.
ঘরে একটা মাত্র ছোট খাট, তাই রাতে কেমন করে ঘুমানো হবে সেটা নিয়ে রাশার ভেতরে খানিকটা দুশ্চিন্তা ছিল। খাবার পরেই নানি বিছানায় একটা পরিষ্কার কথা বিছিয়ে দিয়ে বললেন, “নে ঘুমা।”
রাশা বলল, “তুমি?”
“আমি মাটিতে একটা মাদুর বিছিয়ে নেব।”
“না না–সেটা কেমন করে হয়। তুমি বিছানায় ঘুমাও নানি, আমি নিচে ঘুমাব।”
“তুই নিচে ঘুমাবি?”
“হ্যাঁ।“
“রাত্রিবেলা যখন শরীরের ওপর দিয়ে ইঁদুর দৌড়ে যাবে তখন ভয় পাবি না তো?”
“ইঁদুর?” রাশা চোখ কপালে তুলে বলল, “শরীরের ওপর?”।
নানি হাসলেন, বললেন, “ধুর বোকা মেয়ে, ঠাট্টা করলাম। ইঁদুর তো আছেই। তারা এত বোকা না যে মানুষের শরীরের ওপর দিয়ে দৌড়াবে।”
“স-সত্যি? ইঁদুর আছে?”
“গাঁও-গেরামে ইঁদুর থাকবে না তো কী থাকবে? ইঁদুর ইঁদুরের মতো থাকে আমরা আমাদের মতো থাকি। কেউ কাউকে ঘাঁটাই না।”
“তাই বলে ইঁদুর?”
“ইঁদুরের কথা শুনেই এত ভয় পাচ্ছিস, সাপ দেখলে তোর কী অবস্থা হবে?”
“সাপও আছে?” রাশা ফ্যাকাসে মুখে বলল, “ঘরের ভেতরে?”
“এখন নাই। বর্ষাকালে যখন পানি হবে তখন ঘরের ভেতরেও সাপ চলে আসে। সাপদের থাকতে হবে না কোথাও?”
“কামড় দেয় না?”
“শুধু শুধু কামড় দেবে কেন? আমরা ওদের ঘাটাই না ওরাও আমাদের ঘাটায় না।”
রাশা একটু ইতস্তত করে বলল, “নানি।”
“কী হলো?”
“একটা কাজ করা যাক।”
“কী কাজ?”
“তুমিও বিছানার ওপর চলে এসো। দুইজনের জায়গা হয়ে যাবে।”
নানি হাসলেন, বললেন, “তাহলে তুই ঘুমাতে পারবি না। আমার সারারাত ঘুম হয় না। আমি শুধু ছটফট করি। পাগল মানুষ তো, মাথার ভিতরে আউলাঝাউলা হয়ে আছে, উল্টাপাল্টা জিনিস দেখি। হাহুতাশ করি। বেশির ভাগ রাত্রে আমি বারান্দায় বসে থাকি।”
“বসে কী করো?”
“কিছু করি না। মাথাটা ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করি।”
রাশা কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “ও।” একটু পরে বলল, “আমিও বারান্দায় বসে ছিলাম, বসে বসে আকাশের তারা দেখেছি।”
নানি মাথা নাড়লেন, বললেন, “আকাশে লক্ষ লক্ষ তারা।”
“আমি যখন তারা দেখছিলাম তখন একটা তারা শাই করে ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল। মনে হলো যেন পড়ে গেল।”
“তখন কী চাইলি?”
“চাইলাম? কার কাছে?”
“ও! তুই জানিস না? যখন আকাশ থেকে তারা খসে পড়ে তখন সেই তারার দিকে তাকিয়ে যেটা চাওয়া যায় সেটাই পাওয়া যায়।”
“সত্যি?”
“লোকেরা তো বলে! চেষ্টা করে দেখিস পরেরবার।”
.
রাত গম্ভীর হলে রাশা বিছানায় শুতে গেল। বিছানায় শুয়ে সে তার ঘড়িটা দেখে অবাক হয়ে যায়, মাত্র সাড়ে নয়টা বাজে। এর মাঝে চারপাশে নিশুতি রাত।
বিছানায় শুয়ে রাশ এপাশ-ওপাশ করতে থাকে। সারাটা দিন কিভাবে কিভাবে যেন কেটে গেছে, এখন রাতে অন্ধকার একটা ঘরে ছোট একটা বিছানায় নরম কাথার উপর শুয়ে শুয়ে রাশার সবকিছু মনে পড়ে যায়। রাশার মনে হতে থাকে তার বুকের ভেতরটা যেন গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। কী চমৎকার একটা স্কুলে সে পড়ত, তার কত চমৎকার বন্ধুরা ছিল সেখানে, তার স্কুলের ম্যাডামরা তাকে কত আদর করতেন। বাবা চলে গেছেন, মায়ের সাথে বিশাল একটা দূরত্ব হয়ে ছিল, তারপরেও তো তার নিজের একটা ঘর ছিল, সেই ঘরে তার প্রিয় বইগুলো ছিল। তার ঘরে একটা জানালা ছিল সেটা দিয়ে আকাশটা দেখা যেত না সত্যি কিন্তু রাস্তাটা দেখা যেত, মানুষজন হাঁটছে-বাস-গাড়ি-টেম্পো চলছে। তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার কম্পিউটার, সেটাও ছিল একটা জানালার মতো, সেটা দিয়ে সে পুরো পৃথিবীটার দিকে উঁকি দিতে পারত। এখন এই ছোট টিনের ঘরে সে তার মাথা খারাপ নানির সাথে আটকা পড়েছে। তার লেখাপড়া বন্ধ, স্কুল নেই, গ্রামের মানুষেরা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। কেমন করে থাকবে সে এখানে? এর চাইতে তার কি মরে যাওয়া ভালো ছিল না?
রাশা হঠাৎ নিজেকে সামলাতে পারল না, হাউমাউ করে সে কেঁদে দিল। প্রাণপণে সে নিজেকে থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। সে দমকে দমকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
হঠাৎ করে রাশা তার কপালে একটা হাতের স্পর্শ পেল। তার নানি মাথার কাছে এসে বসে তার কপালে হাত রেখেছেন। রাশা শুনল তার নানি ফিসফিস করে বলছেন, “কাদিস না সোনা। কেউ কাঁদলে কী করতে হয় আমি জানি না।”
রাশা ঘুরে অসহায়ের মতো নানির কোলে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমার কী হবে নানি? আমার এখন কী হবে?”
“সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখিস সোনা আমার। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“কেমন করে ঠিক হবে নানি? আমি তো লেখাপড়া করতে চেয়েছিলাম। আমার কী সুন্দর একটা স্কুল ছিল, বন্ধুরা ছিল, স্যার-ম্যাডাম ছিল। এখন আমি এখানে একা একা কী করব? কেমন করে করব?”
“সব ঠিক হয়ে যাবে সোনা।”
রাশা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “হবে না নানি হবে না। আমি জানি। আমি মরে যাব নানি। আমি মরে যাব।”
নানি রাশার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ছিঃ! এভাবে বলে না। আমি তো পাগল মানুষ, এত কিছু বুঝি না। আমি শুধু একটা জিনিস বুঝি। সেটা হচ্ছে বেঁচে থাকতে হয়। মরে গেলে সব শেষ তখন আর কিছু করা যায় না। কিন্তু বেঁচে থাকলে একটা উপায় হয়। তুই দেখিস তোর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”
“তুমি সত্যি বলছ নানি?”
“হ্যাঁ সোনা। আমি সত্যি বলছি।”
