“বলেছি ভর্তির টাকা-পয়সা নিয়ে এসে ভর্তি হতে।”
রাজ্জাক নামের মাস্টারটা মাথা নাড়ল, “না স্যার। এইভাবে ভর্তি করা যাবে না।”
হেডমাস্টার দুর্বল গলায় বললেন, “সিট আছে, সমস্যা কোথায়?”
“সমস্যা অন্য জায়গায়।”
“কোন জায়গায়?”
“বাবা-মা ছাড়া একা একা একটা মেয়ে চলে আসছে, আপনি তার আগে-পিছে কিছু জানেন? হয়তো বাড়ি থেকে পালিয়েছে। আপনি ভর্তি করে পুলিশ কেসে পড়বেন। আজকালকার ছেলেমেয়ে কী ডেঞ্জারাস আপনি জানেন?”
রাশা হতবাক হয়ে মানুষটার কথা শুনতে লাগল! কী বলবে বুঝতে পারল না।
রাজ্জাক নামের মানুষটা বলল, “দেখে তো বোঝাই যাচ্ছে। শহরের সব ছেলেমেয়ে এখন ড্রাগের ওপরে আছে। আপনি না জেনেশুনে ভর্তি করবেন, দেখবেন পরের দিন এই গ্রামের স্কুলের অর্ধেক ছেলেমেয়ে ড্রাগ অ্যাডিক্ট! দিনকাল খুব খারাপ স্যার।”
রাশা বলার চেষ্টা করল, “আমি মোটেও ড্রাগ অ্যাডিক্ট না।”
রাজ্জাক নামের মানুষটা রাশার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আর হেড স্যার কথা বলছি, তুমি তার মাঝে কথা বলার চেষ্টা করছ কেন?”
“আমাকে নিয়ে কথা হচ্ছে তো তাই”
রাজ্জাক নামের মানুষটা চোখ পাকিয়ে একবার রাশার দিকে তাকাল তারপর হেড স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখেছেন কেমন বেয়াদপ? মুখে মুখে কথা বলে! এই রকম মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করবেন? আপনার স্কুলের বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দেবে।”
হেডমাস্টার বললেন, “যাই হোক, স্কুলে যখন সিট আছে ভর্তি করে নিই। এখন কোন নিয়মে ভর্তি করবে বলো?”
“আগের স্কুল থেকে টিসি, পরীক্ষার রেজাল্ট, হেডমাস্টারের টেস্টিমনিয়াল আর ফটো আই. ডি. ছাড়া ভর্তি করা ঠিক হবে না। আপনি পরে বিপদে পড়ে যাবেন স্যার।”
“এই মেয়ের বাবা-মা থাকে দেশের বাইরে। কোনো গার্জিয়ান নাই, বুড়ি নানির সাথে থাকে। সে কোথা থেকে এই সব কাগজপত্র আনবে?”
“সেইটা তো আমাদের চিন্তা না স্যার। সেইটা এই মেয়ের চিন্তা। কাগজপত্র আনবে ভর্তি হবে। কাগজপত্র নাই, ভর্তি নাই।”
হেডমাস্টার রাশার দিকে তাকালেন, দুর্বলভাবে হাসার চেষ্টা করে বললেন, “শুনেছ তো? তুমি তোমার আগের স্কুল থেকে টিসি, পরীক্ষার মার্কশিট, টেস্টিমনিয়াল আর ফটো আই, ডি, না আনলে ভর্তি করা যাবে না।”
রাশা মুখ কাঁচুমাচু করে কিছু একটা অনুরোধ করতে যাচ্ছিল কিন্তু রাজ্জাক নামের মানুষটার সামনে তার সেটা করার ইচ্ছে করল না। নিচু
গলায় বলল, “ঠিক আছে স্যার।”
বাইরে উদ্বিগ্ন মুখে জয়নব দাঁড়িয়ে ছিল, জিজ্ঞেস করল, “হয়েছে?” রাশা মাথা নাড়ল, বলল, “না, হয় নাই?”
“কেন?”
