.
নানি বাড়িতে সন্ধে হলো খুব বিচিত্রভাবে। আশেপাশে যা কিছু ছিল সবাই যেন বুঝে গেল, সন্ধে হচ্ছে, তাই বাড়ি ফিরতে হবে। গরু লাইন ধরে তাদের বাড়ি ফিরে এলো। পুকুর থেকে হাঁসগুলো থপ থপ করে উঠে এলো, মোরগ-মুরগিরাও ব্যস্ত হয়ে তাদের ঘরে ঢুকে পড়তে লাগল। আশেপাশের গাছে পাখির কিচিমিচি ডাক একশ গুণ বেড়ে গেল, আকাশে বড় বড় বাদুড় উড়তে লাগল। দূর থেকে উলুধ্বনি শোনা গেল, তারপর আরো দূর থেকে আজান। তারপর আস্তে আস্তে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ইলেকট্রিসিটি নেই, তাই কোনো বাতি জ্বলে উঠল না। নানি একটা হ্যারিকেন আর দুটি কুপি বাতি জ্বালালেন। কুপি বাতির আলোটা একটা জীবন্ত প্রাণীর মতো দপদপ করে জ্বলতে থাকে, রাশা অবাক হয়ে দেখে আগুনের শিখার সাথে সাথে তার বড় একটা ছায়া টিনের দেয়ালে ছটফট করে নড়ছে। এর আগে রাশা মনে হয় কখনোই ঠিক করে অন্ধকার দেখেনি, ঘর কখনো অন্ধকার হলেই টুক করে লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে, সাথে সাথে অন্ধকার ছুটে পালিয়েছে। এই প্রথমবার চারিদিক থেকে অন্ধকার তাকে চেপে ধরছে, কুপি বাতির আলো সেই অন্ধকারকে কোনোভাবেই দূর করতে পারছে না। বরং মনে হচ্ছে এই আলোর কারণে চারপাশে অন্ধকার বুঝি আরো জমাট বেঁধে যাচ্ছে।
রাশা বারান্দায় চুপচাপ বসে রইল। শুনতে পেল আস্তে আস্তে পাখির কিচিমিচি ডাক কমে আসছে, বাতাসে শুধু গাছের পাতার শিরশির এক ধরনের শব্দ। কী অদ্ভুত সেই শব্দ, শুনলেই বুকের ভেতর কেমন যেন ফাঁকা লাগতে থাকে।
হঠাৎ খুব কাছে থেকে ঠিক মানুষের গলায় কে জানি হোয়া হোয়া হোয়া করে শব্দ করে উঠল, রাশা চমকে ওঠে, ভয়ে তার বুক ধক ধক করতে থাকে। লাফিয়ে উঠে সে ঘরের ভেতর ছুটে গেল। কোনার রান্নাঘরে মাটির চুলোতে নানি রান্না করছেন, রাশাকে ছুটে আসতে দেখে বললেন, “কী হয়েছে?”
“ওটা কীসের শব্দ?”
নানি বললেন, “কোনটা?”
“ঐ যে ডাকছে।”
নানি কান পেতে শুনলেন, তারপর ফিক করে হেসে বললেন, “ও মা! তুই কখনো শেয়ালের ডাক শুনিসনি?”
“এটা শেয়ালের ডাক?”
“হ্যাঁ।”
“কী আশ্চর্য, ঠিক মানুষের মতো গলা!”
“কে জানে হয়তো মানুষই ডাকছে। শেয়ালেরা মাঝে মাঝে মানুষের বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায়। নিজের বাচ্চার মতো করে পালে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। আমি যখন ছোট তখন এই গ্রামে শেয়ালের খুব উৎপাত। সবাই মিলে তখন শেয়ালের গর্তে ধোয়া দিয়ে শেয়ালগুলোকে বের করে পিটিয়ে পিটিয়ে মারল! মরা শেয়ালগুলো যখন ফেলে দিচ্ছিল তখন দেখে একটা শেয়াল অন্যরকম, লেজ নাই, গায়ে লোম নাই। ভালো করে তাকিয়ে দেখে মানুষের বাচ্চা!”
