“কী নাম?”
“আহাদ আলী।”
রাশা নামটা যেন কোথায় শুনেছে কিন্তু ঠিক মনে করতে পারল না।
০৫. ভাঙাচোরা স্কুল
জয়নব বলল, “ঐ যে আমাদের স্কুল।”
রাশা তাকিয়ে দেখল তারা যে মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে আসছে তার শেষ মাথায় একটা বড় ঝাকড়া গাছ, গাছের নিচে কিছু টিনের ঘর। সামনে একটা খোলা মাঠ, সেখানে কিছু ছেলেমেয়ে ছোটাছুটি করে খেলছে।
আজ সকালে রাশা তার গ্রামের ছেলেমেয়েদের সাথে হেঁটে হেঁটে তাদের স্কুলটা দেখতে এসেছে। সে যদি লেখাপড়া করতে চায় তাহলে এখানেই পড়তে হবে। স্কুলটা অনেক দূরে, কমপক্ষে তিন মাইল, হেঁটে আসতে আসতে একঘণ্টা লেগে গেছে।
আরেকটু এগিয়ে গিয়ে স্কুলের সাইনবোর্ডটা চোখে পড়ল, বড় বড় করে স্কুলের নাম লেখা, আহাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়। রাশা জয়নবের দিকে তাকিয়ে বলল, “আহাদ আলী কে?”
“পাশের গ্রামের একজন মাতবর। অনেক টাকা।”
“তুমি বলেছিলে পাশের গ্রামে একজন রাজাকারও ছিল, নাম আহাদ আলী।”
“একই মানুষ।”
“একই মানুষ?” রাশা চমকে উঠল, “একটা রাজাকারের নামে স্কুল?”
জয়নব মুখ কালো করে মাথা নাড়ল। বলল, “এখন সবাই মনে হয় ভুলেই গেছে ব্যাটা রাজাকার ছিল। স্কুল তৈরি করেছে, মাদ্রাসা তৈরি করেছে। অনেক টাকা।”
“কী করে?”
“জানি না। যুদ্ধের সময় হিন্দুদের জমি দখল করেছিল। তখন থেকে বড়লোক।”
রাশা হতভম্ব হয়ে স্কুলের সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইল। তার নানা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন, আর সে রাজাকারের নামে দেয়া একটা স্কুলে পড়বে? ছিঃ!
জয়নব তার ক্লাসে বই-খাতা রাখতে গেল। রাশা তখন তার ক্লাসঘরটা একবার উঁকি দিয়ে দেখে একটা ক্লাসঘর যে এত খারাপ হতে পারে সে নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করত না। সস্তা কাঠ দিয়ে তৈরি বেঞ্চ, দেখে মনে হয় ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। জোড়াতালি দিয়ে কোনোভাবে দাঁড় করে রাখা হয়েছে। দেয়াল থেকে ইট বের হয়ে আছে, সামনে রং ওঠা একটা বিবর্ণ ব্ল্যাকবোর্ড। ক্লাসের মেঝে একসময় পাকা করা হয়েছিল, এখন জায়গায় জায়গায় গর্ত। ছেঁড়া কাগজ, গাছের পাতা, ধূলাবালিতে পুরো মেঝেটা নোংরা হয়ে আছে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আসছে, গ্রামের ছেলেমেয়ে বেশিরভাগেরই পায়ে জুতো পর্যন্ত নেই। স্কুলের পোশাক নেই, তাই যার যেটা ইচ্ছে সেটা পরে এসেছে, দেখে স্কুল বলেই মনে হয় না। ছেলেমেয়েগুলোর শুকনো চেহারা দেখেই বোঝা যায় গরিব ঘর থেকে এসেছে।
জয়নব তার বই-খাতা রেখে রাশাকে তাদের হেডমাস্টারের রুমে নিয়ে গেল। এক কোনায় ছোট একটা রুমে একজন বয়স্ক মানুষ একটা খাতার উপর ঝুঁকে কিছু একটা দেখছিলেন, জয়নব বলল, এই মানুষটাই নাকি হেডমাস্টার। রাশা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, “আসতে পারি স্যার?”
