হয়। সাচাই। চরনকাশির সেখের বেটার খেতে বাঙালরা কয়–বিশ আটিতে আটি নিবো। আমি কই-বাইশ আটিতে আটি। মুঙ্লাক নিলাম সাথে। ধান তো কাটবের বসলাম। বাঙাল তিন আটি কাটে তো আমরা কাটি দুই। মুঙ্লাক কলাম-মুঙ্লা রে, হার। খুব হার খালাম। মুঙ্লা কয়কত্স কী? মুঙ্লা যে বসে বসে লাফায়ক কচাক। চায়ে দেখি বাঙাল কাটে তিন, মুঙ্লা কাটে তিন। কী যে হলো। কলাম-নিশ্বাস ছাড়া লাগে ছাড়বো। আঙুল নামে যায় যাক্। চোখে দেখি ধানের গোছ। চায়ে দেখি মুঙ্লা কাটে সোয়া তিন, বাঙালে তিন। কই-মুঙ্লা, ধরলাম তোক। সে কয়–আগগে শালা। কই-মুঙ্লা রে, শালা কয়ো না, ভাই, এই সাড়ে তিন নামালাম। সে কয়-মিতে, এই ল্যাও সাড়ে তিন। চায়ে দেখি, কনে বাঙাল? আলেফ সেখ আলে দাঁড়ায়ে দাড়ি ভাসায়ে গদগদায়ে হাসে আর কয়-সাবাসি বেটা, সাবাসি।
ছিদাম যেন কোন স্বপ্নলোকে চলে গিয়েছিলো। গল্প বলতে বসে উত্তেজিত হয়ে সে ধান কাটার ভঙ্গি নিয়েছে। ধান কাটার কাজে বিশেষজ্ঞ বাঙালদের সে পরাজিত করেছে।
একদিন বিকেলের দিকে ছিদামকে তার রামশিঙাটা বার করে সাফসুতরো করতে দেখে পদ্ম বিস্মিত হয়ে কারণটা জিজ্ঞাসা করলো।
ছিদাম বললো, আজ চৈতন্যকাকার বাড়ি কীর্তন গান হবি।
চৈতন্যকাকা?
ছিদাম হাসিমুখে বললো, সে কালের চিতিসাপ। কইছে তার বাড়ি একদিন কীর্তন গাওয়া লাগবি। মুঙ্লাক কইছে, সেও রাজী। চৈতন্যকাকা সকলেক কবি।
পদ্ম ইতিউতি করে বললো, তাক কাকা কও, সে কি তোমাগের দেনা-দায়িক সব ছাড়ে দিলো?
ছিদাম তার নবলব্ধ শক্তির পরিচয় পেয়ে নির্ভীক। পৃথিবীর সকলকে এমনকী শত্রুকেও সে এখন নিজের ঘরে ডাকতে পারে।
সে বেরিয়ে গেলে পদ্ম বললো, যেন ফাটে পড়বি।
তা ভালোই যদি চৈতন্য সার সঙ্গে মিলমিশ হয়। বললো কেষ্টদাস।
হয় হবি। আমি কৈল তাকে কোনোকালে ভালো চোখে দেখবো না। আখেরে জিতলো সে-ই, তার সুদের সুদ আর শোধ হবি নে। পদ্ম কতকটা বিরস মুখে বললো।
কিন্তু রামচন্দ্রও এ ব্যাপারে পদ্মর সঙ্গে একমত হলো না। বরং তার মতামত শুনে মনে হলো, ছিদামের মতের গোড়ার কথা তার মত থেকেই সংগ্রহ করা।
পদ্ম কিছুটা নালিশের ঢঙে কথাটা একদিন উত্থাপন করতেই রামচন্দ্র বললো, তার বাড়িতে কীর্তন হবি, তাতে দোষ কী?
তার চায়ে তার নামে গান বাঁধা ভালো, শাসনে থাকে।
সে তো মাপ চাইছে। রামচন্দ্র বললো।
কিন্তুক সুদ ছাড়ে নাই।
সুদ ছাড়বি? এ কি খয়রাতি? তা নিবো কেন্? পরম বিস্ময়ে রামচন্দ্র প্রশ্ন করলো।
যে জমি সে ছাড়ে দিছে তা আবার পাকে পাকে তুলে নিবে।
কে, তা হয় কেন? তার সুদ-আসল পরিশোধ করবো যদি!
