কিন্তু সংসারটাকে দাঁড় করানোর অবস্থায় যদি এনে থাকে তবে সেটা করেছে ওঁরাই। এমন অমানুষিক পরিশ্রম করতে হাজারে একজন পারে না। আর তাছাড়া, যদি ওর মা বেঁচে থাকতো তবে সেও ছেলের আহার্য নিয়ে নিশ্চয়ই এমনি করেই মাঠে যেতো৷ ‘গুরু! গুরু! বলে মনকে সংহত করার চেষ্টা করতে করতে কেষ্টদাস শুয়ে পড়লো।
পাঁচ-ছ দিন পরে কেষ্টদাস দিবানিদ্রার আয়োজন করে নিচ্ছে এমন সময়ে পদ্ম এলো তার কাছে।
কী কও পদ্মমণি?
উত্তরদিকের জঙ্গলের ভিটাগুলি কার?
মোহান্তদের মধ্যম গোঁসাইয়ের।
হাতের মাপে এক বিঘা চৌরাস জমি। ওই ভিটায় আমার ঘর তুলে দেও না কেন, আমি থাকি।
এ-ঘরে কি কুলান হয় না, ও-ঘরে কাকে নিয়ে থাকবা, পদ্মমণি?
কেন, মধ্যম গোঁসাইয়ের সমাধি নাই?
তা নাই। গোঁসাই বৃন্দাবনে অভাব হইছিলেন অনেককাল আগে।
তবে তো আরও ভালো। ভিটায় বাগান করবো, শাকপাতা লাগাবো।
পদ্ম চলে গেলো। তার পরনের হলদে ডুরে শাড়িটা জীর্ণ হয়েছে। কেষ্টদাসের মনে হলো, পদ্মর মতো রুচি নিয়ে চলতে গেলে নতুন শাড়ি আবার কিনতে হবে, পরিশ্রম না করেও উপায় নেই।
কেষ্টদাস কিছুকাল ব্যর্থ চেষ্টা করলো দিবানিদ্রার, তারপর উঠে পদ্মকে খুঁজে বার করলো। রান্নাঘরের আড়ালে একটা গাছতলায় বসে কাঠের লাটাইয়ে পাক দিয়ে পাটের সুতলি পাকাচ্ছিলো সে।
কেষ্টদাস বললো, কাজ করো? দিনরাতই কাজ করো!
পদ্ম লাটাই নামিয়ে রেখে বললো, খাওয়ার জল দিবো, গোঁসাই?
না, এমনি আলাম তোমার খোঁজে। দৃঢ়যৌবনা পদ্ম, আর রোগজীর্ণ কেষ্টদাস।
কেষ্টদাস বললো, তোমাদের কাজে আমাকে ডাকলিও পারো।
ভারি কাজ!
মিয়ে ছাওয়াল হয়ে তুমি এবার ক্ষেত নিড়াইছো।
না নিয়ে উপায় কী! পরের বলদ আনে চাষ দিছিলো জমিতে, বলদের ভাড়ার বদলা ছিদাম যায় তার ক্ষেতে কাম করবের।
নিড়ানি তুমি শিখলে কনে তাই ভাবি।
বাপের আহ্লাদি মিয়ে, বাপের কোলে থাকতাম। চাষের কামে বাপের হাত চলা দেখছি।
কেষ্টদাস একটি অত্যন্ত আদরিণী মেয়ের পরিণতির কথা চিন্তা করলো। তারপর বললো, তুমি কাজ করো, বৈষ্ণবী, আমি তোমার পান সাজে আনি।
কেষ্টদাস পান সেজে নিয়ে এলো।
পান নিয়ে পদ্ম বললো, তাহলে ধরো, দড়ি পাকায়ে নি।
পদ্ম সুতলির একটা মুখ কেষ্টদাসের হাতে দিয়ে দড়ি পাকানোর জোগাড় করে নিলো।
কেষ্টদাস বললো, এত দড়ির কী কাম?
মিয়েমানুষের দড়ি-কলসি ছাড়া আর কী সম্বল কও?
কেষ্টদাস হাসতে পারতো কিন্তু পদ্মর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, এটা রসিকতা, কিন্তু এমন যার ঘরনী হওয়ার যোগ্যতা তার সত্যিকারের ঘর বাঁধা হলো না। তার মনে দড়ি কলসির কথা জাগলে অযৌক্তিক হয় না।
কিন্তু পদ্ম তখন-তখনই বললো, কী দ্যাখো, পানে ঠোঁট লাল হইছে?
