সান্যালমশাই আর একটু জানেন–অনসূয়ার পিতৃগোষ্ঠীতে এককালে আচার্য কেশব সেনের প্রভাব এসে পড়েছিলো।
বিছানায় শুয়ে অনসূয়ার চোখ পড়লো কুলুঙ্গিতে। তিনি হাতজোড় করে বললেন, তুমি মনের মধ্যে দেখতে পাও। আমাকে অশান্তি থেকে রক্ষা করো। তুমি তো সমস্ত অশান্তি গ্রহণ করেও আত্মস্থ।
অন্য অনেকদিন এরকম প্রার্থনা করার পরমুহূর্তে তিনি ঘুমিয়ে পড়তে পারেন, কিন্তু আজ চোখ বুজতে গিয়ে চোখ পড়লো বড়োছেলের ফটোটার উপরেই। ঘরে দেয়ালগিরির অত্যন্ত মৃদু একটা আলো, সে আলোকে ছবিটিকে সংকীর্ণ ও ক্লান্ত দেখাতে লাগলো। তার বুকটা ধক ধক করে উঠল। মনে মনে বললেন–আমি এতটুকু রাগ করিনি খোকার উপরে। সে যদি নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে থাকে তাই বলে আমি কি তার উপরে রাগ করে থাকতে পারি! সে আমাকে চিঠি দেয়নি, সুমিতিকে লিখেছে, এতে অন্য অনেক মায়ের অভিমান হতো। অভিমান হওয়া সংগত। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি নিজেই তো ছেলেকে নিষেধ করেছেন।
তবুও কথাগুলি ভগবানকে নিবেদন করার মতো সত্য নয় বলে অনুভব হলো তাঁর। তিনি একটা ক্ষোভকে আড়াল করার জন্য মনসার বাড়িতে অত তাড়াতাড়ি চলে গিয়েছিলেন এরকম একটা কথা কেউ যেন বললো।
এরপর চিন্তা করলেন অনসূয়া : এ বিষয়ে তিনি দৃঢ় হয়েই বলতে পারেন যে, ছেলের কাছে তাঁর মূল্য কমেছে এ কিছুতেই তিনি বিশ্বাস করবেন না। ক্ষোভ যদি হয়ে থাকে তবে তো ছেলে হার মেনেছে বলে, সেন্সর করা চিঠি পাঠাতে রাজী হয়েছে সেই জন্য। সুমিতির জন্যই ছেলের এই পরাজয়।
কিন্তু পাছে শাসনে কিছুমাত্র বিরাগ থাকে এই ভয়ে সন্ধ্যায় বারংবার মনে হলেও সুমিতিকে তরস্কার করেননি। সান্যালবংশের কোনো বধূ পায়ে হেঁটে চলেছে অথচ সঙ্গে পাইক-বরকন্দাজ দাসদাসী নেই, এ কল্পনা করা অসম্ভব। এর আগে এক দারোগাকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য তাকে সামনে বসিয়ে চা খাইয়েছিলো সুমিতি।-সুমিতি, তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে, তোমার বুঝতে পারা উচিত কেন আজ খোকার রুচির কথা উত্থাপন করেছিলাম।
আজ কি ঘুম হবে না? চতুর্থ পর্যায়ে চিন্তার সূত্রপাত হলো। ছেলের রুচি নিয়ে অতগুলি কথা বলা ভালো হয়নি। এই পাঁচ-সাত বছর জেলখানায় ঘুরে, অন্তরীণ থেকে রুচি বলে কি কিছু-আর অবশিষ্ট আছে তার?
সান্যালকে এ বিষয়ে বলে তার পরামর্শ নিতেও পারেননি অনসূয়া। সুমিতিকে উপদেশ দিয়ে স্যান্যালের কাছে যখন গিয়েছিলেন তিনি তখন পরামর্শ করার ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু সান্যালের সম্মুখে গিয়ে তার মনে হলো সেই স্তব্ধ শান্তিকে বিঘ্নিত করার মতো কঠিন নয় সমস্যাটা। তাছাড়া–এ কথাও তার মনে হয়েছিলো অস্পষ্টভাবে,কথাটা উত্থাপন করার ক্রটিতে সান্যালমশাই যেন মনে না করেন, সুমিতিকে তিনি ঈর্ষা করছেন।
অনসূয়া উঠে জল খেলেন। একবার তার ইচ্ছা হলো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াবেন কিন্তু পরক্ষণেই তিনি স্থির করলেন সেটা উচিত হবেনা, কারো চোখে পড়ে গেলে বিষয়টা আলোচনার বষয়বস্তু হয়ে উঠবে। ভিজে আঙুল চুলগুলির মধ্যে চালাতে চালাতে নিজেকে তিনি লিলেন-চুলগুলো আজ খুলেই দেওয়া হয়নি।
.
