বহুদিন আগে রাশার যখন চিকেন পক্স হয়েছিল তখন তার কিছুদিন জোর করে ডাবের পানি খেতে হয়েছিল, তার কাছে মনে হয়েছিল এটা আঁশটে গন্ধের বিস্বাদ একটা তরল। কিন্তু গাছ থেকে পেড়ে আনা এই ডাবটার পানি মিষ্টি এবং সুস্বাদু। গন্ধটাও সুন্দর। রাশা শখ করে খানিকটা খেয়ে বলল, “আর পারছি না।”
মধ্যবয়সী মহিলাটি বললেন, “জিতু তুই খেয়ে ফেল।”
জিতু কোনো আপত্তি না করে সাথে সাথে রাশার হাত থেকে নিয়ে ডাটা মুখে লাগিয়ে ঢকঢক করে খেতে শুরু করল।
বিদায় নিয়ে আসার সময় রাশা হঠাৎ থেমে গেল। পাশের মাটির একটা ঘরের বারান্দায় পেট মোটা একটা বাচ্চা পা ছড়িয়ে বসে আছে, তার শরীরে কোনো কাপড় নেই। সামনে মাটিতে কিছু মুড়ি ছড়ানো, সে গভীর মনোযোগ দিয়ে মাটি থেকে তুলে তুলে একটা একটা করে মুড়ি খাচ্ছে। কাছাকাছি একটা শালিক পাখি মুড়িতে ভাগ বসানোর চেষ্টা করছে। বাচ্চাটা একটু অসতর্ক হলেই শালিক পাখিটা ছুটে এসে একটা-দুইটা মুড়ি খেয়ে নিচ্ছে।
রাশা যখন অবাক হয়ে এই দৃশ্যটি দেখছে তখন জিতু জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে রাশাপু?”
“এই বাচ্চাটা কার?”
কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা একজন কমবয়সী মেয়ে বলল, “আমার।”
“মাটি থেকে মুড়ি তুলে খাচ্ছে ওর তো অসুখ করবে।”
মেয়েটা একটু বিব্রতভাবে হেসে বলল, “করবে না। ওর অভ্যাস আছে।”
রাশা বলল, “কিন্তু এইটা তো খুব খারাপ অভ্যাস! মাটিতে কত রোগ জীবাণু। আমাদের স্কুলে একটা মাইক্রোস্কোপ আছে, আমাদের স্যার দেখিয়েছিলেন, জীবাণুরা গিজগিজ করছে। ওকে একটা বাটিতে না হয় থালায় করে দিন।”
মেয়েটি একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “থালা বাটিতে দিলে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলে। মাটিতে ছিটিয়ে দিলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেকক্ষণ ধরে খায়।”
রাশা থতমত খেয়ে গেল। একটু ইতস্তত করে বলল, “কিন্তু মাটি থেকে তুলে খেলে তো অসুখ হবে।”
“একটু-আধটু অসুখ হলে কী হয়? সবারই হয়।”
রাশা অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল, কী বিচিত্র একটা যুক্তি! সে অবশ্যি এত সহজে মেয়েটার যুক্তি মেনে নিল না, মাটি থেকে মুড়িগুলো সরিয়ে একটা বাটিতে মুড়ি দিতে তাকে বাধ্য করে ছাড়ল। মজার ব্যাপার হচ্ছে যারা হাজির ছিল তারা সবাই ধরে নিল পুরো ব্যাপারটা হচ্ছে শহরের একটা মেয়ের ছেলেমানুষি কাজকারবার। তারা হাসি হাসি মুখে ব্যাপারটা দেখল যেন একটা নাটক দেখছে, কিন্তু তার কথাটাকে কেউ কোনো গুরুত্ব দিল বলে মনে হলো না।
.