এর উপরে কি অভিমান করা যায়?
আর ছিদামের কথা? সারা গায়ে তার নিন্দা নেই, প্রশংসা আছে। কয়েকদিন আগে তার বাড়িতে বসেই রামচন্দ্র তার প্রশংসা করে গেছে।
কেষ্টদাস মহাভারত নিয়ে পড়তে বসেছিলো। অভ্যাসের ফলে তার পড়াটা আগেকার তুলনায় অনেক স্পষ্ট হয়েছে। এমন সময়ে ছিদাম এলো। তার গায়ে তখনো মাঠের ঘাস লেগে আছে, কোথাও কোথাও মাটি।
কিছুক্ষণ দ্বিধায় কাটিয়ে অবশেষে সে বললো, জেঠা, একটা কথা কবো?
কও, কও না কে। রামচন্দ্র বললো।
বুধেডাঙায় সান্দারদের ইস্তফার জমি আছে।
তা আছে।
এক পাখি পাওয়া যায় না?
টাকা হলি যায়।
কয়ে বলে পত্তনি–নজর পরে দিলি হয় না?
তা কি ছাড়ে জমিদার; বরগা চায়ে নেও না কেন্? রামচন্দ্র হাসিমুখে বলেছিল।
হাল বলদ মানুষ নাই।
রামচন্দ্র হেসে বললো, তবে পত্তনি নিয়ে বা কী হয়?
এই পরিবেশে রামচন্দ্র কেষ্টদাসকে বলেছিলো, ছাওয়াল আপনের ভালো, গোঁসাই।
কী কলেন?
কই যে, জোরদার ছাওয়াল। এমন গাছ লাগায়ে সুখ। খুব খাটে।
তা তো খাটাই লাগে। কে, আপনার মনে নাই নবনে খুড়ো ক’তো-পুরুষের ঘাম জমির বুকে না পড়লি ফসলবতী হয় না জমি।
হ্যাঁ, এমন একটা ছড়া তার ছিলো।
কিন্তুক আপনার মতো কোনকালে হবি? এক চাষে জঙ্গল-জমি তিন ফসল দেয়, সে আর আপনে ছাড়া কার খ্যামতা?
আউস উঠেছে। এ অঞ্চলে আউসের জমি কম, চাষও ভালো হয়নি। শুধু বর্ষাটা অকরুণ ছিলোনা বলেই কিছু ধান পাওয়া যাবে। কিন্তু সে ধানের অধিকাংশ চৈতন্য সাহাদের।তবুদীর্ঘদিন রোগভোগের পর একটা উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা যেন, হোক না তা লাঠি ধরে ধরে।
এ বাড়িতে ছিদাম বলে যে আর একটি প্রাণী আছে, এটা কিছুদিন যাবৎ ঠাহর হতো না। একদিন সকালে কেষ্টদাস লক্ষ্য করলো, মুঙ্লা একটা গোরুগাড়ি চালিয়ে নিয়ে আসছে পিছনে ছিদাম।
কিরে?
ধান।
ধান?
হয়।
সব জমির?
জমির, মজুরির।
কিন্তুক খ্যাড়সমেত কেন?
ও তো আমার; ফেলায়ে কী হবি?
গোরু কই? আচ্ছা জারুক কবো যদি সে একটা বকনা বাছুর দেয়।
তা দেয় ভালোই। এখন তো ঘর ছায়ে নিই।
তখন কথা বলার সময় নয়। গাড়ি নামিয়ে ছিদাম ও মুঙ্লা ধান নামাতে শুরু করলো। ধানের আটিগুলি নামানোর সময়ে তারা যেন সেগুলিকে আলিঙ্গন করছে।
.
অনেকদিন পরে পাশাপাশি আহারে বসেছিলো কেষ্টদাস ও ছিদাম। পদ্ম পরিবেশন করছে। আজ অন্তত ছিদামের ছুটি।
খেতে খেতে এ কথা-সে কথা বলতে বলতে সে বললো, আর-এক কথা, এবার বাঙালেক শিখায়ে দিছি ধান কাটা কাকে কয়।
কও কি? কেষ্টদাস বিস্ময় প্রকাশ করলো।
