বেহারাদের পায়ে যে ধুলো উড়ছিলো সেটা একটু থিতোলে সুমিতি বললো, চলো, আমরাও ফিরি।
.
সুমিতি ও রূপু, তাদের পিছনে পদ্ম ও ছিদাম চলতে শুরু করলো। রূপু একসময়ে বললো, রোজ না হলেও মাঝে মাঝেই বেড়াতে বেরুলে কেমন হয় বউদি?
আশাতীত ভালো একটা কিছু হয়।
কিন্তু তখন তারা জানতো না তাদের এই বাইরে আসা কতদূর গড়াতে পারে। কিছুক্ষণ পরেই রামনন্দন ও রামপীরিত পথের পাশে কুর্নিশ করে দাঁড়ালো। সুমিতি ও রূপু তাদের পার হয়ে গেলেই পদ্ম ও ছিদামকে আড়াল করে তারা নিঃশব্দে পিছন পিছন চলতে লাগলো।
তখনো পথে অন্ধকার হয়নি, দু-একটি ঝিঁঝি ডাকতে শুরু করেছে মাত্র, তবু আর একটু দূরে একটি দাসী হিংকসের বড়ো একটা লণ্ঠন হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পেলো রূপু। দাসী নিঃশব্দে সঙ্গ নিলো। এতখানি সতর্কতার কারণ খুঁজে না পেয়ে সুমিতি কুণ্ঠিত হলো।
.
রাত্রিতে আহারাদির পর্ব মিটে গেলে সুমিতি নিজের ঘরে বসে সকালের ডাকে আসা চিঠিটা আবার পড়ছে এমন সময়ে একজন দাসী এসে খবর দিলো অনসূয়া তাকে ডাকছেন।
সুমিতি অনসূয়ার ঘরে গেলে তিনি তাকে বললেন, তোমাকে একটা কথা কিছুদিন থেকেই বলবো ভাবছি।
অনসূয়া সঙ্গে সঙ্গে কথাটা না বলে হিসেবের একটা খাতায় চোখ বুলোতে লাগলেন। আঙুলের ডগায় হিসেব করে যোগটা ঠিক আছে দেখে খাতাটা সরিয়ে রেখে চশমা খুলে মুখ তুললেন।
সুমিতি, তুমি এ বাড়ির বড়োবউ।কতকগুলো ব্যাপারে তোমাকে তেমনি হয়েই চলতে হবে। এ কথাগুলো তোমাকে বলছি, এর মধ্যে আমার রক্ষণশীলতার লক্ষণ অবশ্যই দেখতে পাবে। আমার কিন্তু ধারণা, তোমার নিজের মঙ্গলের জন্যই কিছুটা রক্ষণশীলতার প্রয়োজন আছে। আচ্ছা, তুমি কি খোকাকে কখনো রান্না করে খাইয়েছে?
দু-একবার।
তুমি কি লক্ষ্য করেছে, তার রুচিটা কোনো কোনো বিষয়ে তোমার সঙ্গে মেলে না? আমি আহারের রুচির কথাই বলছি।
আলাপটার গতি কোন দিকে তা বুঝতে না পারলেও বুদ্ধিমতী সমিতি আলাপটা যাতে গুরুভার হয়ে চেপে না বসে সেজন্যই উত্তর দিল, আপনার ছেলে দুধের চাইতে মাছ বেশি পছন্দ করেন।
ধরতে পেরেছে। কিন্তু আরও সূক্ষ্ম ব্যাপার আছে, যেমন আমি বলতে পার তপসে মাছ সে মোটেই খায়না। রুইয়ের কালিয়ায় টম্যাটো পছন্দ করে। তার দই-মাছ মিষ্টি হওয়া প্রয়োজন।
আমি এত লক্ষ্য করার সুযোগ পাইনি। আপনার ছেলে এবার বাড়িতে এলে আপনি দেখিয়ে দেবেন, আমি নিজে বেঁধে দেবো।
অনসূয়া যেন হাসলেন, বললেন, ছেলে দূরে আছে বলেই তার আহারের কথা এত মনে পড়ছে আমার, তানয়। এই রুচিই তার চিরদিন থাকবে এমনও নয়। মায়ের রান্নার পদ্ধতি ছেলেরা ভালোবাসে। আহারের বেলায় যেমন অন্যান্য কিছু কিছু ব্যাপারও তেমনি, ছেলেরা নিজের বংশের প্রথাগুলোকে ধরে রাখে।
