এটাকে নিয়ে এক মুশকিল হয়েছে। কেটে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, ওর ভিতরে একটা শিবমন্দির আছে। মাঝে মাঝে চারিদিকের জঙ্গল কেটে দেওয়া হয়, কিন্তু সবচাইতে উঁচু গাছগুলো মন্দিরের গা বেয়ে বেয়ে উঠেছে। সেগুলো কাটতে গেলে মন্দিরটাই ধসে যাবে।
ওখানে অনেক সাপ আছে নিশ্চয়ই।
তা হবে কেন? গাজনের সময়ে এবার দেখো। তার আগে থেকে দু-তিনদিন ওর ভিতরে গাজনের সন্ন্যাসীরা থাকে। সাপ থাকলে কি আর থাকতে পারতো। কিন্তু বউদি, কথাটা ভাবা দরকার, বাড়িতে বিপ্লবী থাকলেও বন্দুকের লাইসেন্স সবক্ষেত্রে থাকে কিনা।
আবার সেই কথা! আজ আমি গ্রাম চিনতে বেরিয়েছি।
কিছুটা পথ নীরবে চলে সুমিতি বললো, তোমাদের বাগানটাকে দেখে আমার একটা গল্প মনে পড়ে। এক রাজার বাগানের ভিতরের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পথ যেখানে হারিয়ে গেছে সেখানে ছিলো এক দৈত্যের বাড়ি।
রূপু হা হা করে হেসে উঠলো।
বাঃ?হাসছো কেন? তোমার সমস্যাটাই আমি এতক্ষণ ভাবছিলাম অন্য কথা বলতে বলতে। তোমার দাদার বিপ্লব তো আর আগ্নেয়াস্ত্রের দুমদাম নয়। সেটা বলে কয়ে করা, ধীরে ধীরে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া গান্ধিয়ানা। হাতে পেলেও বোমা ছুঁড়বে না তোমার দাদা, এ খবর রাজা রাখেন।
রূপুর মনে যে প্রশ্নটা উঠেছে এটাকে তার একটা সমাধান বলে মনে হয় বটে,তথাপি খানিকটা কৌতুকবোধ, কিছুটা কৌতূহলের মতো হয়ে প্রশ্নটা ভেসে বেড়াতে লাগলো।
কিন্তু রূপু স্থির করলো অনভিপ্রেত আলাপটা সুমিতির সম্মুখে চালিয়ে যাওয়াটা ভালো হবে না। সে বললো, বাগানের মধ্যে দৈত্যদের প্রাসাদ আছে এটা আমারই আবিষ্কার বলতে পারো। কয়েক বছর আগে বাগানের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম আমি।
সুমিতি বললো, একদিন এক চাঙারি খাবার, আর এক ফ্লাস্ক’জল নিয়ে আমি আর তুমি তিন-চার ঘণ্টার জন্যে বাগনে হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।
সুমিতি ও রূপুর পথ এই জায়গাটায় গ্রামের অন্যতম প্রধান পথটিতে এসে মিশেছে। দু-একটি করে তোক চোখে পড়তে লাগলো। তাদের অধিকাংশই সন্ত্রস্তের ভঙ্গিতে পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ালো, কিন্তু পথের পাশে দাঁড়িয়ে হাঁ করে চেয়েও রইলো সুমিতির দিকে। রূপু ফিসফিস করে বললো, সান্যালবাড়ির কোনো বউকে এমন কাছে ওরা কখনো দ্যাখেনি। আমি সঙ্গে না। থাকলে সঙের পেছনে ছেলের দলের মতো দল বেঁধে ওরা তোমার পিছন পিছন চলতো।
সুমিতি হেসে বললো, তাহলে আমি কী করতাম? ওদের সকলকে নিয়ে হাঁটতে পদ্মার জলে ডুব দিতাম?
হাসি থামাতে হলো,ওদের। পথটা এখানে মোড় নিয়েছে। মোড় ঘুরতেই ওরা দেখতে পেলো কয়েকজন কৃষক যাচ্ছে।
সুমিতি জনান্তিকের সুরে বললো, কী সর্বনাশ, দল বেঁধে যায় যে! হাতে লাঠি, কাঁধে নতুন গামছা সব!
