ঠিক বুঝতে পারছি না। তোমাকে ডেকেছিলাম কেন তাই বলি শোনো। তোমার ছেলেরা বড়ো হয়েছে, এখন ওদের জীবনের উপকরণে খানিকটা আয়াস প্রয়োজন।
ওদের কষ্ট কোথায় দেখলে?
কষ্ট নয়। বিশিষ্ট অভ্যাস হওয়ার বয়স হচ্ছে ওদের। শোবার ঘরের আলো কী রকমটা দরকার, সেফে কী ধরনের বই থাকা উচিত, কিংবা আদৌ বই থাকবে কিনা এমন সব রুচিবৈশিষ্ট্য ওদের হয়েছে বৈকি, অন্তত হলে অন্যায় হয় না। সুমিতিরও এবিষয়ে কিছু বলার থাকতে পারে।
এদিকটায় আমার খেয়াল ছিলো না।
তাতে এমন কিছু ত্রুটি হয়নি তোমার। সুমিতির জন্যে আমি একটা মহলের কথা চিন্তা করছি। পাশাপাশি দুখানা শোবার ঘর, একটা স্বতন্ত্র বসবার ঘর, একটা বাড়তি ঘর যা লাইব্রেরি কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায়। এবং সেই সঙ্গেই ভাবছি রূপুর জন্যে যে-মহলটা হবে এখন থেকেই তারও পরিকল্পনাটা ঠিক করে রাখা দরকার।
অনসূয়া কিছু বলার আগেই সান্যালমশাই হেসে আবার বললেন, এতে নিশ্চয় তোমার ছেলেরা জমিদার পরিবারের সহজলব্ধ আয়াসে অমানুষ হয়ে যাবে না। এ ধরনের কথা নিয়ে একসময় তাদের অনেক দাম্পত্য বিতর্ক হয়ে গেছে। উকিলের মেয়ে অনসূয়া সে সময়ে জমিদারগোষ্ঠী সম্বন্ধে যে মতটি পোষণ করতেন সেটা শ্রদ্ধার নয়। অনসূয়ার পক্ষে এখন সেই মনোভাবটিকে মনের মধ্যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তার ধারণা হয়েছিলো এমন একজনের সঙ্গে তার বিবাহ হয়েছে যার বিরাট প্রাসাদের কোন কক্ষে কত উপপত্নী আছে তার নিশ্চয়তা নেই। নিজের রূপের উপরে তার অভিমান হয়েছিলো। রূপের জন্যই বিবাহ। সে সময়ে তিনি স্বামীকে ভয় করতেন, ঘৃণা করতেন। পরে কর্তব্যবোধকে আঁকড়ে ধরে থাকতে থাকতে প্রথমে ঘৃণা তারপর ভয় চলে গিয়েছিলো। কিন্তু তাসত্ত্বেও অনসূয়া নিশ্চিন্ত নন। যে অত্যাচার বৃত্তির পোষণ করেছে এই পরিবারের একাধিক পুরুষ, সেটা অর্জিত গুণ হয়ে এদের রক্তধারায় চলছে না তা কে বলবে? তখন অনসূয়ার ছেলেপুলে হয়নি, দু-একটা কথা বলার মতো সাহস তিনি অর্জন করেছেন, একদিন সেই কিশোরী অনসূয়া বলেছিলেন–আমাদের ছেলেরা যেন নীতিজ্ঞানহীন না হয়। কথাটা দুঃসাহসে বলে ফেলে অনসূয়া লজ্জায় মুখ লুকিয়েছিলেন, প্রায় পুরো দুটো দিন স্বামীর সম্মুখে আসেননি। পরবর্তীকালে এই লজ্জা থাকার কথা নয়, ছিলোও না। ছেলে মানুষ করা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর তখন বহু বিতর্ক হয়েছে। সেসব বিতর্কে অনসূয়ার পক্ষে মূল কথা ছিলো–অনায়াসলভ্য জীবনের উপকরণ মানুষকে অপদার্থ করে। অনেকসময়ে অনসূয়ার কথা মেনে নিলেও কখনো কখনো সান্যালমশাই বলেছেন–তোমাদের এই ব্রাহ্মশালীনতাবোধ, এই নীতিবোধের খর্য ভিক্টোরিয়ান ইংলন্ড থেকে ধার করা। এই পালিস সে যুগের ইংরেজদের বৈশিষ্ট্য ছিলো। এর সত্বস্তুটুকু আবার পিউরিটানদের থেকে ধার করা। কিন্তু খোঁজ নিলে জানতে পারবে, কি এদেশের ব্রাহ্মগোষ্ঠীতে, কি ওপারের ইংরেজ সমাজে বর্তমান এত বাছবিচার নেই। অবশ্য অনসূয়ার শুচিপ্রিয়তাকে মূল্যও দিয়েছেন তিনি।
কিন্তু এই বর্তমানে অনসূয়াকে তার শুচিপ্রিয়তার কথা তুলে টুকতে কৌতুক বোধ হলো। সান্যালমশাই বললেন, কিছু বললে না?
