রাশা দেখল স্যার বোর্ডে একটা অঙ্ক করে দিচ্ছেন। মুখে একটি কথা না বলে স্যার পুরো অঙ্কটা করে দিলেন, ছেলেমেয়েরা সেটা তাদের খাতায় টুকে নিল।
