সান্যালমশাই বললেন, ছেলের খবর পেয়েছো?
বেটা-বউকে চিঠি লিখেছে ছেলে, সে আলোচনা করা কি তোমার উচিত হবে?
সান্যালমশাই কথা ঘুরিয়ে নিলেন,বললেন, রূপু বলছিলো, আজ সে আর তার বউদি গ্রামের পথে বেড়াতে গিয়েছিলো।
আমি তা জানি।
সুমিতি ওদের কলকাতা শহরে নিশ্চয়ই বাইরে বেরুতে। এখানে যদি অন্দরে আবদ্ধ হয়ে থাকে সেটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো হবে না।
কুমারী-জীবন আর বধূ-জীবন তো এক নয়। অনসূয়া বললেন।
তা নিশ্চয়ই নয়, রূপু বলছিলো বটে বউদিদিকে নিয়ে পথে বেরুতে তার ভয় ভয় করছিলো, সেজন্যে আমার দেরাজ থেকে রিভলবার নিয়ে গিয়েছিলো।
খবরটা নতুন। অনসূয়া একটু থেমে বললেন, রিভলবার নেওয়াটা তার পক্ষে উচিত হয়নি।
তা হয়নি, তা হলেও ছেলে যখন নিজের থেকে কোনো কাজ করে তখন চিন্তা করে দেখতে হয় তার মনের গড়নটা কীরকম হয়েছে। দেখছি রূপুর মর্যাদাবোধটা জন্মেছে।
অনসূয়া চুপ করে রইলেন।
লঘুতার সুরে সান্যালমশাই বললেন, রূপু একটা কথা বলেছে, তাই ভাবছিলাম। সে বলছিলো, ছেলে রাজার শত্রু আর বাবা রাজার বন্ধু, এ কী করে হয়, কী করে চলতে পারে এমন ব্যবস্থা!
‘ঠিক বুঝতে পারলাম না।
রাষ্ট্রদ্রোহ-নিবারণ-আইনে ছেলে অন্তরীণ আর তার বাবাকে দেওয়া হয়েছে অস্ত্রশস্ত্র। দুই পুরুষে মতের পার্থক্য থাকতে পারে তো।
ভাবতে গিয়ে মনে হচ্ছে, সমাজের এটা একটা কৌতুককর অবস্থা। তোমার বাড়িতে না হলেও অন্যত্র গৃহবিবাদ আছে বৈকি। কিন্তু আমি ভাবছিলাম রূপুর কথা; সে বলে, হয় তারা তার দাদাকে কিছুমাত্র মূল্য দেয় না, কিংবা তার বাবাকে অপদার্থ মনে করে।
ছেলে বলেছে?
না, ঠিক এ কথাগুলো বলেনি, কিন্তু তার বক্তব্যকে বিশদ করলে এই দাঁড়ায় বটে। তার দাদাকে যদি তারা সত্যিকারের মূল্য দিতো তবে তাকে আর্থিক ও অন্যান্য পার্থিব সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার জন্যে আমাকেই তারা আঘাত করতো, কিংবা এমন হতে পারে তারা ভেবেছে ছেলেকে আমি নিজেই শাসন করবো যদি সে প্রকৃতই বর্তমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন চায়।
সান্যালমশাই উঠে দাঁড়ালেন। টেবিলের উপরে রাখা বইখানি ও তাঁর চশমা হাতে নিয়ে অনসূয়া তাঁর পাশে পাশে ঘর থেকে পার হলেন। বারান্দা দিয়ে চলতে চলতে দেখতে পেলেন তারা, রূপুর ঘরের দরজা খোলা, সে মশারি না ফেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। হাসিমুখে সান্যালমশাই দরজার কাছেদাঁড়ালেন। অনসূয়া ঘরে ঢুকে মশারি ফেলে দিলেন। ঘরের দেয়ালগিরির আলোটা মৃদু করে দিয়ে, পড়ার টেবিলের বড়ো ল্যাম্পটা নিবিয়ে দিলেন। রূপুর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজের ঘরের ভিতর দিয়ে সান্যালমশাইয়ের ঘরে গিয়ে অনসূয়া বই ও চশমা বিছানার পাশের ছোটো টেবিলটায় রেখে আলোর ব্যবস্থা ঠিক করলেন।
পড়বে এখন?