হেডমাস্টার খাতা থেকে চোখ না তুলে বললেন, “কে?”
রাশা কী বলবে বুঝতে পারল না, ইতস্তত করে বলল, “আমি স্যার একটা জিনিস নিয়ে একটু কথা বলতে এসেছি।”
এবারে হেডমাস্টার মুখ তুলে তাকালেন, রাশাকে দেখে একটু অবাক হয়ে গেলেন, বললেন, “আসো। কী বিষয়?”
“আমি স্যার একটু খোঁজ নিতে এসেছিলাম। আপনাদের স্কুলে ভর্তি হতে হলে কী করতে হয় সেটা জানতে চাচ্ছিলাম।”
হেডমাস্টার একটু অবাক হয়ে রাশার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তার জীবনে কখনোই হয়নি যে একটা ছাত্র বা ছাত্রী নিজে নিজে স্কুলে এসে ভর্তি হতে চেয়েছে। সবসময়েই বড় একজন মানুষ ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করতে নিয়ে এসেছে। হেডমাস্টার জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাবা-মা কই?”
“দেশের বাইরে। “দেশের বাইরে কোনখানে?”
রাশা ভেতরে ভেতরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, এখন তাকে তার পুরো ইতিহাসটা বলতে হবে। বলতেই যখন হবে তখন আর ইতিউতি করে লাভ নেই, সোজাসুজি বলে ফেলাই ভালো। রাশা তাই সোজাসুজি বলে ফেলল, “আমার বাবা কানাডায় আছেন। মা আছেন অস্ট্রেলিয়ায়। আমাকে এখানে গ্রামে নানির কাছে রেখে গেছেন। এখন এখানেই থাকতে হবে সে জন্যে ভর্তি হতে এসেছি।”
হেডমাস্টার কিছুক্ষণ রাশার দিকে তাকিয়ে রইলেন তারপর বললেন, “তোমার নানি ছাড়া আর কোনো গার্জিয়ান নাই?”
“না।”
“কোন ক্লাসে ভর্তি হতে চাও?”
“ক্লাস এইট।”
এই স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সেরকম চাপ নেই, তারপরেও হেডমাস্টার সাহেব একটু ভাব দেখালেন, বললেন, “স্কুলে সিটের খুব সমস্যা। বছরের মাঝখানে ভর্তি করলে অনেক ঝামেলা হয়।”
রাশা বলল, “জানি স্যার, কিন্তু আমার কোনো উপায় ছিল না।”
“দেখি কী করা যায়। কিন্তু স্কুলের খরচপাতি আছে, ভর্তি ফি আছে, মাসে মাসে বেতন আছে। টাকা কে দেবে?”
“আমি দেব স্যার। কত টাকা লাগবে বললে আমি নিয়ে আসব।”
হেডমাস্টারের চোখে এবারে হালকা একটা লোভের ছাপ পড়ল। নিচু গলায় বললেন, “আগের মাসের বেতন। ভর্তি ফি। স্পেশাল ফি। কন্টিজেনসি সব মিলিয়ে তিন-চার হাজার পড়বে”।
রাশা ভয়ে ভয়ে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক আছে স্যার।”
এরকম সময় আরেকজন মানুষ হেডমাস্টারের রুমে এসে ঢুকল, গালে হালকা দাড়ি, শক্ত-সমর্থ শরীর, বয়স খুব বেশি নয়। হেডমাস্টার বললেন, “রাজ্জাক, ভালোই হয়েছে তুমি আসছ। এই মেয়েটা ক্লাস এইটে ভর্তি হতে চাচ্ছে।”
রাজ্জাক নামের মানুষটা একবার চারিদিকে তাকাল, “কার সাথে আসছে?”
“নিজেই আসছে। পারিবারিক সমস্যা আছে।” রাজ্জাক নামের মাস্টারটা এবারে রাশাকে ভালো করে দেখল আর রাশা সাথে সাথে বুঝে গেল মানুষটা তাকে অপছন্দ করে ফেলেছে। মানুষটা হেডমাস্টারের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কী বলেছেন?”
