সুমিতি তাকে প্রশ্ন করেছিলো, ননদিনী, তুমি বুঝি ইহজীবনে দাদাকে অনুকরণ করাই ধর্ম বলে গ্রহণ করেছো?
অনুকরণ কি আর এখন সম্ভব হয়। যখন মেয়েমানুষ হইনি তখন অবশ্য দাদার ঘুড়ি-লাটাই ছিপ বড়শি আমার ব্যবহারেও লাগতো।
হঠাৎ গলার স্বর গম্ভীর হলো মনসার, সে বললো, তোমাকে গোপনে বলি, বউদি, লোকে বলে যার কথা ভাবা যায় তার মতো চরিত্র হয় সন্তানের। এসব ধারণার মূলে যদি কিছু সত্যি থাকে তবে আমার ছেলেও যেন তার মামার মতো হয়।
নির্লজ্জ!
কেন বলো তো?
প্রথম সন্তান হবে, লজ্জায় মাটিতে মিশে যাবে, তা নয়–কথাটা ঘুরালো সুমিতি।
তাও বটে। বলতে বলতে সত্যি মনসা লাল উঠলো লজ্জায়।
চার-পাঁচ দিন পরে। নিজের ঘরে সুমিতি বসেছিলো। রূপুকে সঙ্গে করে মনসা কোথায় বেড়াতে গিয়েছে। সময়টা এখন অলস মধ্যাহ্ন। কোন কথায় এ কথাগুলো উত্থাপিত হলো সুমিতি ধরতে পারছে না। তার মনে হলো একবার মনসা রহস্যছলে জিজ্ঞাসা করেছিলোতার দাদাকে সুমিতি কেন বিয়ে করেছে। কোনো একটি লোককে কেন ভালোবাসলাম এ নির্ণয় করা দুরূহ ব্যাপার। কোনো কোনো ভালোবাসা ত্বকগভীর মোহ বলে প্রমাণিত হয়, অন্য দু’এক ক্ষেত্রে বিশ্লেষণের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসা ক্রমাগত নতুন হতে থাকে।
সুমিতি অনুভব করলো নৃপনারায়ণের চাকচিক্য অন্য অনেকের তুলনায় অকিঞ্চিৎকর, তবু সে কেন দুর্নিবার বলে তাকে আকর্ষণ করলো তা বলা কঠিন। এ বিষয়ে তথ্যের কাছে পৌঁছুতে গেলে প্রশ্ন করার মতো লোক দরকার।
সেদিনই সন্ধ্যাবেলায় মনসা গল্প করতে এসে কিছুকাল এটা-ওটা নিয়ে আলাপ করার পর বললো, একটা কথা তোমাকে বলা দরকার, ভাই; আমার এক অবাক করা অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। যা বলতে ইচ্ছে করে এবং যা তোমাকেই বলা যায়।
কী এমন অভিজ্ঞতা?
তার আগে তুমি বলো, আমি যা বলবো সেটাকেই চূড়ান্ত সত্যি বলে মেনে নেবে, মনে কানো প্রশ্ন রাখবে না?
চেষ্টা করবো। তোমার উপরে বিশ্বাস আমার সহজে নষ্ট হবে না।
যত সহজে কথাটা বলতে পারবে ভেবেছিলো মনসা, বলতে গিয়ে দেখলো বলাটা তত সহজ এয়। কথা হারানো নয় শুধু, লজ্জায় সে রাঙা হয়ে উঠলো। তবু সে ধীরে ধীরে বললো, আমি মার আমার দাদা আবাল্য খেলার সঙ্গী ছিলাম।
তা ছিলে।
খেলাধুলো, লেখাপড়া, ঘোড়ায় চড়া—
আজকালকার দিনে শহরে ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানোর জায়গা পাওয়া কঠিন বটে।
তোমরা হলে হয়তো মোটর নিয়ে চলতে, মোটর ভেঙেচুরে তেলকালি মেখে দুজনে সটাকে নিয়ে ঠুকঠাক করতে। মনসা বললো।
এরকম অভিজ্ঞতা কারো কারো হয়।
আসল কথা এই, দাদাকে আমি ভালোবাসতাম।
সব বোনই তার দাদাকে ভালোবাসে।
তা নয়। আমার দাদা তখনো ভালোবাসার প্রকৃতি বিচার করার পক্ষে অনভিজ্ঞ। আমিও কি তখন সেটার স্বরূপ বুঝতে পেরেছি? আমার দাদার কোনো পরিবর্তন হয়েছিলো কিনা জানি না, হয়েছিলো বলে আমার বিশ্বাস নয়, কিন্তু আমার শ্রদ্ধায় একসময়ে উত্তাপের সঞ্চার য়েছিলো।
তার মানে? তুমি কী বলতে চাও?