তাতে কী হলো? ডাকাত?
ওরা কী বলে শোনো।
রপুরা শুনতে পেলো :
বুঝলা না মামু, ধামি একটা আমারও কেনা লাগবি।
এখন কি আর তেমন পাবা? বাঁশেরবাদার হাটে সেইবার আসছিলো কয়–যে শিলোটি ব্যাতের।
ধামি যৈ সৈ, চাচা, আমার মনে কয় হাঁসেও বানাতে হবি।
ভক্ত নাই। দিঘায় যাতে হবি।
নিজেদের কথায় মশগুল হয়ে এরা চলে গেলো।
রূপু বললো, শুনলে, ডাকাতরা কী বললো?
খুব সুখী বলে মনে হলো।
ধানের ছড়াগুলো দেখে অনেকেই এবার বলছে ধান খুব ভালো হবে।
প্রায় ঘণ্টাদুয়েক এ-পথ সে-পথ ধরে চলে শেষ যে-পথটা ধরে এরা চলছিলো সেটা এখানে এসে শেষ হয়েছে। সম্মুখে যাবার উপায় নেই তা নয়, কিন্তু বেলেমাটির পায়ে-চলা পথে হাঁটতে গেলে জুতোর সবটাই ধুলোয় বসে যাচ্ছে। অবারিত মাঠ, অধিকাংশ জমিতে ধানের চাষ। দূরে দূরে চার-পাঁচটি করে কুঁড়ের এক-একটি গুচ্ছ। এখানে মাটি ক্রমাগত নিচু হয়ে গেছে দিগন্তের দিকে। পদ্মার নীলরেখায় সীমাবদ্ধ সেই দিসীমান্ত। আকাশে রং লাগছে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মনে হয় আকাশ গড়িয়ে রঙের কয়েকটি স্রোতধারা পদ্মার দিকে নেমে আসছে।
এরা এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখতে পেলো একটি পুরুষ এবং একটি স্ত্রীলোক। আসছে। সুমিতি বললো, আমাদের ছায়া নাকি?
রূপু দূর থেকে ঠাহর করে বললো, দারোগার কাছে রামচন্দ্রর জন্যে যে কেঁদেছিলো সেই পদ্ম বলে মনে হচ্ছে। সঙ্গেরটি ছিদাম, ওকেও চিনি, ও গান করে।
পদ্ম ও তার সঙ্গী এদের দেখতে পেয়ে থামলো। পদ্ম প্রণাম করার জন্য নিচু হচ্ছিলো, সমিতি বললো, এখানে নয়। কোথায় গিয়েছিলে?
পদ্ম বললো, এক হাল জমি আছে।
জমিতে তুমি কী করো?
পদ্মর সঙ্গী বলল, সখ করে গিছলো।
পদ্ম কিন্তু ঝিরঝির করে হেসে বললো, না, দিদিঠাকরুন, ছিদাম পরের ক্ষেতে খেটে বেড়ায়, নিজের জমিতে নিড়ানির কাজে মন থাকে না, তাই নিয়ে গিছলাম।
ছিদাম বললো, ও জমিতে তোমার সংসার চলে?
ওটুক নিজের তো।
কীর্তনের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে একটা সাড়া এনে দেওয়ার জন্য সাধারণ কৃষকের চাইতে ছিদামকে বেশি পরিচিত বলে মনে হলো রূপুর। সে বললো, তুমি কি আরও বেশি জমি চাষ করতে পারো? তা যদি হয় একসময়ে কাছারিতে যেয়ো।
আজ্ঞে যাবো।
এদের আলাপে ছেদ পড়লো। হুম্ হুম্ শব্দ করতে করতে অনসূয়ার পাল্কিটা প্রায় এদের গায়ের উপরে এসে পড়লো। কথা বলতে বলতে এরা এতক্ষণ পাল্কির চাপা শব্দটা খেয়াল করেনি। পাল্কিকে পথ করে দেওয়ার জন্য সুমিতি ও রূপুকে পথ থেকে নেমে দাঁড়াতে হলো। আট বেহারার পাল্কিটা অত্যন্ত দ্রুতগামী সন্দেহ কী!
