“বিদেশ। পাসপোর্ট হয়ে গেছে।”
“কোনদিন যাবেন?”
“তারিখ ঠিক হয় নাই। দুবাই চলে যাব। বিশাল জায়গা। টাকা পয়সার ছড়াছড়ি, খালি ধরব আর পকেটে ভরব।” মানুষটা কেমন করে টাকা ধরে পকেটে ভরবে সেটা অভিনয় করে দেখাল।
জয়নৰ বলল, “আমরা যাই।”
তারপর রাশার হাত ধরে টেনে হাঁটতে থাকে। মানুষটা পিছন থেকে বলল, “বাবারে সালাম দিও। নতুন ওসি সাহেবকে নিয়ে একদিন তোমাদের বাড়িতে আসব।”
রাশা নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে মানুষটা?”
“ফালতু মজিদ। এই গ্রামে দুইজন মজিদ, একজনের বাজারে একটা দোকান আছে। সে হচ্ছে আসল মজিদ। আর এ হচ্ছে ফালতু মজিদ। কোনো কামকাজ করে না, খালি বড় বড় কথা বলে!”
রাশা মুখ টিপে হাসল, বলল, “লোকটার পোশাক দেখছ? একেবারে জোকার!”
“হ্যাঁ। সবসময় পকেট থেকে চিরুনি বের করে চুল আঁচড়াচ্ছে।”
.
গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে তিনজন হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ জয়নব থেমে গেল। রাশা দেখল একটা পুকুরের পাশে একটা বড় গাছ, সেই গাছে হেলান দিয়ে একজন বয়স্ক মানুষ খুব মনোযোগ দিয়ে একটা বই পড়ছে। মানুষটা নিশ্চয়ই চোখে ভালো দেখতে পায় না। তাই বইটা চোখের খুব কাছে নিয়ে ধরেছে। তিনজন কথা বলতে বলতে আসছে সেটা শুনেও মানুষটা মুখ তুলে তাকাল না। জয়নব আর জিতু তখন কাছাকাছি গিয়ে বলল, “মালেকুম চাচাজি।”
মানুষটা মুখ তুলে তাকাল, মাথায় পাকা চুল, চোখে চশমা, বলল, “ওয়ালাইকুম সালাম জয়নব বেটি। ওয়ালাইকুম সালাম জিতু মিয়া। তোমাদের সাথে এই মেয়েটি কে?”
জয়নব বলল, “মাস্টারবাড়ির নাতনি।”
জিতু যোগ করল, “রাশাপু।”
মানুষটা তখন সোজা হয়ে বসে, বইয়ের পৃষ্ঠা ভঁজ করে রাখল, বলল, “তুমি আজিজ মাস্টারের নাতনি? একটু কাছে আসো, তোমাকে ভালো করে দেখি।”
রাশা একটু এগিয়ে যায়, মানুষটা তার হাত ধরে সামনে বসিয়ে তাকে ভালো করে দেখল, তার মুখ কেমন একটা নরম হাসিতে ভরে যায়, তোমার চেহারায় আজিজ ভাই সাহেবের ছাড় আছে।
রাশা ঠিক কী করবে বুঝতে পারল না। ইতস্তত করে বলল, আপনি আমার নাকে চিনতেন?
মানুষটি একটা হাসল, বলল, চিনতাম বললে কম বলা হবে। তোমার নানা আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন! বুঝেছ? দুইজন মানুষের সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে খাঁটি বন্ধুত্ব হয় কখন জানো? যখন দুইজন পাশাপাশি যুদ্ধ করে। তোমার নানা আর আমি একসাথে যুদ্ধ করেছি। তোমার নানা চিল আমাদের কামন্ডার।
মানুষটি পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে তার চশমা খুলে শার্টের কোনা দিয়ে মুছে বলল, তোমার নানা ধরা পড়ার পর যখন তাকে ধরে নিয়ে গেল, বুঝলে মেয়ে, আমাদের মনে হলে আমাদের সব শেষ হয়ে গেল। ইস!
