ব্যবস্থাটা হবে সমবায় পদ্ধতিতে। যার যে রকম সংগতি তার উপরে তেমন আয়োজনের ভার দেওয়া হয়েছে। সংগতি সম্বন্ধে কৌতুকের ব্যাপার দেখা যাচ্ছে এই যে, রামকে যদি বলা যায় পাঁচ সের চাল দেবে তুমি, সে বলছে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সাড়ে সাত সের নিয়ো। সান্যালমশাইকে তেল চিনি ঘি মশলা প্রভৃতি দামী জিনিসের ভার দেওয়া হয়েছে। চাষীরা নিয়েছে চালের ভার। গ্রামের ভদ্রব্যক্তিরা ডাল আনাজ প্রভৃতির জোগাড় রাখবে। চৈতন্য সাহা ভার নিয়েছে টাকাপয়সার। এটা নিয়ে একটু হাসাহাসি হয়েছিলো।
চৈতন্য সাহা এতক্ষণ দায়িত্ব বণ্টনের কথাবার্তায় উৎসাহের সঙ্গে যোগ দিচ্ছিলো; এমনকী, দায়িত্বের অবহেলা করা কারো উচিত হবে না এমন উপদেশও মাঝে মাঝে দিচ্ছিলো। নিজের দায়িত্বের কথা শুনে সে লাফিয়ে উঠলো তড়াক করে : ‘অন্যাই, অন্যাই। লেখাজোখানাই এমন দায়িত্বের নিবের পারি না।
বেশ তো, লেখাজোখা থাক। পাঁচশ এক টাকা বরাত থাকলো। নায়েবমশাই এসব ব্যাপারে মধ্যস্থ, সে-ই বললো।
কী কন, এক-পঞ্চাশ? আমাকে ঘানিত ফেলে মোচড়ালিও একপঞ্চাশ বার হবি নে। নায়েবের চারিদিকে যারা সভা করে বসেছিলো তাদের দু-একজন বললো, এক-পঞ্চাশ না সাজিমশাই, পাঁচ-শয় এক।
বুঝছি, আপনেরা আমাকে পেড়ন করবের চান। এক-পঞ্চাশ যখন ধরছেন তাই দিবোনা দিয়ে উপায় কী?
তা তো কথা নয়। এসব ব্যাপারে নগদ টাকার দরকার হয়। কীর্তনীয়াদের বিদায় আছে। দীন-দুঃখীদেরও কিছু কিছু দিতে হবে। আপনি যে কানে কম শোনার ভান করছেন তাতে কিছু কাজ হবে না। বললো নায়েবমশাই।
চৈতন্য সাহাকীকরতো বলা যায় না। ছিদাম ভিড়ের মধ্যে থেকে উঠেদাঁড়ালো। এই সভায় চৈতন্য সাহাকে সে-ই বাড়ি থেকে ডেকে এনেছে এবং অহেতুক যোগাযোগের মতো কীর্তনের দিনে চৈতন্যর বাড়িতে ফেলে-আসা রামশিঙাটাও সে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। ছিদাম উঠে দাঁড়াতেই চৈতন্য তেড়ে উঠলো, বোসো, বোসো, তুমি আবার ওঠো কেন। তোমার আধখানও তো আছে । দেখি।
মুঙ্লা শ্বশুরের সম্মুখে জড়োসড়ো হয়েছিলো, সে আরও লজ্জিত হয়ে মুখ নামালো। চৈতন্য বললো, গাঁ কি? না, চিকন্দি। ভাই বন্ধুসকল, দিঘায় সেইবার মোচ্ছব হইছিলো। যদি তোমাদের মচ্ছোব তার চায়ে কমা হয় এক পয়সাও পাবা না। এ যেন অন্য কোনো চৈতন্য। কথাটা বলবার আগে চৈতন্য হাসলো এবং বলতে বলতেও হাসিমুখে চারিদিকে চাইলো।
আর যদি না হয়?
হাজারে এক ধাইযো থাকলো।
মচ্ছোব খেতে বসে হুংকার দেওয়ার প্রথা আছে। তেমনি হুংকার দিয়ে কেষ্টদাস বললো, ট্যাকা কার?