কিছুক্ষণ পড়ি।
আলো নিবিয়ে মশারি ফেলে দিয়ে।
অনসূয়া নিজের ঘরে এসে ঘুমোবার জন্য প্রস্তুত হলেন। দেয়ালের গায়ে কিছুদিন আগে ঝুলানো বড়োছেলের ছবিটির দিকে চোখ পড়লো তাঁর। মোষের শিঙের সরু ফ্রেমে আঁটা এই ছবিটি ছেলের এক বন্ধুর সাহায্যে অনেক যত্নে আনানো হয়েছে। ছবির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো সেই পুরনো কথাটা-তার বড়ছেলের মুখাবয়বে যে প্রখরতা আছে সেটা সান্যালমশাই কিংবা রূপুতে নেই।নাক, এবং চিবুকেই এই পার্থক্যটা বেশি স্পষ্ট। অবাক বোধ হয়, পাঁচ-ছটি বছরে ছেলের কী পরিবর্তন হয়ে গেলো। পরিবর্তনেরই বয়েস, পঁচিশ হলো। কিন্তু সে যদি দুরন্ত মানুষ না হয়ে জমিদারের ছেলে হয়ে থাকতো, হয়তো পরিবর্তনটাকে এমন আমূল বোধ হত না।
দেয়ালের কুলুঙ্গিতে একটি লালপাথরের মূর্তি আছে। বাড়িতে যে অষ্টধাতুর দ্বিভুজ জটাজুট সমন্বিত সন্ন্যাসী শিবমূর্তির পূজা হয় তারই প্রতিরূপ এটা। একটি ঘিয়ের প্রদীপ রোজ সন্ধ্যায় এখানে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় যখন মন্দিরে আরতি হতে থাকে।
বাড়ির কত্রী হিসাবে গৃহবিগ্রহের পূজার আয়োজন অবশ্যই তাকে করে দিতে হয় কিন্তু নিজে তিনি মন্দিরে খুব কমই যান। তাঁর প্রথম বয়সে লোকে জানতো সংসারের সকলের খাওয়া পরার ব্যাপার নিয়েই তাকে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয়। এখনও সংসারের অন্য লোকেরা জানে সংসার ব্যস্ত অনসূয়া মন্দিরে আসবার সময় পান না। শুধু সান্যালমশাই নন, কিছু কিছু রূপুও এখন জানে ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়। অনসূয়া বলেন কাসর-ঘণ্টার বাজনা এবং পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে ব্যক্তিগত ভগবানকে খুঁজে পাওয়া যায় না। অনসূয়ার ভগবান সম্বন্ধে ব্যক্তিগত মতামত আছে। ভগবান আছেন, তিনি সর্বত্র বিরাজমান, কিন্তু দল বেঁধে তাকে ডাকা যায় না। তার সঙ্গে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে, সেটাকে খুঁজে নিতে হয়। তাঁকে সোজা বাংলাতে ডাকা উচিত, সর্বজ্ঞ একজনের পক্ষে কোনো ভাষাই অবোধ্যনয়। সান্যালমশাই জানেন এসব কারণেই মন্দিরে যখন পরিবারের অন্য অনেকে উপস্থিত, অনসূয়াকে তখন সেখানে দেখা যায় না। ঘিয়ের প্রদীপটি জ্বালিয়ে দেওয়ার সময়ে শোবার ঘরের ছোটো মূর্তিটির সম্মুখে কখনন কখনো তিনি কিছুক্ষণের জন্যে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকেন। রূপু একদিন দেখে ফেলে প্রশ্ন করেছিলো, কী বললে, মা? প্রথমে কিছু না বলে মৃদু মৃদু হাসলেন অনসূয়া, পরে বললেন, বললাম, হে মহাজীবন, হে মহামরণ, লইনু শরণ। গানের সুরটা আজ সকাল থেকে বার বার মনে আসছে।