রাশা একটু বিস্ময় নিয়ে এই বয়স্ক মানুটির দিকে তাকিয়ে রাইল, হঠাৎ করে সে বুঝতে পারল সে আসলে তার নানা কেমন মানুষ ছিলেন, কিভাবে মারা গিয়েছিলেন সে তার কিছুই জানে না।
মানুষটি একটা নিশ্বাস ফেলে অন্যমনস্কভাবে বললত, আজিজ ভাই সাহেবকে আমি না করেছিলাম। বলেছিলাম এখন যাবেন না। তোমার মায়ের মাত্র জন্ম হয়েছে, দেখার জন্যে পাগল হয়ে গেল। এসে ধরা পড়ল। ভাবীর ওপর সেটা যে কী একটা ধাক্কা–আহারে! মানুষটা রাতারাতি অ্যাবনরমাল হয়ে গেল।
রাশা কিছুই জানে না, তার খুব জানার ইচ্ছে করছিল, কিন্তু সে একটাও প্রশ্ন করল না। চুপ করে মানুষটার সামনে বসে রইল। মানুষটা বলল, সেই দেশের জন্যে তোমর নানা জান দিয়েছিল সেই দেখটাও বেঁচে আছি, চিন্তা করলে মাঝে মাঝে খুব অপরাধী লাগে।
রাশা বলল, “অপরাধী লাগবে কেন?”
“লাগার কথা না। কিন্তু অপরাধী লাগে। কী করব?” মানুষটা গলার স্বর পাল্টে বলল, “যাও মা। কোথায় যাচ্ছিলে যাও। বুড়ো মানুষ তো তোমাদের বয়সী মানুষ দেখলেই কথা বলতে ইচ্ছা করে। আর তুমি হচ্ছ-”
“রাশা।”
“হ্যাঁ। রাশা। তুমি হচ্ছ আজিজ ভাই সাহেবের নাতনি। তার মানে তুমি আমারও নাতনি। আমি হচ্ছি তোমার সালাম না।
“সালাম নানা?”
“হ্যাঁ। আজিজ নানার বন্ধু সালাম নানা।” মানুষটি রাশার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “আমি বুড়ো মানুষ নানা ডাকা ঠিক আছে। আজিজ ভাইয়ের সাথে কিন্তু নানা কথাটা যায় না। যখন শহীদ হয়েছে তখন তার বয়স তেইশ না হয় চব্বিশ। হাট্টাকাট্টা জোয়ান। কী সুন্দর রাজপুত্রের মতো চেহারা। কুচকুচে কালো চুল, যুদ্ধের সময় দাড়ি কাটতে পারে নাই বলে চে গুয়েভারার মতো দাড়ি। সে তো আমার মতো বুড়ো হয় নাই। তাকে কিন্তু
তুমি নানা ডাকবে না।”
“তাহলে কী ডাকব?”
“ভাই ডাকবে। আজিজ ভাই।”
মানুষটি গাছে হেলান দিয়ে ভারী চশমার ভেতর দিয়ে রাশার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে রইলেন।
সালাম নানার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসার সময় রাশা লক্ষ করল, গাছে দুটি ক্রাচ হেলান দিয়ে রাখা আছে। কাঠের ক্রাচ, অনেক ব্যবহারে মসৃণ হয়ে আছে। তার মানে সালাম নানার পা নেই।
জয়নব বলল, “সালাম চাচা, আমাদের গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় পায়ে গুলি খেয়েছিলেন, তাই পা কেটে ফেলেছে। ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটেন।”
রাশা বলল, “ও।”
“আমাদের গ্রামে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা। একজন তোমার নানা–”
“আমার ভাই।”
জয়নব হাসল, বলল, “হ্যাঁ, তোমার ভাই, শহীদ। আরেকজন আমাদের সালাম চাচা।”
“এই গ্রামে কোনো রাজাকার নাই?”
“না। কোনো রাজাকার নাই। পাশের গ্রামে আছে।”