মনসা এসেছে। সকালে চায়ের টেবিলেই খবরটা এসেছিলো। একটা তরল হাসির শব্দ সুমিতিকে আকৃষ্ট করেছিলো। রূপু উঠে গিয়ে দেখে এসে বলেছিলো, মণিদিদি এলো।
সুমিতি তখন থেকেই তার প্রতীক্ষা করছিলো, হাতের সেলাইটায় মন বসছিলো না। কিন্তু মনসা যখন এলো তখন প্রায় দুপুর। কাঁধের উপরে গামছা জড়িয়ে ঘরে ঢুকে সুমিতি কিছু বলার আগেই তাকে প্রণাম করে প্রায় একই নিশ্বাসে বললো, চলো ভাই, স্নান করে আসি।
অবাক হওয়ার কথা।
সুমিতি তার হাত ধরে বললো, আচ্ছা লোক তো, সেই সকালে এসেছে আর এতক্ষণে সময় পেলে?
মনসা বললো, আমি বলতে পারি, তোমারই এতক্ষণ যাওয়া উচিত ছিলোননদিনীর খোঁজে। আজকাল ননদিনীকে কেউ ভয় পাচ্ছে না।
সুমিতি হেসে ফেলো, বললো, বোসো।
মনসা বললো, তুমি কিছু নও, বউদি। গাল পেতেই রইলাম শুধু।
মনসার আলিঙ্গন-মুক্ত হয়ে সুমিতি বললো, স্নানের এমন কি তাগাদা আছে?
তুমি অন্দরের পুকুরে স্নান করবে এমন অনুমতি রোজ পাওয়া যায় না। জেঠিমা আজ একবার বলতেই রাজী হলেন।
দু’পাঁচ মিনিট কথা বলেই মনসা বললো, তেল কোথায় ভাই, সিল্ক পরে জলে নামতে অসুবিধা হবে।
সুমিতি কাপড় পালটে নিতে নিতে মনসা সুমিতির তেল চিরুনি গামছা নিয়ে এলো। কার্পেটে বসে সুমিতির চুলে তেল দিয়ে আঁচড়ে এলো–খোঁপায় বেঁধে তার হাত ধরে টেনে তুলে বললো, দেরি কোরো না আর, এখনি জেঠিমার কোনো দূত এসে পড়বে।
চক্-মেলানো অন্দরমহলের চত্বরের উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে লোহার কীলক বসানো দরজা দিয়ে মনসার পিছনে সমিতি কর্মমহলে উপস্থিত হলো। চলতি ভাষায় বাড়ির এ অংশটার নাম। রান্নাবাড়ি, যেমন অন্দরমহলের নাম ভেতর-বাড়ি এবং বহির্মহলের নাম কাছারি। ইতিপূর্বে সুমিতি মাত্র একদিনের জন্যই আসতে পেরেছে এ অঞ্চলে কিন্তু এত লক্ষ্য করতে পারেনি। আমিষ-নিরামিষ রান্নাঘর, ভাড়ার ও গৃহবিগ্রহের মন্দিরে বিভক্ত এ অংশটা একটা নতুন বাড়ি বলে মনে হলো। উঠোনে পাঁচ-সাতটি ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে খেলা করছে, দু-একটি বায়না ধরে কাঁদছে। নিরামিষ ঘরের বারান্দায় কয়েকটি বিধবা বসে তরকারি কুটছে। আমিষ ঘরের বারান্দায় ইতিমধ্যে কেউ কেউ খেতে বসেছে। কথাবার্তায় লোকচলাচলে মহলটি গমগম করছে। এতটা প্রাণচাঞ্চল্য অন্দরমহলে বসে অনুভূত হয় না। সেখানে চত্বরে দু-একটি ছেলে খেলা করে কখনো কোনো বিকেলে, একতলায় নামলে কখনো কখনো দু-একজনের কথাবার্তা কানে আসে বটে কিন্তু দোতলায় তার খুবই কম পৌঁছায়। বিশেষ করে দুপুরের কয়েক ঘণ্টা, এবং সন্ধ্যা থেকে প্রভাত অর্থাৎ যতক্ষণ সান্যালমশাই অন্দরে থাকেন সমগ্র মহলটা স্তব্ধ গম্ভীর হয়ে থাকে।