অনসূয়ার কথার সুরে উপদেশ ছিলো, বক্তব্যগুলি ভাষার দিক দিয়েও গুরুভার। সুমিতি অস্বস্তি বোধ করলো।
অনসূয়া চশমা চোখে দিলেন, হিসেবের খাতাটা আবার টেনে নিলেন; তারপর বললেন, তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে, তোমাকে বেশি বলার দরকার হবেনা। জীবনের গোড়ার দিকে তার রুচির
পরিপন্থী হওয়া তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে দুর্বল করে দেবে।
সুমিতি বললো, আমার সংসার শুধু আপনার ছেলেকে নিয়ে নয়।
কথাটার অর্থ পরিষ্কার করে নেওয়ার জন্য অনসূয়া সুমিতির মুখের দিকে চাইলেন, বললেন, তুমি কি বুঝতে পেরেছে কোনো অসংকীর্ণমনা পুরুষ নিজের পরিজন-বন্ধুবর্গের বাইরে গিয়ে শুধু স্ত্রীকে নিয়ে সবটুকু সুখী হতে পারে না, বিচ্ছিন্ন হলে তার জীবনরস কিছুটা শুকিয়ে যায়?
সুমিতি বুঝতে পারলো, এই মার্জিত কথাগুলি শুধুমাত্র মতামত বিনিময় নয়, হয়তো সে নিজের অজ্ঞাতে দ্বিতীয়বার এঁদের কোনো পারিবারিক প্রথাকে আঘাত করেছে। সুমিতির বোধ হলো এর চাইতে অনসূয়া যদি সোজাসুজি তিরস্কার করতেন ব্যাপারটা এমন গুরুভার হতো না।
অনসূয়া বললেন, তোমার বিশ্রামের সময় হলো সুমিতি।
সমিতি প্রায় নীরবে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ঘরে চলে এলো।
অনসূয়াও উঠে দাঁড়ালেন। পাশের দরজায় দৃষ্টি দিয়ে তিনি দেখলেন সান্যালমশাই তখন শুতে আসেননি। ওপাশের দরজায় হাত দিতে দরজা খুলে গেলো। রূপুর ঘরে রূপুও নেই। তখন অনসূয়া বারান্দা দিয়ে সান্যালমশাইয়ের বসবার ঘরে গেলেন।
দেওয়ালগিরির আলোয় সান্যালমশাই বসে আছেন। বসবার ভঙ্গিটা স্তব্ধ, কিন্তু ক্লান্ত নয়। সমস্ত ঘরখানা যেন একটি নীরব জলাশয়ের মতো শীতল স্নিগ্ধতা। প্রায় এক মিনিট কাল অনসূয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন, অবশেষে সান্যালমশাই যেন তাকে লক্ষ্য করলেন। অনসূয়ার ঘরে আসা আর সান্যালমশাইয়ের কথা বলার সময় ব্যবধানটা থেকেই এরকম মনে হলো।
অনসূয়া পাশে বসলে সান্যালমশাই বললেন, আজ খুব ব্যস্ত ছিলে?
মণির বাড়িতে গিয়েছিলাম, মেয়েটার শরীর ভালো নয়; ওর শাশুড়িকে বলে এলাম, দু তিন মাসের জন্য মেয়েকে আসবার অনুমতি দিতে।
নিজেকে যেতে হলো কেন?
তাতে কী, একটু ঘুরে আসা হলো।
তা হলো। মেয়ের বাড়িতে একটু ঘুরতে তোমার মতো একজন যায় না। মনে হচ্ছে যেন মনসার শাশুড়ি তাকে আসতে দেবে না আন্দাজ করেছিলে। সমাজে তুমি নেমে গেছে?
এ খবরে তোমার কী দরকার?
কিছুমাত্র না। সান্যালমশাই হাসলেন।
মেয়ের মা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওটা মেনে নিতে হয়। পুতুল খেলার সময় থেকেই ছেলের মায়েদের কাছে হার মানতে হচ্ছে।
