রাশা জানতে চাইল “কেন?”
“এই গাইটা পাগল। কাছে গেলেই ঢুঁস দিবে।”
“পাগল কেমন করে হলো?”
“সেইটা জানি না। অমাবস্যার রাত্রে ছাড়া পেয়ে একবার শুশানঘাটে ঢুকে গিয়েছিল, মনে হয় সেই থেকে পাগল।”
রাশা এই ব্যাখ্যাটার কোনো ব্যাখ্যা চাইল না। জিতু হাঁটতে হাঁটতে একটা ঝাঁপড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বলল, “রাত্রিবেলা কখনো এই গাছের নিচ দিয়ে হাঁটবা না।”
“কেন?”
“এইটা শ্যাওড়াগাছ। এই গাছে ভূত আছে।”
“কী করে ভূতে?”
“রাত্রিবেলা কেউ নিচে দিয়ে গেলে তার শরীরে পেশাব করে দেয়।”
ভূতদের নিশ্চয়ই কাজকর্ম থাকে, তারপরেও শুধু মানুষের ওপর পেশাব করার জন্যে শ্যাওড়াগাছে কেন বসে থাকতে হয় রাশা সেটা বুঝতে পারল না। কিন্তু রাশা সেটা নিয়ে জিতুর সাথে তর্ক করল না, এতক্ষণে সে বুঝে গিয়েছে জিতুর সব কথাতেই ভূত-প্রেত জিন-পরীর গন্ধ থাকে।
প্রথমে তারা যে বাড়িটাতে গেল তার সামনে একটা বড় উঠোন, আর সেখানে ধান বিছিয়ে শুকানো হচ্ছে। ধান খাবার জন্য কিছু পাখি ওড়াউড়ি করছে; কমবয়সী একটা মেয়ে একটা বাঁশের কঞ্চি হাতে নিয়ে সেগুলোকে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। জিতু মেয়েটাকে বলল, “শিউলী দেখ তোদের বাড়িতে কোন অতিথকে নিয়ে এসেছি।”
রাশা গলা নামিয়ে বলল, “শব্দটা অতিথ না, অতিথি।” জিতু শুদ্ধ শব্দ বলায় কোনো উৎসাহ দেখাল না, গলা উঁচিয়ে বলল, “সফুরা খালা, আপনার বাড়িতে বিদেশি অতিথ নিয়ে আসছি।”
রাশা কেমন করে বিদেশি অতিথি হলো সে বুঝতে পারল না। দেখা গেল বাড়ির চারপাশ থেকে পিলপিল করে নানা আকারের মানুষজন বের হয়ে এলো। বিদেশি অতিথিটা কে সবাই জানে এবং সবারই তাকে দেখার একটা কৌতূহল আছে। কেউ কিছু বলার আগেই রাশা বলল, “আমি তো আগে কখনো এই গ্রামে আসি নাই, কারো সাথে পরিচয় নাই। তাই জিতু মিয়াকে নিয়ে বের হয়েছি সবার সাথে পরিচয় করতে।”।
বয়স্ক একজন মহিলা রাশার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “খুব ভালো করেছ মা। আমরা খালি তোমাদের কথা শুনি। কোনোদিন দেখি নাই। আজকে দেখলাম, দেখে আমাদের বুকটা ভরে গেল।”
রাশা একটু অবাক হয়ে বয়স্কা মহিলাটার মুখের দিকে তাকাল, তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে কথাটা শুধু বলার জন্যে বলেনি, সত্যি সত্যি বলেছে। সত্যি রাশাকে দেখে তার বুকটা ভরে গেছে। তাকে চেনে না, জানে না, কোনোদিন দেখেনি কিন্তু তার পরেও তাকে দেখে এই সাদাসিধে বয়স্কা মহিলার বুকটা ভরে গেছে। কী আশ্চর্য। ঠিক কী কারণ জানা নেই, রাশার চোখের কোনায় হঠাৎ একটু পানি চিকচিক করে ওঠে। সেটা গোপন করে সে সহজ গলায় বলল, “আমি তো এখন নতুন এসেছি, আপনাদের কাউকেই চিনি না! আস্তে আস্তে পরিচয় হবে।”
আরেকজন এসে তার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, “তুমি কি আসলেই এখানে থাকবে নাকি আমাদের ভেতর মায়া জাগিয়ে চলে যাবে?”