“হেডমাস্টার রাজি ছিলেন। কিন্তু রাজ্জাক নামে একজন স্যার এসে সব গোলমাল করে দিলেন। অনেক রকম কাগজপত্রের কথা বললেন।”
“আছে কাগজপত্র?”
“কোথা থেকে থাকবে?”
“তাহলে?” রাশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দেখি। আমার আগের স্কুলের ম্যাডামের সাথে কথা বলতে হবে।”
“কিভাবে বলবে?”
“চিঠি লিখতে হবে মনে হয়।”
“ফোন নাম্বার নাই?”
“আছে।” রাশাকে জাহানারা ম্যাডাম তার ফোন নাম্বারটা দিয়ে বলেছিলেন দরকার হলে ফোন করতে। নাম্বারটা তার মুখস্থ আছে। অনেকবার সে ভেবেছে ফোন করবে কিন্তু কেন যেন করা হয়নি।
জয়নব বলল, “তাহলে এখনই ফোন করো।”
“কোথা থেকে করব?”
“বাজারে ফোন-ফ্যাক্সের দোকান আছে। চলো তোমাকে নিয়ে যাই।”
“এক্ষুণি তোমার স্কুল শুরু হবে না?”
“হোক, একদিন ক্লাস না করলে কিছু হবে না।”
জয়নব যখন রাশাকে নিয়ে রওনা দিয়েছে তখন জিতুও তাদের সাথে তার ক্লাস থেকে বের হয়ে এলো। তার ক্লাস করতে ভালোই লাগে না যে কোনো সুযোগে সে স্কুল থেকে বের হয়ে আসে।
.
জাহানারা ম্যাডামের ফোনে ডায়াল করে রাশা শুনতে পেল অন্যপাশে ফোন রিং হচ্ছে, খুট করে একটা শব্দ হলো, তারপর জাহানারা ম্যাডামের গলার স্বর শুনতে পেল, “হ্যালো।”
রাশা বলল, “ম্যাডাম, আমি রাশা।”
অন্যপাশে জাহানারা ম্যাডাম হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের জন্যে চুপ করে গেলেল, তারপর ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “রাশা, তুমি কোথায়?”
“আমি আমার নানি বাড়িতে।”
“তোমার নানি বাড়ি কোথায়?”
“আপনি চিনবেন না ম্যাডাম একটা গভীর গ্রামে।”
“কেন গিয়েছ? কত দিন থাকবে?”
“আমার মা আমাকে এখানে রেখে বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছেন।”
অন্যপাশে জাহানারা ম্যাডাম অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তুমি আমাকে কিছু বললে না রাশা?”।
রাশা চোখের পানি আটকে বলল, “বলে কী হবে ম্যাডাম। যার মা তার মেয়েকে এভাবে ফেলে রাখে তাকে অন্যেরা কী করবে?”
জাহানারা ম্যাডাম বললেন, “এখন কেমন আছ? কী করছ?”
“ভালোই আছি। একটা স্কুলে ভর্তি হব তাই কাগজপত্র লাগবে সেই জন্যে ফোন করেছি।”
“কী কাগজপত্র?”
“টিসি, টেস্টিমনিয়াল, মার্কশিট আর ফটো আই. ডি. ফটো আই. ডি. আমার কাছে আছে। অন্যগুলি লাগবে।”
“ঠিক আছে। আশেপাশে ফ্যাক্স-এর দোকান আছে?”
“আমি একটা ফোন-ফ্যাক্স-এর দোকান থেকেই ফোন করছি।”
“গুড়। তুমি ফ্যাক্স নাম্বারটা দাও। আমি আধাঘণ্টার ভিতরে সবকিছু এখানে ফ্যাক্স করে পাঠাব। দুই কপি অরিজিনাল তৈরি করে এক কপি কুরিয়ার করব তোমার স্কুলে, আরেক কপি পাঠাব তোমার নানি বাড়িতে।”
“ঠিক আছে ম্যাডাম।”
“দাও, ফ্যাক্স নাম্বার দাও। ঠিকানাগুলি দাও।”
“দিচ্ছি ম্যাডাম। থ্যাংকু ম্যাডাম।”
