সুকৃতির তৈলচিত্রে রোদ এসে পড়েছে। দেয়ালের যে জায়গাটায় টাঙানো হয়েছে ছবিটা সেখানে সকালে ঘন্টাখানেক রোদ পড়ে। মনসা লক্ষ্য করে বলেছিলো, নষ্ট হয়ে যাবে না তো, বউদি?
বলা কঠিন। এ যদি আমাদের মাস্টারমশাইয়ের আঁকা হয়ে থাকে তবে তিনিই আমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারেন।
পরদিন সকালে যখন রোদ পড়ার কথা, সদানন্দ এলো। ফুটবল দিয়ে মেপেজুখে জায়গাটা ঠিক করে ছবিটাকে বসিয়ে দিয়ে সে বললো, তা যা-ই বলুন, মনটিকে ঠিক ধরা যায়নি ছবিতে।
মনসা বললো, কেন, মাস্টারমশাই?
তখন আমি ভেবেছিলাম অত্যন্ত হাল্কা ফুলের মতো একটি মন ছিলো এঁর। পরে যত ভেবেছি ততই আমার মনে হয়েছে, অত্যন্ত অভিমানী মেয়ে। সে অভিমানটা যেন ফোটেনি।
হতে পারে তা। মনসা বললো, আপনি এ ছবিটার একটা জোড়া আঁকুন না।
তা মন্দ হয় না, সদানন্দ বললো, তা মন্দ হয় না যদি এ জায়গাটায় সুমিতি-মায়ের একটা ছবি থাকে। কিন্তু এক বিপদ হয়েছে, জানো মণি, আমি যেন কারো প্রভাবে পড়েছি, পোর্ট্রেট আঁকতে হলে যেমনটা দরকার সেটা আছে কি না-আছে। তা হলেও ভালো প্রস্তাব।
সদানন্দমাস্টার চলে গেলো।
সুমিতি বললো, মণিদিদি, তুমি কিন্তু কখনো ছবি আঁকার কথা মনে করিয়ে দিয়ো না।
যদি তোমার এখনকার কোনো মনোভাব তার কল্পনাকে আকর্ষণ করে থাকে তবে ছবি আঁকার কথা মনে করিয়ে দিতে হবে না। আর তখন তুমি প্রত্যাখ্যান করতেও পারবে না। সেটা তোমার নিজের কাছেই বাড়াবাড়ি বলে মনে হবে।
কি বিপদ ঘটালে তুমি! তুমি নিজে কখনো সিটিং দিয়েছো?
মনসার চোখে হাসি ফুটলো। সে বললো, ভাই বউদি, তুমি কি আমাকে এত কুরূপা মনে করো যে বয়ঃসন্ধির সময়েও কোনো শিল্পীর শ্রদ্ধা আকর্ষণ করবো না?
‘ভালো হয়েছিলো নিশ্চয়ই ছবি?
তাকে মানুষের ছবি বলে মনে হয় না। আমার চোখ দুটো কি জুলফির উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে কান ছুঁয়ে আছে?
সে ছবি কোথায়, ভাই?
আগে জ্যাঠামশাইয়ের ঘরে থাকতে দেখেছি, এখনো আছে বোধ হয়।
সুমিতি বোধ করি মনে মনে ছবিটাকে কল্পনা করার চেষ্টা করলো। একটু পরে সে বললো, মাস্টারমশাইকে আমার অপূর্ব মনে হয়। তোমার রবিনহুডের গল্প মনে আছে?
কেন বলো তো? ফ্রায়ার টাকের কথা বলছো? তার পরে খিলখিল করে হেসে উঠে মনসা বললো, ঠিক ধরেছো। মাস্টারমশাইকে বলবো।
বলো কি?
