আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে চলে সুমিতি মনসার পিছনে খিড়কির ছোটো দরজা পেরিয়ে পুকুরের পাড়ে উপস্থিত হলো। প্রকাণ্ড কিছুনয়, তবুসুমিতির শহুরে অভিজ্ঞতায় বড়ো বলেই মনে হলো। পুকুরের তিনদিকে বাগানের বড়ো বড়ো গাছ প্রাচীরের চূড়ার মতো দাঁড়িয়ে। সেই গাছগুলির পায়ের কাছে মানুষের বুকসমান-উঁচু আগাছার জঙ্গল প্রাচীরের মতো পুকুরের তিনদিক ঘিরে রেখেছে। ওদিকের ঘাটগুলি কোথায় ছিলো জঙ্গলে ঠাহর করা যায় না। শুধু বাঁ দিকের জঙ্গলের প্রাচীরে একটা ছেদ আছে। সেখানে জলের কিনারায় খেজুরগাছের গুঁড়ির একটা ঘাট। এদিকে খিড়কির ঘাটে এখনো চুন-সুরকির সেকেলে আস্তর দেওয়া সিঁড়ি অনেকগুলি অটুট আছে। কিন্তু ব্যবহার কমই হয়, শুকনো পাতায় ঘাটের চাতালটুকু ঢেকে রয়েছে। কালো জল। পুকুরের মাঝামাঝি জায়গায় একটা ছোটো দাম তৈরি হচ্ছে। এক-দেড় হাত উঁচু ঘাসও তাতে চোখে পড়ে। গোটাকয়েক ডাহুক বসে আছে সেই দামে।
জলের কাছাকাছি গিয়ে গা ছমছম করে উঠলো সুমিতির। শিউরে উঠে সে বললো, এ জলে ম্যালেরিয়া হয় না, মণি?
ততক্ষণে শাড়ি হাঁটুর কাছে তুলে গায়ের আঁচল কোমরে জড়িয়ে মনসা জলের কিনারায় নেমে গেছে। সে বললো, সে তো শুনেছি মশার কামড়ে হয়। সাঁতার জানো তো, ভাই?
সুমিতি জলের ধারে নেমে এলো, বললো, কেউ যদি এসে পড়ে?
তুমি কি ভেবেছো জেঠিমা এতক্ষণে দরজায় কোনো তাতারনীকে বসাননি? বলতে বলতে কালো জলকে শাদা করে দুমদুম করে হাত-পা ছুঁড়ে সাতরাতে লাগলো মনসা।
আবক্ষ জলে নেমে সুমিতি বললো, এমন জল থাকতে স্নানের ব্যবস্থা ইদারায় কিংবা ঘরে কেন?
‘আমরা বোধ হয় ক্রমশ গোলালো পলিজ-শিলায় রূপান্তর নিচ্ছি।
সেটা কী রকম ব্যাপার?
এ বাড়ির লোকেদের চরিত্রে আগে অনেক কোণ ছিলো, খুব কাছে এলে খোঁচা লাগতো। এখন স্ট্রিইল্ড হচ্ছি।
ভাই ননদিনী, এ কথাগুলো যেন অন্য কোথাও শুনেছি।
মনসা কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলো, বললো, আমি আশ্চর্য হবো না যদি শুনে থাকো। দাদা এরকম ধরনের কথা বলেন।
চাতালে উঠে সুমিতি বললো, জঙ্গলটা সাফ করিয়ে নাও না কেন?
দাদা ফিরে এলে হবে। তার ছিপের সুতোত ছিড়লে চলবে না, জলে রোদ না লাগলে মাছের স্বাস্থ্যও ভালো থাকেনা। অবশ্য আজকের এই নির্জনতা তোমার জন্যে, অন্যান্য দিন দাস দাসীরা এমন সময়ে স্নান করে।
তাহলে তাদের কষ্টের কারণ হলাম।
কষ্ট আর কী, একদিন না হয় আধঘণ্টা দেরিই হবে।
তোমাদের জন্যেই কি ওদের এমন কষ্ট রোজই করতে হয়?