ফসল তো উনা হবের পারে।
ভগোমানে তা পারে, নাইলে খেতে দু’না চাষে উনা ফসল হয় কেন?
এবার পদ্মকে থামতে হলো। রামচন্দ্র ছিদাম নয়। তার পরিমিত ভাষার প্রকাশভঙ্গিতে কথাগুলি পুরাকাল থেকে বারংবার প্রমাণিত হওয়া সত্য বলে বোধ হচ্ছে। অনেক খরায় পিঠ পুড়েছে, অনেক বর্ষায় শ্যাওলা পড়েছে এমন একজন চাষী যখন কথা বলে তখন সশ্রদ্ধ হয়ে শুনতে হয়।
তথাপি সে বললো, মানুষের বেরামপীড়া আছে। সকলে সমান খাটবের পারে না।
তা হয়।
তাইলে?
জোয়ার-ভাটা হবি, দোলনার মতো উঠবি-পড়বি।
লোক তো ফৌত হবেরও পারে।
কন্যে, চৈতন সা-ও চিরকালের পরমাই নিয়ে আসে নাই। রামচন্দ্র খানিকটা হেসে নিয়ে বললো।
রামচন্দ্র চলে যাওয়ার পর কেষ্টদাস তার বিস্ময় বোধটাকে পুরোপুরি অনুভব করতে পারলো। শুধু যে ধান এসেছে তাই নয়, সমগ্র চাষীসমাজের কর্তব্য-অকর্তব্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তারই ঘরে।
রাত্রিতে পদ্ম উনুন জ্বালে না। তার হাতে এখন খানিকটা অবসর, কিন্তু তার এই অবসরের মধ্যেও ছিদাম হাত পেতে আছে। পদ্ম লাটাই নিয়ে সুতলি পাকাতে বসলো। ধান ঘরে উঠেছে তবু ছিদামের বিশ্রাম নেই। ভোর রাতে উঠে এখনো সে কাজে বেরিয়ে পড়ে। মুঙ্লার এক প্রতিবেশীর ঘরে কাজ হচ্ছে, মুঙ্লা আর ছিদাম তাই নিয়ে ব্যস্ত। তার কাজ শেষ হলে ছিদামের বাড়িতে কাজ শুরু হবে। কখন এসে ছিদাম সুতলি চেয়ে বসে তার স্থিরতা নেই।
সুতলি পাকাতে পাকাতে পদ্ম রামচন্দ্রর কথাও ভাবলো। নিজে সে রামচন্দ্র নয়, ছিদাম পর্যন্ত নয়। মেরুদণ্ড ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে তবু সংহত শক্তির প্রতীক হতে পারবে এমন গঠন ভগবান তাকে দেননি, এই যেন অনুভব করতে লাগলো পদ্ম। নিজের যা নেই তারই আধার চোখের সম্মুখে দেখতে পেয়ে পদ্ম আবার একটা দুর্নিবার আকর্ষণ বোধ করতে লাগলো।
তখন তার মনে পড়লো রামচন্দ্রর বাঁ দিকের চোয়ালের উপরে একটা বড়ো তিল আছে। রাতের বেলায় হারিকেনের আলোতেও সেটা চোখে পড়ে। অমন গোঁফের উপরে অমন একটা তিল না থাকলে পুরুষ কখনো এত আকর্ষণীয় হয় না।
.
চৈতন্য সাহার বাড়িতে কীর্তনের আসরে কথায় কথায় একটা মহোৎসবের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মহোসবের স্থান সম্বন্ধে এই স্থির হয়েছে যে সান্যালমশাই যদি রাজী হন তবে তাঁর বাগানের মধ্যেই হবে। কর্মকর্তাদের মধ্যে কেষ্টদাস আছে, শুধু তাই নয়, এ বিষয়ে তার একটা অগ্রাধিকার লোকে পুনরাবিষ্কার করেছে।
সান্যালমশাই প্রস্তাবটায় হাসিমুখে রাজী হলেন। রামচন্দ্র, কেষ্টদাস, চৈতন্য সাহা এবং গ্রামের আরও কয়েকজন মাতব্বর-স্থানীয় ব্যক্তি গিয়েছিলো প্রস্তাবটা করতে।