অনেকে প্রত্যুত্তরের ভঙ্গিতে বললো, চৈতন সা-র।
ছিদাম-মুঙ্লারা এখনও চাষী বলে পরিগণিত হয়নি। চাল জোগান দেওয়ার দুশ্চিন্তা তাদের নেই। কেষ্টদাস আর রামচন্দ্রর দেয় চাল তৈরি হচ্ছে রামচন্দ্রর বাড়িতে। পদ্ম সেখানে কেষ্টদাসের চালের ভাণ্ডারি। ছিদাম আর মুঙুলা একটা কাজ বেছে নিলো। আরও চার-পাঁচজন সমবয়সীকে দলে ভিড়িয়ে নিয়ে গ্রামের প্রাচীনতম তিনটি আমগাছকে তারা আক্রমণ করেছে। মহোৎসবের দিন পনেরো আগে লকড়ির কথা উঠতেই ছিদাম জবাব দিলো, পোস্তুত।
সান্যালমশাইয়ের বাগিচার বড়ো বড়ো আমগাছগুলির তলা থেকে আগাছার জঙ্গল কেটে ফেলা হয়েছে। তার কোনো কোনোটির তলায় কাপড় ও খড় দিয়ে দূরাগতদের জন্য আস্তানা করা হয়েছে।
বাগিচার একপ্রান্তে কীর্তনের আসর বসেছে একটি সামিয়ানার তলায়। সামিয়ানার খুঁটিগুলিতে কৃষ্ণলীলা বিষয়ক কয়েক রকমের ছবি লটকানো। সামিয়ানার তলায় অষ্টপ্রহর নামকীর্তন চলছে। গিতা গিজাং করে খোল বাজছে। বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে কীর্তন করে চলেছে দলের পর দল। কীর্তনের এক-একটি পর্যায়ের শেষের দিকে এসে উদ্দাম নাচে পৃথিবী যেন টলতে থাকে।
বাগিচার শেষ সীমান্তে অন্দরের পুষ্করিণীর পারে এসে মহোৎসবের রান্নার জোগাড় হয়েছে। সারি সারি দশ-পনেরোটা উনুনে গ্রামের সবগুলি বড়ো ডেগ এনে বসানো হয়েছে। হাঁড়ি হাঁড়ি ডাল ঢেলে রাখা হচ্ছে যেগুলিতে সেগুলি বোধ হয় সান্যালবাড়ির জলের ট্যাঙ্ক। ভাত রাখা হচ্ছে নতুন চাটাইয়ের উপরে নতুন কাপড় পেতে, সামিয়ানার নিচে ভাতের পাহাড়। চাটাই দিয়ে একটা জায়গা ঘেরা হয়েছে, তার আড়াল থেকেও মানুষের গলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, ধোঁয়া উঠছে, রান্নার তেলের কলকল শব্দ আসছে। সেখানে নায়েবগিন্নীর তত্ত্বাবধানে তরকারি, ভাজা ও মালপোয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে যে, সান্যালমশাই শেষ পর্যন্ত বলেছেন–রোগী ও শিশুর দুধ রেখে আশপাশের দশ গায়ে যত দুধ, সবদুধই আসবেমহোৎসবে, দিঘায় বা সদরে যাবে না। দামের জন্য চিন্তা নেই। অপেক্ষাকৃত কমবয়সীরা বলাবলি করছে–সকলেই পায়েস পাবে, কেউ বাদ যাবে না।
কথা ছিলো, দুপুর হতে হতেই আহারপর্ব শুরু হবে কিন্তু বিলের পার থেকে যাদের আসার কথা তারা এসে পৌঁছয়নি, পদ্মপাতাও আসেনি। অবশেষে তারা এলো। গোরুগাড়িতে বোঝাই হয়ে আসছে পদ্মপাতা, আর তার আগে আগে বিলের দল আসছে কীর্তন করতে করতে। হৈ হৈ পড়ে গেলো। কথা ছিলো, একবারে একশ জন করে বসবে। কিন্তু গাড়ি থেকে পদ্মপাতা তুলে নিয়ে পুকুরের জলে চুবিয়ে বাগিচার একটা চওড়া রাস্তার দুপাশে এক বালখিল্যের দল আসন পেতে বসলো। সেই দলকে যে থামাতে গিয়েছিলো, পদ্মপাতা থেকে ঝরা জলে পিছল মাটিতে সে গড়াগড়ি দিয়ে উঠলো, কিন্তু বালখিল্যের দলকে রোধ করতে পারলো না। তখন ছিদাম আর মুঙ্লার দল হুংকার দিতে দিতে বালতি-হাতে পরিবেশন করতে এগিয়ে এলো।
