রাশা তার নানিকে শক্ত করে ধরে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগল। এই মানুষটিকে সে চব্বিশ ঘণ্টা আগেও চিনত না, কখনো দেখেনি। এখন তার
এই মাথা খারাপ নানিটিই হচ্ছে সারা পৃথিবীর মাঝে একমাত্র ভরসাস্থল। নানি রাশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, তার মাথার মাঝে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেতে লাগল, তারপরও তিনি রাশাকে ধরে রাখলেন।
০৪. সবার সাথে পরিচয়
রাশার ঘুম ভাঙল খুব ভোরে, বাইরে তখনো ভোরের আলো ফুটে ওঠেনি। শুয়ে থেকেই সে শুনতে পেল নানি উঠোন ঝাট দিচ্ছেন। এত সকালে কেন উঠান ঝাট দিতে হবে রাশা বুঝতে পারে না। সে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়, নানি তাকে দেখে ঝাঁট দেয়া বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, “তুই এত সকালে ঘুম থেকে উঠেছিস কেন?”
“ঘুম ভেঙে গেল। তুমি এত সকালে উঠান ঝাট দিচ্ছ কেন?”
“জানি না।”
“জানো না?”
“নাই। কিছু একটা না করলে সময় কাটে না, তাই কাজকর্ম করি।”
“আমাকে দাও ঝাঁটাটা, আমি উঠানটা ঝাড় দিই।” নানি হাসলেন, বললেন, “তোকে উঠান ঝাট দিতে হবে না।”
“আমি পারব নানি।”
“আমি জানি তুই পারবি। না পারার কী আছে?”
“তাহলে?”
“আমার মাথা আউলাঝাউলা, তাই আমি এরকম উল্টাপাল্টা কাজ করি। তুই কেন করবি?”
রাশা বারান্দা থেকে নেমে বলল, “তাহলে কী করব বলো।”
“কিছু একটা যদি করতেই চাস, তাহলে মোরগ আর হাঁসের ঘরের দরজাগুলো খুলে দে।
রাশা তখন উঠানের এক কোনায় হাঁস-মোরগের ঘরের দরজাটা খুলে দিল, সাথে সাথে কক কক শব্দ করে প্রথমে মোরগ-মুরগি তাদের পিছু পিছু থপথপ করে হাঁসগুলো বের হয়ে এলো। মুরগিটা বারকয়েক ডানা ঝাঁপটিয়ে শব্দ করতে থাকে তখন বাচ্চাগুলো কিচিমিচি শব্দ করে তার মাকে ঘিরে ধরে। কী মজার একটা দৃশ্য!
নানি বললেন, “ভিতরে ডিম আছে না দেখ দেখি।”
রাশা মাথা নিচু করে তাকিয়ে দেখে সত্যি সত্যি সেখানে দুটি ডিম। সে হাত দিয়ে ডিম দুটি বের করে এনে বলে, “কী আশ্চর্য!”
“কোন জিনিসটা আশ্চর্য?”
“এই যে ডিম! আমি ধরেই নিয়েছিলাম ডিম ফ্রিজের ভিতরে পাওয়া যায়! ভুলেই গিয়েছিলাম যে আসলে হাঁস-মুরগি ডিম পাড়ে।”
“হাত-মুখ ধুয়ে আয় তোকে ডিম ভাজি করে দিই। নাস্তা করবি।”
.
একটু বেলা হতেই গ্রামের বউ-ঝিরা আসতে শুরু করল, সবাই রাশাকে একনজর দেখতে চায়। যে মেয়েটির বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে এবং যার মা তাকে গ্রামের বাড়িতে পাগলি নানির কাছে ফেলে রেখে চলে গেছে সেই মেয়েটি দেখতে কেমন সেটা জানার জন্য সবার মাঝেই কৌতূহল। রাশা প্রথমে কিছুক্ষণ কাঠ হয়ে বসে থাকে কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই তার কাছে পুরো ব্যাপারটা অসহ্য মনে হতে থাকে। খুব মাথা ধরেছে বলে সে একসময় বাড়ির ভেতরে ঢুকে বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইল।
বউ-ঝিরা হতাশ হয়ে চলে যাবার পর নানি এসে রাশার মাথার কাছে বসলেন, কপালে হাত রেখে বললেন, “শরীরটা কি বেশি খারাপ লাগছে?”
