বউদি, তোমার চা পাঠাতে আমি নিষেধ করেছি। আজ উপোস করতে হবে, পারবে তো?
তোমার কথাগুলো এমন যে রসিকতা কিংবা অন্য কিছু বোঝা কঠিন।
তা নয়, তুমি আমার সঙ্গে এসো।
মনসার সঙ্গে সুমিতি অন্দরমহলের একতলায় একখানি ঘরে গিয়ে দাঁড়ালো। বহুদিন বন্ধ থাকার জন্য ঘরখানিতে সোঁদা সোঁদা গন্ধ। সুমিতি দেখতে পেলো দুজন দাসী কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঘরের আসবাবপত্রগুলি মুছচে। স্পিরিটের গন্ধও এলো নাকে। কোনো একটি স্মৃতিঘরে নাম করা লোকের ব্যবহৃত শয্যা-উপাদান, বসনভূষণ যেমন সাজানো থাকে তেমনি করেই এ ঘরখানা সাজানো। বিছানার পাশে ছোটো একটা টিপয়ে একটা বইও আছে। খাটের পায়ের দিকে মখমলের একজোড়া মেয়েলি চটি।
মনসা বললো, এটা আমাদের কাকিমার ঘর।
কাকিমা? কাকিমা বলতে কি সুকৃতিকেই নির্দিষ্ট করছেনা মনসা? তা যদি হয় তবে এ সবই কি সুকৃতির ব্যবহৃত জীবন-উপকরণ? মৃত্যুর আগের দিন কি সুকৃতি ওই বইখানি পড়েছিলো?
সুকৃতির যখন মৃত্যু হয় তখন সুমিতির শৈশবকাল। দীর্ঘদিনের ব্যবধানে ঘটনাটা মনে পড়লেও তা শোক বহন করে না।
সুকৃতির একটা পূর্ণাবয়ব প্রতিকৃতি ছিলো সেই ঘরে। সবুজ রঙের বেনারসি শাড়ি পরে সুকৃতি লীলাভরে নিজের আঙুলগুলো যেন দেখছে। হাল্কা গড়ন ছিলো সুকৃতির, ছবিতে যেন একটি ফুলের গুচ্ছকে সাজিয়ে রাখার কায়দায় আঁকা হয়েছে। ঠিক এত বড়ো কোনো ফটো বা তেলরঙের ছবি সুমিতিদের বাড়িতে নেই, কিন্তু তাই বলে চিনতে অসুবিধা হবে এমন নয়। বরং চিনে এই লাভ হলো যে উদ্বেল অশ্রুগ্রন্থিগুলো প্রবাহের পথ পেয়ে স্নিগ্ধ হলো কিছুটা।
মনসা বললো, বউদি, মালা আনিয়ে রেখেছি, পরিয়ে দাও। আজ কাকিমার মৃত্যুতিথি। সেইজন্যেই আজ তোমাকে উপোস করতে বলেছি।
সুমিতি উত্তর দিলো না, অনেকক্ষণ নির্নিমেষ দৃষ্টিতে সুকৃতির ছবির দিকে চেয়ে রইলো, তারপর মালাটা পরিয়ে দিলো।
যে কথাটা প্রথম সে বললো সেটা এই–দিদি এত সুন্দরী ছিলেন, আমার ধারণা ছিলো না, মনসা। এমন বউই তোমাদের বাড়িতে মানায়।
বাইরে এসে সুমিতি বললো, তোমরা আর কী করো, মনসা?
আর কিছু নয়। সমস্ত দিন এ ঘরটা খোলা থাকে। সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় আর এক বৎসরের জন্যে।
ছবিটা আমার শোবার ঘরে নিয়ে যাওয়া যায় না?