রাশা একটু শিউরে উঠে বলল, “ইশ!”
“গাঁও-গেরায়ে যখন বাচ্চা হয় তখন খুব সাবধানে থাকতে হয়।”
নানি আবার চুলোতে কিছু শুকনো পাতা গুঁজে দিয়ে আগুনটা আরেকটু বাড়িয়ে নিলেন। চুলোর কাছে এত গরমে নানি রান্না করছেন তার কোনো কষ্ট হচ্ছে বলে মনে হয় না। রাশা কিছুক্ষণ রান্নাঘরে নানিকে রান্না করতে দেখে, তারপর আবার বের হয়ে এসে বারান্দায় বসল।
বাইরে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর অন্ধকারে চোখ একটু সয়ে আসার পর সবকিছু আবছা আবছাভাবে দেখা যেতে থাকে। রাশা আকাশের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেল, সারা আকাশে লক্ষ লক্ষ তারা ঝকঝক করছে। সে কোনোদিন টের পায়নি যে আকাশে এতে তারা আছে, সত্যি কথা বলতে কী, সে আগে কখনো আকাশের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখেনি। আকাশে যখন তারাগুলো জ্বলজ্বল করতে থাকে তখন সেটা যে এত সুন্দর হতে পারে সে কল্পনাও করেনি। ঠিক তখন সে দেখল একটা তারা আকাশ থেকে খসে পড়ল। কী আশ্চর্য! সে বইয়ে পড়েছে রাতের আকাশে যখন উল্কা ছুটে যায় তখন সেটা জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যায়। সে এই প্রথমবার একটা উল্কাকে এভাবে ছুটে যেতে দেখল। রাশা অনেকটা সম্মোহিতের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
.
রাতের খাবারের আয়োজন হলো খুব সাদামাটা। ঘরের মেঝেতে একটা পাটি বিছানো হলো, সামনে রান্নার ডেকচি আর থালা। নানি একটা পিড়িতে পা ছড়িয়ে বসলেন, প্লেটটা নিলেন নিজের কোলে। রাশার প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে বললেন, “তোর মনে হয় এখানে খাবার কষ্টে হবে। আমি একা মানুষ, এতদিন ঘাস-লতাপাতা খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। তুই তো পীরবি না।”
রাশা বলল, “তুমি যদি ঘাস-লতাপাতা খেতে পারো, আমিও পারব।” নানি মাথা নাড়লেন, বললেন, “না। তোদের বাড়ন্ত শরীর। ভালো করে খেতে হবে।”
নানি রাশার প্লেটে খাবার তুলে দিতে লাগলেন। ভাত, সবজি, মুরগির মাংস। রাশার কেমন জানি রাক্ষসের মতো খিদে পেয়েছিল, সে বুভুক্ষের মতো খেল। খাবারে ঝাল একটু বেশি কিন্তু খুব চমৎকার রান্না, বাসায় ফ্রিজের বাসি খাবার গরম করে খাওয়া থেকে একবারে অন্যরকম। সবকিছুতে কেমন যেন একটা তাজা তাজা ঘ্রাণ।
রাশা বলল, “নানি তুমি খুব সুন্দর রান্না করতে পারে!”
নানি হাসলেন, বললেন, “একসময় পারতাম। এখন অভ্যাস চলে গেছে। নিজের জন্য নিজে রান্না করা যায় না। রান্না করে সবসময় কাউকে খাওয়াতে হয়। তোর নানা খুব ভালো খেতে পছন্দ করত।”
হঠাৎ করে নানি কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। কোলের মাঝে প্লেটটা রেখে চুপচাপ বসে রইলেন। চোখের দৃষ্টিটা কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হয় কিছুই দেখছেন না। রাশা কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল, নানিকে দেখে তার কেমন যেন ভয় ভয় করতে থাকে।