রাশা উঠে বসল, বলল, “না, নানি। আমার শরীর ঠিকই আছে কিন্তু এই যে মানুষজন আমাকে দেখতে আসছে, আমি সেটা সহ্য করতে পারছি না।”
নানি বললেন, “ও।”
“আমি কী আজগুবি একটা জন্তু যে মানুষ আমাকে দেখতে আসবে?”
নানি একটু হাসলেন, বললেন, “এই গ্রামের মানুষের কাছে তুই আসলেই আজগুবি একটা জন্তু।”
“থ্যাংক ইউ নানি!”
“আমি বলি কী–তুই নিজেই গ্রামটা ঘুরে আয়। সবার সাথে পরিচয় করে আয়। তাহলে কেউ তোকে আর বিরক্ত করবে না।”
“আমি? আমি নিজে?”
নানি মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ।”
“তুমি আমার সাথে যাবে?”
“নাহ্!” নানি মাথা নাড়লেন, “আমি পাগলছাগল মানুষ, আমার ঘর থেকে বের হতে ভালো লাগে না।”
“তাহলে? আমি তো কিছুই চিনি না।”
এই সমস্যাটা সমাধান করার জন্যেই মনে হলো ঠিক এই সময় জিতু ঘরের ভেতর উঁকি দিল, উদ্বিগ্ন মুখে বলল, “রাশপুর নাকি শরীর খারাপ। কলেরা?”
রাশা চোখ কপালে তুলে বলল, “কলেরা? আমার?”
জিতু ঘরে ঢুকে বলল, “হ্যাঁ। জোবেদা ফুপু তোমাকে দেখতে আসছিলেন, তোমার শরীর খারাপ সেই জন্যে দেখতে পারেন নাই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে। ফুপু বললেন, জানি না, মনে হয় কলেরা।
শহরের মানুষ গ্রামে আসলেই পেটে অসুখ হয়। কলেরা হয়।”
রাশা মাথা নাড়ল, বলল, “না। আমার কলেরা হয় নাই।”
“তাহলে কী হয়েছে?”
“কিছুই হয় নাই।”
“কিন্তু–“
রাশা জিতুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “জিতু মিয়া তুমি একটা কাজ করতে পারবে?”
“পারব না কেন? একশবার পারব।”
রাশা ভুরু কুঁচকে বলল, “কাজটা কী না শুনেই যে বলে দিলে পরব? আমি যদি এখন বলি আমাকে ঘাড়ে করে বাজারে নিয়ে যেতে হবে?”
জিতু দাঁত বের করে হেসে বলল, “আজিব! তুমি আজিব!”
রাশা হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “আমি এখন এই গ্রামটা ঘুরে ঘুরে দেখব। সবার বাড়িতে বেড়াতে যাব। তুমি আমাকে নিয়ে যাবে?”
জিতুর চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, হাতে কিল মেরে বলল, “সবার আগে আমাদের বাড়ি।”
রাশা বলল, “সেটা দেখা যাবে!”
জিতুকে নিয়ে বের হওয়ার পর রাশা বুঝতে পারল এ কাজের জন্যে জিতু থেকে ভালো আর কেউ হতে পারে না। সে যে শুধু এই গ্রামের সব মানুষকে চিনে তা নয়, গরু-ছাগল-ভেড়া এমন কি গাছগুলোকেও চিনে। সে যে শুধু কোন মানুষ কী রকম সেটা বলতে পারে তা নয়, কোন গরু ছাগলের কী রকম মেজাজ সেটাও বলতে পারে। বাড়ি থেকে বের হয়েই সে দূরে একটা গরুকে দেখিয়ে বলল, “ঐ যে কালো গাইটা দেখছ, খবরদার ঐটার ধারেকাছে যাবা না।”