দাদা এখন ছোটো নয়। তিনি এলে দাসদাসীরা অবশ্যই দূরে থাকে। আমার কথা স্বতন্ত্র। মতির মা সঙ্গে না এলে স্নান করে সুখ নেই, তার মতো সাঁতার কেউ জানে না, মেজে-ঘষে দিতেও তার জুড়ি নেই।
কাপড় পালটে মনসা আবার সুমিতির ঘরে এসে ডাকলো, খেতে এসো বউদি। স্নানের ব্যাপারে যেমন আহারের ব্যাপারেও তাই। সুমিতির আহার্য বামুনঠাকরুনের হাতে অন্দরমহলের দোতলাতেই আসতো, যেমন আসে সান্যালমশাই এবং রূপুর।
সুমিতিকে সঙ্গে নিয়ে আমিষ ঘরের বারান্দায় উঠে মনসা বললো, ভাত দাও, বামুনদিদি। দিই দিদি; তারণের মা, ঠাই করে দে বাছা। বলে দরজার কাছে এসে বামুনঠাকরুন সুমিতিকে দেখে বিস্মিত হয়ে গেলো, কী করবে ভেবে পেলো না।
দুমদুম করে দুখানা সিঁড়ি পেতে মনসা বললো, বোসো ভাই, বউদি, এতদিন ওরা তোমাকে হক কষ্ট দিচ্ছে। কত রকমের চচ্চড়ি ছ্যাচড়া বামুনদিদি নিজে রান্না করে একা একা খায় তা তুমি কল্পনা করতেও পারবে না।
ভাত নিয়ে এসে বামুনঠাকরুন বিব্রত হয়ে বললো, সে কি তারণের মা, অবাক হয়ে কী দেখছো, জল গড়িয়ে দিতে পারোনি?
থাক্, থাক্, ও অবাক হয়ে দেখুক। বউদি, যাও তো ভাই, একটু জল গড়িয়ে আনো।
আহার-পর্ব মিটলে মনসা বললো, তুমি এবার বিশ্রাম করা গে, রোদ পড়লে আমি আবার আসবো। তখন সুখদুঃখের কথা হবে।
আমার ঘরের ভেতরে তো রোদ নেই।
তা নেই। দেখলাম আজ এখনো জেঠিমার স্নান হয়নি। তারপরে স্বর নিচু করে মনসা বললো, এবাড়ির বউ হওয়ার ওই এক কষ্ট, দিবাভাগে সাক্ষাৎ হয় না।
সুমিতির ভাবতে অবাক বোধ হলো অন্দরমহলের পিছনে এবাড়ির আর একটি মহল আছে।
মনসার কথায় যদি অতিশয়োক্তি না থাকে তবে এবাড়ির বড়োছেলের সম্বন্ধেও সে কিছুটা নতুন সংবাদ পেয়েছে। সান্যালমশাই, রূপু ও সদানন্দ, এ তিনজনের চালচলন দেখে নৃপনারায়ণ বাড়িতে এলে কীভাবে থাকে তার কতগুলি কাল্পনিক চিত্র সে এঁকেছিলো মনে মনে। কিন্তু মনসার কথায় এখন মনে হচ্ছে ছবিগুলো একদেশদর্শী হয়েছে। মনসা তার দাদার নামে অত্যুৎসাহী। এ যেন অনায়াসে কল্পনা করা যায় মনসা ও নৃপনারায়ণ দুজনে তিন মহলে, বাগানে, পুকুরে দুরন্তপনা করছে এবং তাদের অস্তিত্ব দিয়ে ভরে রাখছে। মূলত নৃপনারায়ণ হয়তোবা সান্যালমশাই থেকে খুব পৃথক নয়, কিন্তু তার ক্ষেত্রে আভিজাত্যের মর্মর যেন কোথায় চিড় খেয়েছে, আর সেই ফাটলে প্রাণশক্তি উচ্ছ্রিত হচ্ছে। মনসা যেন তার প্রতিভূ।
বিকেলে মনসা এসে বললো, চলো, বেড়াতে যাই।
বাগানের বড়ো বড়ো ফলের গাছগুলির নিচে ছায়াপথের মতো রাস্তা। সে পথে চলতে চলতে মনসা প্রকাশ করলো সে তিন মাস থাকতে এসেছে, এবং এই তিন মাস সে যজ্ঞের উৎসৃষ্ট তণ্ডুল হাঁসদের সঙ্গে খুঁটে খুঁটে খাবে। সুমিতি তার কথার অর্থ চট করে ধরতে পারেনি। পরে যখন মনসা বললো, উপমাটা ভালো হয়নি, একসঙ্গে লব কুশকে মানুষ করার মতো শক্তি তার নেই, তখন সুমিতি বুঝতে পারলো মনসা অন্তর্বত্নী।