না, না, উনি শুনে খুশি হবেন। বলবেন, তার ছাত্রদের দলে মিশবার উপযুক্ত একজনই এসেছে।
কথার মোড় ফিরিয়ে সুমিতি বললো, কথাটা যখন উঠলো, বলি তোমাকে। একই জায়গায় বিশ-ত্রিশ বছর চাকরি করা অসাধারণনয়, তাহলেও ওঁর মতোশিক্ষিত এবং গুণী লোকের পক্ষে রকম একটা গ্রামে জীবন কাটিয়ে দেওয়া খুব প্রাত্যহিক ঘটনা নয় কিন্তু।
জেঠিমা ওঁর ব্যক্তিগত ব্যাপারের খোঁজ খবর রাখেন। তাঁর কাছে শুনেছি শৈশবে ওঁর বাবার মৃত্যু হয়। ছাত্র অবস্থাতেও উনি সত্য আর দু-তিনটি ছোটো ভাই বোনকে পালন করতেন। তারপর অর্থোপার্জন করে বোনের বিয়ে দিয়ে সংসারকে একটু খাড়া করে দিয়ে এখানে চলে আসেন।
নিজের আত্মীয়-স্বজনের খবর রাখেন না?
রাখেন বৈকি। আগে দেখেছি বছরে দুবার ছুটি নিয়ে চার-পাঁচ মাস অন্যত্র গিয়ে থাকতেন। একবার ওঁর বোন এসেও কিছুদিন এখানে ছিলেন। ছোটো এক ভাই এখন কী একটা ভালো। চাকরি করে, ওঁদের মা তার কাছেই থাকেন। কিন্তু সব চাইতে ছোটোটির কথা অবাক করার মতো।
কী হয়েছে তার?
গল্পের বইয়ের রোমান্টিক নায়কের মতো বিনিপয়সায় য়ুরোপে গিয়েছিলো লেখাপড়া শিখতে। তার কোনো খবর পাওয়া যায় না। পয়সার জন্যে সে দেশলাই ফিরি করতে শুরু করেছিলো–এই শেষ খবর।
কাহিনীটা সুমিতিকে অন্যমনস্ক করেছিলো। একটু পরে সে বললো, এই বেদনাবোধের জন্যেই কি মাস্টারমশাই সমাজবিমুখ?
তা কী করে বলবে? সদানন্দ নামটা জেঠিমা রেখেছেন ওঁর স্বভাব দেখে। শোনা যায়, বিয়ের ভয়ে পালিয়েছিলেন–একদিকে মা, অন্যদিকে সহপাঠিনী সেই মেয়েটি। দুজনের মাঝখানে পড়ে, আমার মনে হয়, মাস্টারমশাই সত্যিকারের পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছিলেন।
মনসা যে সুরে কথা বলে তেমনি করে সুমিতি বললো, কাপুরুষ।
আসলে ফ্রায়ার টাক। বললো মনসা। একটু পরে আবার বললো, চোখের সামনে পাথর হয়ে থেকে কষ্ট না দিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে।
মনসার খোঁজে একজন দাসী এলো, তার হাতে ট্রেতে চায়ের সম্ভার।
আজ রবিবার? মনসা জিজ্ঞাসা করলো, আমার মনে ছিলো না। এসোবউদি, রবিবার করা যাক।
সুমিতি বললো, রবিবারে কি তোমার দুবার ব্রেকফাস্ট হয়? তোমাদের দেশে রবিবারের চিহ্ন বুঝি চা?
তা বলতে পারো। এইটুকুই তো আছে। ফুর্সিও নেই, কোতল করি এমন মোবারকও নেই। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মনসা বললো, এর আগে একদিন রসিকতা করে বলেছিলে, রাজনীতি তোমার সময় কাটানোর ছল। সেদিন তোমাকে বুঝতে পারিনি, তারপর মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে তুলনা করে তোমাকে যেন চিনতে পারলাম। সক্রিয় রাজনীতিতে নিরুৎসাহ মাস্টারমশাই আমাদের দাদার জেলখাটা মতবাদের গোড়ার কথা জুগিয়েছেন। এ যেন ভূগোল শেখান, ছাত্রকে ভুল শেখানো যায় না বলেই ঠিকটা শিখিয়ে দিয়েছেন। যেন সেকালের কোনো শস্ত্রবিদ, সন্তুষ্ট হলে দিগ্বিজয়ের অস্ত্র দেন কিন্তু নিজে শস্ত্রচালনায় বীতস্পৃহ। তেমনি যেন তোমার ব্যাপার। বিদ্রোহ করাটা যুক্তিগ্রাহ্য, যেমন স্নান করা কিংবা বই পড়া, তার একটি প্রকাশ রাজার প্রতি তোমার বিরোধ, নতুবা শস্ত্রের নেশায় ক্ষত্রিয়ের মতো বিরোধের নেশায় তুমি চলতে চাওনি।
