শ্যামার মা বললো, বড়দিদি, কাল শ্যামার জন্মদিন।
তুমি কাল সকালে একবার মনে করিয়ে দিয়ে, তরু।
এবারে ছ বছর হলো। ওর লেখাপড়ার কী করি?
অনসূয়া যেন একটু চিন্তা করলেন। মনসার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, মণি, তোর লেখাপড়ার কী ব্যবস্থা হয়েছিলো রে?
মনসা বললো, তখন নবদ্বীপের ঠাকরুন ছিলেন, প্রথমে তার কাছে পড়েছিলাম, তার পরে দাদার পিছনে ঘুরে বেড়াতাম।
তাহলে? আচ্ছা, তরু, তুমি এক কাজ করো না হয়, সুমিতির কাছে প্রস্তাব কোরো, তার সাহায্য চেয়ো। তার হাতে মেয়ে তোমার ভালোই মানুষ হবে।
একটি দাসী এসে বললো, বড়ো-মা, বাড়িতে জামাই এসেছে।
তাহলে তুই কাজে এলি কেন? তা বেশ করেছিস। বামুনঠাকরুনকে বলিস জামাইয়ের জন্য যেন পরিষ্কার করে থালা গুছিয়ে দেয়। সকাল সকাল চলে যাস কিন্তু।
দাসী চলে গেলে তরু বললো, বড়দিদি, শ্যামার জন্যে আমি নিশ্চিন্ত হলাম।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে এটা-ওটা বলে সেও চলে গেলো।
মনসা অনসূয়ার পিছনে গিয়ে তার খোঁপা খুলে দিয়ে দু হাতে তার চুল নিয়ে বসলো।
ও কী করিস?
পাকা চুল তুলে দিই।
পাকা?
তা হবে না? দিদিমা হতে যাচ্ছ যে।
পাকা চুল থাকার কথা নয়, অনসূয়ার এখন বিয়াল্লিশ চলছে। কিন্তু পাকা চুল তুলবার নাম করে মনসা প্রথমে চিরুনি, পরে চুলের কাটা নিয়ে এলো।
তোর শরীর ভালো যাচ্ছে তো মণি? একটা কথা তোকে বলি, বাপু। এ সময়ে একসঙ্গে অনেকটা খাওয়া যায় না, খেতেও নেই, অথচ পুষ্টির ব্যাঘাত করলেও চলবে না।
তাই বলে সব জিনিসই খাওয়া যায়?
কী খাওয়া যায়, তাই বল।
তা বলবো একসময়ে। এখন একটা কাজের কথা আছে শোনোকাল কাকিমার তিথিপালন।
কালই নাকি দিনটা?
হ্যাঁ, কালই পড়েছে তিথির হিসেবে।
অনসূয়ার সুরটা একটু উদাস হয়ে গেলো, তিনি বললেন, তোমার এ অবস্থায় কিন্তু উপোস করতে নেই।
কী যে তুমি বলো। তুমি চিরকাল পারলে আর আমরা পারবো না?
তোমরা আবার কে কে হচ্ছো?
বউদিরও করা উচিত, সে তো এ বাড়ির বউ।
বুদ্ধিমতী মনসা কথাটা তখন-তখনই ঘুরিয়ে নিলো, আর অনসূয়ার সামনে একটা আয়না এগিয়ে দিলো।
দুষ্টু মেয়ে, এ কী করেছিস?
