সুমিতি হেসে বললো, ননদিনী, এ তোমার ভাইবউয়ের দোষ ঢাকবার চেষ্টা। সৎ চিন্তা নয়।
তা কেন হবে? এককালে যদি অঙ্ক করে থাকো চিরকালই কি অঙ্কই করতে হবে, কাব পড়া বারণ? কিংবা পৃথিবীর আধখানা ভাঙাগড়া তো মেয়েদের শরীরে, তাদের জীবনে। বিপ্লবী যদি আবার মানুষও হয়, বসতে হয় না তাকে সেই দুখানা পায়ের কাছে?
মনসা চা শেষ করে বললো, চলো বউদি, রবিবারে। তুমি কি তোমার বাড়িটাকে চিনেছো এতদিনেও? একটা উপবন আছে তোমার তা কি দেখেছো?
সুমিতি বুঝলো মনসা কোথাও যেতে চায়। কিন্তু সে দ্বিধা করতে থাকলো। তখন মনসা উঠে আলনার কাছে গেলো। সুমিতির জন্য শাড়ি বাছাই করতে গিয়ে আলনায় একেবারে নতুন। একটাকে দেখে সে বললো–বাহ্, এই তো দেখছি সিল্কের খদ্দর। তা হলে রূপুর সমস্যা মিটেছে। গতবারে বলছিলো শুনেছিলাম, বউদি খদ্দরে অভ্যস্ত, কী যে হবে? এটাই পরো না হয়। আমি বাগিচাকে নির্জন করে আসি।
মনসা ফিরে এলে তারা খিড়কি দরজা দিয়ে বাগিচার পথে বেরিয়ে পড়লো।
অনেক জায়গা পেলে যে রকম হতে পারে বাগানটা আয়তনে তেমনি। দেশী নানা সুস্বাদ ফলের গাছ তো বটেই বিদেশী ক্ষণপ্রসবী গাছও সেখানে সে অবস্থায় থাকা স্বাভাবিক। তারা ফুলের কেয়ারিগুলোকে পার হয়ে ফলের গাছগুলোর মধ্যেকার বীথিগুলো দিয়ে চলতে থাকলে মনসা, এটা তোমার হিমসাগরের লাইন, এটা তোমার ক্ষীরসাপাতির–এমন পরিচয় করে দিতে লাগলো।
সুমিতি একবার জিজ্ঞাসা করলো, এত কি তোমাদের খেতে লাগে? এ তো বেশ একটা ক্যানিং ইনডাস্ট্রির জোগাড়।
মনসা বললো, রাম কহ, তোমরা আবার ইনডাস্ট্রিতে কবে গেলে?
সুমিতি বললো, তা কেন, গ্রামে তো আরও মানুষ আছে। গ্রামের অন্যত্রও এরকম গাছ হতে পারে।
ছায়ায়, আলোয়, ছায়াতে আলোর জালিকাটা পথে তারা ঘুরতে থাকলো। হিমসাগর,ন্যাংড়া এসব নামের সঙ্গে পরিচয় থাকায় শহরের মেয়ে সুমিতির সে সব সুস্বাদের উৎস সম্বন্ধে এই প্রথম কৌতূহল আর তার নিবৃত্তি হচ্ছিলো। তার একবার সেসবের জন্য আমাদের এসব’ এরকম মমতা বোধ হলো। কিন্তু মনসা বললো, মাস্টারমশাইয়ের কথা কি দাদার কাছে শোননি? তিনি তোমাকে ইনডাস্ট্রির কথা বলতে পারবেন হয়তো।
সুমিতি হাসতে হাসতে বললো, তিনি হয়তো বলবেন কেন ইনডাস্ট্রি হয় না, তার অবশ্য বিজ্ঞানসম্মত কারণ আছে, কিন্তু এখন আমার তা মাথায় আসছে না।
মনসা বললো, বিউটিফুল। প্যাঁচটা ঠিক ধরেছো। হয়তো আসল কথা, বাজার কোথায়?
চলতে চলতে সুমিতি বললো, অথচ, রূপুর মতো ছোটো ছেলেটি যদি এই সিল্কের খদ্দর জোগাড় করে থাকে, প্রমাণ করা করা যায় এখানকার মানুষেরা ইনডাস্ট্রির পক্ষে অনুপযুক্ত নয়।
মনসা বললো, হয়তো চাপড়ির সেই তাঁতীর বোনা। হয়তো রূপুর পরামর্শে এই সুতোটা সে মুর্শিদাবাদে জোগাড় করেছে। হয়তো সে তাঁতী মাস্টারমশাইয়ের ছাত্র। সে কিন্তু অন্য সময়ে চালানি একশ’ বিশ কাউন্টের সুতোয় ধুতি শাড়ি বুনে থাকে। তোমার ক্লান্তি বোধ হচ্ছে না তো? তুমি কি গ্রামের মেয়েদের দিয়ে সিল্কের সুতো কাটানোর কথা ভাবছো?