তোমার গলায় যে আশঙ্কা ফুটে উঠেছে ঠিক তা-ই। প্রায় একটা বছর এই উত্তাপে আমি লেছি, বিয়ের পরে বুঝলাম এই উত্তাপকেই প্রেম বলে।
পোড়ামুখী।
তা বলো। এ কথা স্বামীকে বলা যায়নি, দাদাকে তো যাবেই না। তুমি তো এমন বিপদে পড়োনি, বউদি, তবু আশা করছি তুমি খানিকটা বুঝবে, কারণ তুমি ভালোবেসেছো। কেউ কি জানে সেই উত্তাপকেই আলোতে পরিণত করতে আমায় কত কষ্ট করতে হয়েছে। অধ্যাত্ম রামায়ণও পড়তে হয়েছিলো। পুড়তে ভালো লাগে তবু পুড়বো না, উত্তাপ ভালো লাগে তবু দূরে থাকবো। আর দাদার কাছে গোপন রাখতে হবে।
সুমিতি মনসার মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো।
কিছু পরেই অবশ্য সুমিতি দুষ্টুমির হাসিতে চোখ ভরে বললো, তুমি কি আমাকে ঘরছাড়া করতে চাও?
সে উত্তাপ নেই আর। কিন্তু খুব জবাব দিয়েছে।
একটু বিরতির পরে মনসা বললো, এবার তোমার কথা বলল। আমি ভেবেছি দাদার সঙ্গে তোমার আলাপ রাজনীতির ক্ষেত্রে। তা যদি হয়, ও ব্যাপারে তোমাদের মতৈক্য ছিলো বলে ধরে নিতে পারি। আর তা যদি হয়, আমাদের সামন্ততান্ত্রিক জীবন তোমার ভালো লাগার কথা নয়।
সুমিতি বললো, আসলে হয়তো আমি আর তুমি এক। রাজনীতি আমার ছলনা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত এনার্জি ছিলো, সেটা ব্যয় করা দরকার হলো। যদি ধীর স্থির হতাম, হয়তো সেলাই করতাম, ছবি আঁকতাম, দুম্পাঠ্য কবিতা লিখতাম। তা পারিনি বলে কতগুলি সমবয়সী ছেলেমেয়ের সঙ্গে হৈহৈ করে বেড়াতাম।
সেদিনকার আলাপের শেষ দিকটায় দুজনের বাচ্চাতুর্যের ঝলমল আবহাওয়ার আড়ালে দুটি সখি-হৃদয় স্নিগ্ধ হয়ে উঠলো।
পরিহাসের ছলে সে যা বলেছে সেটার কতটুকু তার নিজের সম্বন্ধে খাটে, মনসা চলে গেলে সুমিতি তাই ভাবলো৷ নিজে সে অন্যের তুলনায় অস্থির প্রকৃতির কিনা এটাই প্রথম প্রশ্ন; দ্বিতীয়ত, যাকে এতদিন একটা আদর্শবাদ বলে সে মনে করেছে সেই রাজনীতি তার নিছক অবসর বিনোদনের ব্যাপার ছিলো কিংবা অন্য কিছু, এর বিচার করতে গিয়ে জীবনে সে এই প্রথম অনুভব করলো, নিজের কৃতকর্মগুলিকে বিচার করতে বসলে কীরকম অপূর্ব অনুভব হতে পারে।
.
দুপুরের পর রান্নাবাড়ির দিকে যাওয়ার আগে কোনো কোনো দিন এ জায়গাটায় অনসূয়া বসেন। বারান্দাটার এ অংশটা ঢাকা এবং এখানে দেয়াল থাম প্রভৃতি চিত্রিত। পাথরের তৈরি বড়ো একটা পাল্কি বলে ভ্রম হয়। এখানে অনসূয়াকে দেখলে পরিবারস্থ অনেকেই অগ্রসর হয় আবেদন ইত্যাদি জানানোর জন্য।