গ্রাম ঘুরে দেখার জন্যে বের হয়ে রাশা প্রথম বাড়িটাতে এসেছিল শুধু জিতুকে নিয়ে, এখান থেকে যখন বের হলো তখন তার সাথে যোগ দিল মতি এবং আরো দুটি কমবয়সী বাচ্চা।
পরের বাড়িটাতে গিয়ে সে আবিষ্কার করে সেখানে কিভাবে কিভাবে যেন খবর চলে গেছে যে সে আসছে, এবং সবাই তার জন্যে অপেক্ষা করছে। এখানেও মোটামুটি একই ব্যাপার ঘটল, সবাই রাশাকে এমনভাবে ঘিরে ধরল যেন সে ভিনদেশি রাজকন্যা, ভুল করে একটা গ্রাম ঘরে চলে এসেছে। এ বাড়িতেও তাকে একটা জলচৌকিতে বসানো হলো এবং একটা থালায় করে তার জন্যে নারকেলের নাড় আর চিড়ে ভাজা আনা হলো। রাশা খাবে না, খাবে না বলে আপত্তি জানালেও তাকে একটা নাড় আর খানিকটা চিড়া খেতে হলো। সে এর মাঝে টের পেতে শুরু করেছে এখানে খাওয়া ব্যাপারটার সাথে খিদে কিংবা খাওয়ার ইচ্ছের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা একটা সামাজিক ব্যাপার, সে যদি না খায় তাহলে সবাই মন খারাপ করে ফেলে।
রাশা এই গ্রামের মানুষদের আন্তরিক ভালোবাসাটুকু বুঝতে পারে, কিন্তু একই সাথে তাদের নিষ্ঠুরতাটুকু বুঝতে পারে না। যখন সে নারকেলের নাড়টাতে কামড় দিয়েছে, তখন একজন জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাবা তোমার মাকে ছেড়ে দিয়ে নাকি লন্ডন চলে গেছে?”
রাশা বিষম খেতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “লন্ডন না, কানাড়া।”
“সেইটা কোথায়?”
“আমেরিকার কাছে।”
“তোমার বাবা আবার বিয়ে করেছে?”
রাশা মাথা নাড়ল।
মহিলাটি জিজ্ঞেস করল, “তোমার মা?”
রাশা হতবাক হয়ে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর আবিষ্কার করল সে বলছে, “হ্যাঁ। করেছে।”
“তোমার সৎ বাপ কী করে?”
“আমি জানি না। আমি তাকে দেখি নাই।”
মহিলাটি আরো কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল তখন ঠিক তার বয়সী একটা মেয়ে বাধা দিল, বলল, “মা, তুমি রাশাকে শান্তিমতো একটু খেতেও দিবা না? একটু খেতে বসেছে তখন হাজারটা প্রশ্ন।
মহিলাটি তখন থতমত খেয়ে থেমে গেল। রাশা কৃতজ্ঞ চোখে মেয়েটার দিকে তাকাল, শুকনো ছিপছিপে তার বয়সী একটা মেয়ে।
যখন সে বিদায় নিয়ে বের হচ্ছে তখন মেয়েটি তার সাথে সাথে বের হয়ে এলো। বাড়ির বাইরে এসে মেয়েটি তার হাত ধরে বলল, “তুমি কিছু মনে করো নাই তো?”
মেয়েটি কী নিয়ে কথা বলছে রাশা বুঝতে পারল, তারপরেও সে না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করল, “কী নিয়ে কিছু মনে করি নাই?”
“এই যে আমার মা-ফুপু তোমাকে তোমার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে, তোমার বাবার কথা জিজ্ঞেস করে।”
রাশা মাথা নাড়ল, বলল, “না, কিছু মনে করি নাই।”
মেয়েটা মুখ শক্ত করে বলল, “কারো কোনো আক্কেল নাই। কখন কাকে কী জিজ্ঞেস করা যায় কেউ জানে না। এত বড় হয়েছে কিন্তু কারো বুদ্ধি হয় নাই। সবাই বাচ্চা মানুষের মতো।”