চলতে চলতে সুমিতির মনে পড়লো সদানন্দ আর তার স্কুলের কথা। ইতিমধ্যে কবে যেন কে যেন সেই ছোট্ট স্কুলটার কথা বলছিলো।কী শেখানো হয় সেখানে?কারা ছাত্রছাত্রী সেখানে? যে বলছিলো সেই স্কুলের কথা তার মতে দুর্ভিক্ষে ছাত্ররা পালিয়েছে। হয়তো তা সত্য নয়।
হয়তো সেই ঘটনার পরে সদানন্দর মন অন্যদিকে সরেছে।
সুমিতি ভাবলো, আজ সদানন্দকে কি খানিকটা বেশি চিনতে পেরেছে সে? সদানন্দর অত্যন্ত লম্বা ঝুলের সিল্কের পাঞ্জাবি, মাথাভরা টাক ও মুখভরা হাসির সঙ্গে ফ্রায়ার টাকের ছবির মিল থেকে সেই নামটা মনে পড়েছিলো। ফ্রায়ারের ভোগে আসক্তি ছিলোনা বলা যায় না। অন্যদিকে সে এক ধরনের বিদ্রোহী ছিলো বটে। তখনকার সমাজ ও রাষ্ট্রকে সে ঘৃণা করতো বলেই সে বনবাস বেছে নিয়েছিলো।
সদানন্দর মস্তিষ্ক যখন সামন্ততান্ত্রিক জীবনধারার বিরুদ্ধে যুক্তি দিতে থাকে, তখন তার মস্তিষ্কের অন্য অংশ যেন এই পলাতক জীবন, যা সামন্ততন্ত্র-আশ্রিত, তাকে বেছে নেয়। এ কি অন্তর্ঘাত? অথবা এ কি ঘুণপোকার স্বভাব? ও, না না, সে নিজের চিন্তায় হেসে ফেলো। ইনটেলেকচুয়াল বলতে এরকমই হয়। নতুবা বলতে হয় কোনো দুজন মানুষের চরিত্র এক নয়।
মনসা বললো, কথা বলছে না, ভাবছ বুঝি খুব?
সুমিতি বললো, না, ননদিনী, বিপ্লবীদের একজোড়া পায়ের কাছে বসার কথা ভাবছিলাম।
মনসা হেসে বললো, তুমি কি কারো বিদগ্ধা প্যারিসিনীকে ত্যাগ করে নিরক্ষরা তাকায়া মাওরিনীর পায়ের কাছে বসার কথা শোননি?
সুমিতি ভাবলো: গগ্যাঁর সেটা একরকমের বিপ্লব বটে। কিন্তু তারা তখন খিড়কির পুকুরের দিকে চলে আসছিলো। পথের পাশে একটা ছাদহীন লতায় ঢাকা একটা উঁচু দেয়াল দেখে সে জিজ্ঞাসা করলো, হটহাউস নাকি, ভাই? নাকি মেয়েদের পোশাক পরার জন্য?
মনসা বললো, না গো, অত দূরে তাহলে সে অসুবিধার বন্দোবস্ত এখানে মানা হতো না। ওটা প্রকৃতপক্ষে টেনিসের স্ক্রিন যা লতায় ঢেকেছে।
বেড়ানো উদ্দেশ্য বটে, ক্লান্ত হওয়া পর্যন্ত নয়। তারা পুকুরের পার ধরে খিড়কির ঘাটের দিকে বরং চললো।
মনসা বললো, আচ্ছা, বউদি, একটা কথা বলবো ভাবি। খুব কৌতূহল আমার। তোমার আধুনিকতার সাহসকে আর ভালোবাসার ক্ষমতাকে আমি অবাক হয়ে দেখি। এটা বেশ ভালোই যে তুমি যেন বলছে আমি যেমন তাই থাকব, ভালোবাসতে এসেছি, আমাকে নেবে কিনা, তা তোমাদের দেখার। বোঝাই যাচ্ছে এই গ্রাম্য আভিজাত্যের প্রাচীনতাকে তুমি যাচাই করছে। হয়তো দেখছো সেই প্রাচীনতা আর আভিজাত্য এত গভীর, যেন আকাশপট, যা তোমার আধুনিকতার আলোকে অনায়াসে ধারণ করে। এদিক দিয়ে কিন্তু তুমি আর জেঠিমা একই জাতের।