সহজলব্ধ জীবনের উপকরণ-প্রাচুর্য বয়স্ক মানুষদেরও সংসারে অরুচি আনতে পারে, এবং সে অরুচিবোধটাকে দূর করার জন্যে সে কুপথ্য করতেও পারে। কিন্তু ছেলের জন্যে ঘর তুলতে চাচ্ছো তাতে কি এমন অন্যায় হবে? আমার ঘরগুলো তুলবার সময়ে আমার রুচির মূল্যও তুমি দিয়েছিলে।
তুমি যখন মত দিচ্ছো তাহলে বলি শোনো : এঞ্জিনিয়ার না করবে, কিন্তু পরিকল্পনাটা আমাদেরই করা দরকার। তুমি এসো, আমার পরিকল্পনাটা তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
দুজনে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন, সেখানে দাঁড়িয়ে সান্যালমশাই অনসূয়াকে তার পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে দিলেন। অনসূয়াও আলোচনা করলেন।
ফিরে এসে সান্যালমশাই বললেন, বলল, এ কি আমার উচিত নয়, এমন করে ওদের গুছিয়ে দেওয়া?
তুমি যে ছেলেদের আমার চাইতেও বেশি ভালোবাসো এ তারই প্রমাণ।
বলো কী, এ কি আমারই আত্মবিস্তারের চেষ্টা নয়?
অনসূয়া কিছু না বলে মুখ নিচু করে হাসতে লাগলেন।
অমন মধুর করে হাসছো কেন?
এখন বুঝতে পারছি কেন তোমার দেওয়ানজিদের কথা মনে পড়ছে।
কেন, কেন?
তোমার বর্তমান মনের অবস্থায় সান্যালদের রক্ত আবার উদ্দাম হয়ে উঠেছে, বিস্তার চাইছে। তোমার বহু-ঘোষিত শান্তির বিপরীত। যা এতদিন পেয়েছে ভেবেছিলে তাকে ত্যাগকরে আসতে হচ্ছে বলেই মনের এখানে-ওখানে লুকিয়ে থেকে সেটা আত্মপরিচয় দিচ্ছে।
তাই কি? ওরে, তামাক দে।
কেউ শুনলো কিনা দেখবার জন্য উঠে গিয়ে অনসূয়া দেখলেন একজন দাসী এগিয়ে আসছে।
কী মা?
তামাক চাইলেন।
হাসিমুখে অনসূয়া ফিরে এসে বসলেন।
কিছু বলবে মনে হচ্ছে। সান্যালমশাই বললেন।
এবার ধান কীরকম হয়েছে?
ইংরেজিতে যাকে বাম্পার ক্রপ বলে।
প্রজারা বোধ হয় কেউ টাকা ফেলে রাখবে না?
তা কি এখনই বলা যায়? তবে শুনছি বিলের পয়স্তি জমি চাষযোগ্য হচ্ছে, এদিকেও চর জেগেছে বুধেভাঙার লাগোয়া।
অনসূয়া হেসে বললেন, তোমাদের দেশের প্রবাদটাই মনে পড়ছে; তোমারও ধানের নেশা লেগেছে।
সান্যালমশাই কথা না বলে তামাকে টান দিতে দিতে মৃদু মৃদু হাসলেন।