তুমি ভাঙতে পারবে না, জেঠিমা, আমি কিন্তু তাহলে রাগ করে যাচ্ছেতাই করবো।
কিন্তু আয়নার দিকে অনসূয়া একাধিকবার চাইতে পারলেন না। তার চুলগুলি যত্নের অভাবে ইদানীং রুক্ষ ও অগোছালো দেখায়। অনসূয়ার এ বাড়িতে প্রবেশের ছাড়পত্র ছিলো দেহবর্ণ এবং মুখের গঠন। এ বাড়িতে আসবার পর তার চুলের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো, যৌবনে তিনি যত সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছিলেন। সেকালে যাকে আলবার্ট বলতো তেমনি কায়দায় ঢেউ-তোলা চুলের ছোটো ঝপটা কপালে নামিয়ে মাথার পিছন দিক জুড়ে মস্ত একটা খোঁপা করে দিয়েছে মনসা। অনসূয়ার রূপ যেন ইতিহাস থেকে বর্তমানে চলে এলো।
মনসা আবার বললো, তাতে কী হয়েছে, সব সময়েই তো তোমার মাথায় ঘোমটা রয়েছে।
রান্নাবাড়িতে পা দিয়ে অনসূয়ার একটা অব্যক্ত অনুভব হলো। সুকৃতির কথা, সুকৃতি এবং সুমিতির তুলনা। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী এলে অতীত স্ত্রীলোকটির পরিবেশে নতুনটিকে যেমন কৌতূহলের বিষয়ীভূত বলে মনে হয়, এ যেন কতকটা তেমনি। যে ভগ্নস্তূপ কালায়ত বিস্মৃতির গভীরতায় তলিয়ে যাচ্ছিলো তার উপরে নতুন কিছুর কাঠামো খাড়া করে নির্মম আলোয় পার্থক্যটা যেন দেখিয়ে দেওয়া। সুকৃতির পর সুমিতি এই বাড়িতে আসবে, এ যেন একই চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন পোশাকে ও অঙ্কে প্রবেশ করে চরিত্রের আর একটি দিক ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা।
তাঁর আকস্মিকভাবে মনে হলোপ কি জানতো সেই কলঙ্কের কথা? তা সম্ভবনয়।দুর্ঘটনা বলেই সে জানে; আর সে জানাই কি সুমিতির প্রতি তার মনকে করুণ এবং পরে সংবেদনশীল করেছিলো?
মনসা যা বলে গেলো সেটা একটা আড়ম্বরহীন সাধারণ ব্যাপার। মনসা প্রায় তার বাল্য থেকেই অনসূয়ার অনেক উপবাসের সঙ্গী, তার কথা স্বতন্ত্র। অনেকসময় বাড়ির অন্য লোকেরা জানতেও পারে না। অনসূয়ার নিয়মিত একাধিক বার্ষিক উপবাসগুলির একটি হিসাবে দিনটি অলক্ষ্যে গড়িয়ে চলে যায়।
রান্নামহলের ব্যবস্থাপনা শেষ করে অনসূয়া দেখলেন মনসা ঠিক পথেই চলেছে। ব্যাপারটা সুমিতির কাছে প্রকাশ করার মধ্যে কুণ্ঠাবোধ আছে কিন্তু অপ্রকাশ রাখাও যেন একটা গোপনবৃত্তি। অবশেষে তিনি স্থির করলেন-হয়তো মনসাই বলবে, এবং হয়তো সুমিতিও উপবাস করবে। নতুবা বাড়ির লোকগুলির চোখে সুমিতি যেন কিছুটা হীন হয়ে যাবে।
মনসার এবারকার চালচলন অনসূয়ার কাছে অর্থযুক্ত বলে বোধ হলো। সে যেন সুমিতিকে এ বাড়ির সকলের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চায়। তা ভালোই হবে যদি মনসা সফল হয় এ ব্যাপারে। ছেলের প্রেমপাত্রী ও তার শ্রদ্ধাস্পদের মধ্যে ব্যবধান গড়ে ওঠা নিশ্চয়ই ভালো নয়।
সুকৃতির জন্য মন করুণ হয়েছিলো, সেই মনে অনসূয়া চিন্তা করলেন : সুমিতি বুদ্ধিমতী মেয়ে, সে কি বুঝতে পারবে না যে ব্যক্তি-অভিমান শুনতে যত জোরদার আসলে ততটা নয়। আমি যা, আমাকে সেই ভাবে গ্রহণ করো, এটা আধুনিক কিন্তু অর্থহীন কথা।
.
সুমিতির শরীরটা একটু খারাপ, সকালে উঠতে দেরি হয়েছিলো, মানে অনিচ্ছা বোধ করে হাত মুখ ধুয়ে এসে সে নিজের ঘরে বসে একখানি পত্রিকায় চোখ রেখেছিলো। এতক্ষণে চায়ের ট্রে নিয়ে দাসীর এবং প্রায় তার সঙ্গে রূপুর এসে যাওয়ার কথা। এমন সময়ে মনসা এলো।