কী এমন আপত্তি তাতে? জেঠিমাকে বলবো।
দিনটার মাঝামাঝি সময়ে সুমিতি তার ঘরে অর্ধশায়িত অবস্থায় মনসার সঙ্গে আলাপ করছিলো। কিছুক্ষণ আগে মনসা যা বলেছে তা থেকে ধরে নেওয়া যায়, হয়তোবা এই পরিবারের আত্মপ্রসারের একটা সময় এসেছিলো, ঠিক তখনই সুকৃতির মৃত্যু গতিটাকে মন্থর করে দিয়েছে।
তদানীন্তন রাজনৈতিক আবহাওয়া বিশ্লেষণ করতে করতে মনসা বলেছিলো, কাল আমাদের আঘাত করেছিলো। কালের স্রোত যে পথ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে তা থেকে অনেক দূরে আমাদের অবস্থান, তবু তারই একটা আবর্তসংকুল ধারা প্লাবনের মতো এসে আমাদেরকাল সম্বন্ধে সচেতন করেছিলো, বিমুখও করেছে।
বর্তমানে ফিরে মনসা বললো, বউদি, কাকিমার ছবি তোমার ঘরে এনে রাখো। সে ভালোই হবে। কাকিমাকে জেঠিমা গভীরভাবে ভালোবাসতেন, কিন্তু সে গোপন ভালোবাসা বাইরে প্রকাশ করতে পারেন না। যে সাহস দেখাতে গিয়ে তিনি মাঝপথে থেমে গেছেন, তুমি যদি পারো তাহলে হয়তো তিনি খুশিই হবেন।
সুমিতি বললো, এ বাড়ির কারো সাহসের অভাবেই যে এই গোপন ব্যবস্থা, তা নাও হতে পারে।
কথাটা বলতে বলতে সুমিতি অনসূয়ার সম্বন্ধে এই রকম ধারণা করলো : এটা জীবনের একটা বিশিষ্ট ভঙ্গি। দু’এক ক্ষেত্রে মায়েদের সন্তানহে গোপন রাখতে হয়। সেটা যে সাহসের অভাবেই তা নয়, শালীনতাবোধও অনেকসময়ে আজীবন দুঃখ বহনের পরামর্শ দেয়। কুন্তির সাহসের অভাব ছিলো না। অনসূয়ার এ ব্যাপারেও যেন কতকটা তেমনি এক মনোভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছ। এ বাড়ির যা কিছু সব বিধৃত রয়েছে অনসূয়াতে, সেইজন্যই তার এই সংযম। যে বিধান তিনি ভাঙতে পারেন অনায়াসে, যার জন্য তার কৈফিয়ত নেওয়ার কেউ নেই, সেটাই যেন ভাঙা কঠিন ঠিক সেইজন্যেই।
দিনটা একেবারে শেষ হয়ে যাওয়ার আগে মনসা দুজন ভৃত্যের সহায়তায় সুকৃতির ছবিটা সুমিতির ঘরে পৌঁছে দিলো।
.
এখন সন্ধ্যা। সান্যালমশাইয়ের ঘরে এসে অনসূয়া বললেন, আমাকে ডেকেছো?
খুঁজছিলাম। উপাসনা হয়েছে?
এ জীবনে সেটা আর হলো কোথায়?
মামার বাড়ির দেওয়ানজির গল্প তোমার মনে পড়ে?
শুনেছিলাম যেন।
তাকে বোধ হয় তার বেদিটা ছাড়া কল্পনা করা কঠিন। আমি তাকে বোধ হয় শৈশবে দেখেওছিলাম। বকের পাখার মতো শাদা চুল, অতিশীর্ণ এক বৃদ্ধ ঘন্টার পর ঘন্টা স্তব্ধ হয়ে তার মর্মর বেদিটায় বসে আছেন। তার পরে যারা দেওয়ান হয়েছিলো তারা সকলেই ম্যানেজারের পদবীতে রাজ্য শাসন করতো। যে রানী তাকে নিয়োগ করেছিলেন, যে রাজার আমলে তিনি নীলকরদের শাসন করেছিলেন তারা কেউ নেই। রাজার ছেলে তখন জমিদার। দেওয়ানজির স্থাপিত স্কুল ধ্বংস হয়ে গেছে, তার লাইব্রেরির সেকেলে বইগুলো ধুলোর মতো মূল্যহীন, কিন্তু তার সেই মর্মর বেদি আর তিনি যেন অবিনশ্বর একটি উপাসনা। উপাসনার কথায় তিনিও বলতেন–পারলাম কোথায় ডাকতে?
একটা স্বল্প বিরতির পরে অনসূয়া বললেন, হঠাৎ তার কথা মনে হলো কেন?