রাশা বলল, “আসলেই থাকব।”
ছোট একটা মেয়ে হাততালি দিয়ে বলল, “কী মজা!”
মধ্যবয়স্কা মহিলাটা বলল, “এই, জলচৌকিটা এনে দে। মেয়েটা বসুক।”
রাশা বলল, “আজকে বসব না। গ্রামের সব বাড়িতে যাব তো তাই দেরি করব না। আরেক দিন এসে বসব।”
“তাই বলে তুমি খালি মুখে চলে যাবে নাকি? কিছু একটা খেতে হবে।”
রাশা বলল, “না-না-না, কিছু খাব না।”
মহিলা মাথা নাড়লেন, “কিছু একটা খেতে হবে।”
রাশা মহিলার হাত স্পর্শ করল, বলল, ‘বিশ্বাস করেন, আমি খেয়ে বের হয়েছি। আরেক দিন খাব।”
“ঠিক আছে তাহলে একটা ডাব খেয়ে যাও। ডাবের পানি খেতে তো আর পেটে জায়গা থাকতে হয় না।”
মহিলাটি একটা শুকনো কালো ছেলেকে ডেকে বললেন, “এই মতি। তাড়াতাড়ি কয়টা ডাব পাড় দেখি।”
মতি নামের শুকনো টিংটিংয়ে ছেলেটা সাথে সাথে তার লুঙ্গি মালকোচা মেরে পরে কোথা থেকে একটা ধারালো দা এনে পিছনে গুঁজে নিল। তারপর উঠানের কয়েকটা নারকেল গাছের দিকে তাকিয়ে একটাকে বেছে নিয়ে সেটা বেয়ে তরতর করে উঠে যেতে লাগল। রাশা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, এরকমভাবে কেউ যে নারকেল গাছে উঠে যেতে পারে সেটা সে নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করত না। দেখে মনে হচ্ছে মতি নামের ছেলেটা বুঝি মানুষ না, যেন সে একটা টিকটিকি!
রাশা নিশ্বাস আটকে বলল, “হায় খোদা! যদি পড়ে যায়?”
ছোট মেয়েটা বলল, “পড়বে না! মতি বান্দরের বাচ্চার মতো গাছে উঠে। এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফ দিতে পারে।”
রাশা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, “সর্বনাশ!”
মতি সত্যি সত্যি একটা বানরের মতো নারকেল গাছের উপরে উঠে যায়, পিছন থেকে দা-টা বের করে দক্ষ হাতে কোপ দিয়ে দুটি ডাব কেটে নেয়, তারপর যেভাবে উঠেছিল ঠিক সেভাবে তরতর করে নেমে এলো। তাকে দেখে মনে হয় শুকনো মাটিতে হাঁটাহাঁটি করার থেকে গাছ বেয়ে উঠা এবং নমা তার জন্যে সহজ।
মতি ডাবটার পেছন দিকটা কেটে একটা ছোট ফুটো করে সেটা রাশার হাতে তুলে দিল। রাশা জিজ্ঞেস করল, “কেমন করে খাব?”
“মুখে লাগিয়ে!”
“সত্যি?”
মতি নামের শুকনো কালো ছেলেটা তার ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হেসে বলল, “সত্যি!”
রাশ ডাবটা তার মুখে লাগিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করল, যতটুকু তার মুখের ভেতর গেল তার থেকে অনেক বেশি তার গাল বেয়ে গড়িয়ে গলা-বুক ভিজিয়ে দিল। সেই দৃশ্য দেখে ছোট বাচ্চাগুলো আনন্দে হি হি করে হেসে গড়াগড়ি খেতে থাকে। এত অল্পে মানুষকে এত আনন্দ দেয়া যায় রাশা আগে কোনোদিন টের পায়নি।
